উন্নয়নের জন্য সারাদেশে এত অর্থ যাচ্ছে, তবে বরকত হচ্ছে না-এটা বড় কষ্টের বিষয়

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৭, ০০:৫৩

ইত্তেফাক রিপোর্টজাতীয় পার্টি— জেপি চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ ও পুল-কালভার্টসহ উন্নয়নের জন্য প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় বর্তমানে এত অর্থ যাচ্ছে যা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। তারপরও কোথাও টাকার বরকত হচ্ছে না। এটা বড় কষ্টের বিষয়। জাতীয় যুবসংহতির ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল রবিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, উন্নয়নের জন্য সারাদেশে সরকার থেকে যে অর্থ যাচ্ছে—তা নিয়মের ভেতরেই দেওয়া হচ্ছে। দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। এই সেদিন পর্যন্ত কোনো সংসদ সদস্য তার নির্বাচনী এলাকায় এত উন্নয়ন বরাদ্দ দেখেছেন বলতে পারবেন না, অকল্পনীয় পরিমাণ বরাদ্দ যাচ্ছে। বাস্তবতা এমন যে, এখন দেওয়ার লোক আছে—তবে নেওয়ার লোক নেই। তিনি বলেন, রাজনীতির লক্ষ্য ও আদর্শ থাকতে হয়। দেশের মানুষের জন্য না পারলেও অন্তত নিজের এলাকার মানুষের সেবা করতে হয়। কাজ না করে বিল নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে মানুষের সেবা করা যায় না। এলাকার জনগণকেও সচেতন থাকতে হয়, নিজেদের হিস্যা থেকে যেন বঞ্চিত না হন—সেজন্য সজাগ থাকা দরকার। আমরা ক্ষমতায় থাকি বা না থাকি, অন্তত এলাকার মানুষের সেবা করার চেষ্টা করি।

জেপি চেয়ারম্যান বলেন, যে কারণেই হোক—’৯৮ সালে জাতীয় পার্টি—জেপি যখন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, তখন রাজনীতির মহাজ্ঞানীদের কেউ কেউ বলেছিলেন—মূলধারা থেকে বের হয়ে টিকে থাকা যায় না। কিন্তু আল্লাহর রহমতে জেপি এখনো টিকে আছে। সংসদেও এ দলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় বেশিরভাগ সময়ে সরকারেও জেপি’র প্রতিনিধিত্ব ছিল বা আছে। কারণ আমরা জনগণের কথা ভাবি। এখন সংগঠনকে আরো বড় করার বিষয় আসছে। কিন্তু যে অর্থের রাজনীতির খেলা চলছে—সেরকম বাস্তবতায় এটা কঠিন কাজ। অর্থের রাজনীতির কারণে সমাজের প্রতিটি স্তরেও কম-বেশি ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এমনকি এখন স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনের সময়ও প্রার্থীদের বলা হয়—দেখা করার দরকার নেই, আগে ফয়সালা করুন। এ কিসের ফয়সালা! যে কারণে আমরা আদর্শ, লক্ষ্য যা-ই বলি না কেন, ছাত্