বিশ্বে আয় বৈষম্য অর্থনৈতিক সহিংসতায় রূপ নিয়েছে

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৭, ০০:০১

শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী শিশু অধিকার কর্মী কৈলাস সত্যার্থীর মতে, বিশ্বব্যাপী আয় বৈষম্য বর্তমানে এমন জায়গায় চলে গেছে যা রীতিমত ‘অর্থনৈতিক সহিংসতা’য় রূপ নিয়েছে। এই ‘সহিংসতা’ বিশ্বজুড়ে মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য এখন বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো চলমান ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন-আইপিইউ’র পাঁচ দিনব্যাপী সম্মেলনের দ্বিতীয়দিনে গতকাল রবিবার মূল প্রবন্ধে তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন।

ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে চলমান আইপিইউ সম্মেলনে ২০১৪ সালে নোবেল পাওয়া কৈলাস সত্যার্থী গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে লিখিত প্রবন্ধের বদলে উপস্থিত সাবলিল বক্তব্য রাখেন। বিশ্বের ১৩১টি দেশের সংসদের সদস্যদের সামনে ভারতীয় এই অধিকারকর্মী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের জঙ্গিবাদে ঝোঁকার প্রবণতার পেছনে তারুণ্যের শক্তি ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা অন্যতম প্রধান কারণ। ঢাকায় যখন আমরা এই সম্মেলন করছি, তখন বিশ্বের ২৭০ মিলিয়ন দরিদ্র শিশু স্কুলের বাইরে। ২১ মিলিয়ন মানুষ বিক্রি হয়ে শ্রমদাসে পরিণত হয়েছে। এটা কি মেনে নেয়া যায়! না, এটা সহ্য করা যায় না। আমাদের এই বিশ্ব কি এতই দরিদ্র যে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষাও নিশ্চিত করা যাবে না? এখনই, এবং আজই সময়-এই ঢাকা  থেকেই বিশ্বের অসহায়-দরিদ্র শিশুদের জন্য কিছু করার জন্য আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সহানুভূতি ছড়িয়ে দিতে হবে সারা বিশ্বে, শিশুদের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেয়ার এখনই সময়।

সাবেক শিক্ষক কৈলাস তার বক্তব্যে বিশ্বে আয় ও সম্পদের বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে বলেন, কয়েক দশক আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজন সিইও ২০ জন শ্রমিকের সমান আয় করতেন। আর এখন এই বৈষম্য বেড়ে হয়েছে ১:২০০। এটা কি আমাদের অবাক করে না! আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না! বিশ্বের ৫০ শতাংশ মানুষের সমপরিমাণ সম্পদ মাত্র আটজন ধনীর কাছে। দিনে-দিনে এই বৈষম্য বেড়েই চলেছে। একদিকে বিশ্বের ১০০ মিলিয়ন শিশু দাসত্ব, পাচার ও শিক্ষাবঞ্চনাসহ বিভিন্ন সামাজিক সহিসংতার শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে ১০০ মিলিয়ন তরুণ রয়েছে, যারা চাইছে পৃথিবীকে বদলে দিতে। পৃথিবীকে বদলে দেয়ার মত শক্তি, ক্ষমতা ও আদর্শ কিন্তু এই তরুণদের আছে। আমরা কি এই তরুণদের জন্য হাত প্রসারিত করে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি না?

কৈলাস সত্যার্থী উপস্থিত বিশ্ব প্রতিনিধিদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তারুণ্যের এই শক্তিকে যদি কাজে লাগানো না যায়, তাহলে তারা হতাশাগ্রস্ত, অসহিষ্ণু ও সহিংস হয়ে পড়বে। তরুণদের ক্ষমতা যদি নিশ্চিত করা যেত, তাদের কথা যদি কান পেতে শোনা যেত, তাহলে এই পৃথিবী আরও শান্তিময়, আনন্দময়, নিরাপদ ও শক্তিশালী হতে পারতো। পৃথিবীকে সুন্দর করার শক্তি, আদর্শ, সম্ভাবনা তরুণদের অবশ্যই আছে। কিন্তু সেটি বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টি ও সুযোগ করে দিতে হবে রাষ্ট্রকেই।

দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তরুণরা কীভাবে উগ্রবাদের পথ বেছে নিচ্ছে-সেইরকম কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরে এই নোবেলজয়ী বলেন, বিশ্বের ২৩০ মিলিয়ন শিশু সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে। তাদের জীবন ও শিক্ষা বিপদগ্রস্ত। সবাই একযোগে কাজ করে এর সমাধান বের করা আমাদের বৈশ্বিক দায়িত্ব। টেকসই উন্নয়নে এর জন্য ফ্রেমওয়ার্ক আছে। আমি আপনাদের প্রতি আহ্বান জানাই, এই বিপদগ্রস্ত শিশুদের বাঁচান। সারা বিশ্বে শিশুরাই বাল্য বিবাহ ও শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। সংসদ সদস্যদেরও উচিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো। কৈলাসের মতে, বিশ্বের সকল শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার জন্য মাত্র ২২ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যা বিশ্বের সাড়ে তিন দিনের প্রতিরক্ষা বাজেটের সমান।

শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে নোবেল বিজয়ীরা একটি ‘ক্যাম্পেইন’ শুরু করেছেন জানিয়ে এমপিদেরও তাতে অংশ নেয়ার আহ্বান জানান কৈলাস।  সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন ‘২০ সেপ্টেম্বর আপনারা নিজ নিজ এলাকার স্কুলে যান। সেখানে শিশুদের সঙ্গে কিছু সময় কাটান। আমরা চাই একটি নতুন সভ্যতা গড়তে, যা হবে বিশ্ব নাগরিকদের জন্য।

শনিবার শুরু হওয়া এবারের আইপিইউ সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য, ‘রিড্রেসিং ইনইকুয়্যালিটিজ:ডেলিভারিং অন ডিগনিটি অ্যান্ড ওয়েল বিং ফর অল’। গতকাল সাধারণ আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। আইপিইউ প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরীসহ বিভিন্ন দেশের স্পিকার ও সংসদ সদস্যরা এসময় উপস্থিত ছিলেন। কৈলাস সত্যার্থী মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর এ বিষয়ে সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন বিভিন্ন দেশের সংসদের প্রতিনিধিরা।

সেন্ট যোসেফ স্কুলে কৈলাস

গতকাল বিকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সেন্ট যোসেফ স্কুলে এক প্রচারণা অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন কৈলাস সত্যার্থী। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে ও শিশুশ্রম বন্ধে ‘১০০ মিলিয়ন ফর ১০০ মিলিয়ন’ প্রচারণা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে গণসাক্ষরতা অভিযান।

এই প্রচারণার উদ্বোধন করে কৈলাস বলেন, সারা বিশ্ব দেখছে বাংলাদেশ এখন আর পিছিয়ে নেই। এ দেশের তরুণদের পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা আছে। এ দেশের তরুণেরা আর অপেক্ষা করবে না। তারা ইতিহাস  তৈরি করতে প্রস্তুত।

২০১৬ সাল থেকে কৈলাস সত্যার্থীর উদ্যোগে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গৃহীত হয়েছে ‘১০০ মিলিয়ন ফর ১০০ মিলিয়ন’ ক্যাম্পেইন। সুবিধাবঞ্চিত ১০ কোটি শিশু-কিশোর-যুবকদের জীবনমান উন্নয়নে বিশ্বের যুবসমপ্রদায়ের ১০ কোটিকে সম্পৃক্ত করা হবে এই প্রচারণায়। বাংলাদেশ থেকে এই প্রচারণার অংশের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে গণসাক্ষরতা অভিযান। অনুষ্ঠানে কৈলাস সত্যার্থী ১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শিশুশ্রম নিরসনে ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করার শপথ পাঠ করান। সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে তারা কাজ করবে বলে অঙ্গীকার করে।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে পাকিস্তানের নারী-শিক্ষা আন্দোলনকর্মী মালালা ইউসুফজাইয়ের সঙ্গে শান্তিতে যৌথভাবে  নোবেল পুরস্কার পান ভারতের শিশু অধিকারকর্মী কৈলাস সত্যার্থী। দু’জনেরই অবদানের ক্ষেত্র শিশু, শিক্ষা ও শৈশব।

এই প্রচারণার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, যারা বঞ্চিত, শিশুশ্রম দিচ্ছে, তাদের বাঁচাতে হবে। আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তা প্রতিরোধ করব। অনুষ্ঠানে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, অধ্যাপক কাজী খলীখুজ্জামান আহমেদ, আর্চবিশপ কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি রোজারিও ও লেখক আনিসুল হক প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

বিশ্বের কাছে আমরা বাংলাদেশকে মেলে ধরছি: সাবের চৌধুরী

গতকাল সম্মেলনের বিভিন্ন কর্ম-অধিবেশনে দেয়া বক্তব্যে এবং এগুলোর ফাঁকে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলোচনায় আইপিইউ প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা সবচেড়ে বৃহত্ আন্তর্জাতিক আয়োজন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের সংসদের প্রতিনিধিদের কাছে আমরা বাংলাদেশের অর্জন ও এর সংস্কৃতিকে মেলে ধরছি। ঢাকায় এই সম্মেলনে আমরা কিছু ‘লিগ্যাসি’ রাখার চেষ্টা করছি। এর পদক্ষেপ হিসেবে প্রথমবারের মতো আইপিইউ ‘গ্রিন অ্যাসেম্বলি’র আয়োজন করা হয়েছে। এখান থেকেই যাত্রা শুরু হয়েছে আইপিইউটিভির।

সম্মেলনের পাশে বাংলাদেশি মেলা

আইপিইউ সম্মেলন উপলক্ষে অতিথিদের জন্য বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পাশে ছোট্ট পরিসরে হলেও বাংলাদেশের সংস্কৃকি ও নারীর সৃষ্টিকে তুলে ধরতে একটি মেলা আয়োজন করেছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)।

সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও টুভালু আইপিইউ’র নতুন সদস্য

 সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও টুভালু আইপিইউ’র নতুন সদস্য হয়েছে। গতকাল সম্মেলনের জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে এই দুটি দেশকে সদস্যপদ দেয়া হয়। নতুন দুটি দেশ নিয়ে আইপিইউতে সদস্য হলো ১৭৩টি। এর বাইরে ফোরামটির ১১টি সহযোগী সদস্য রয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু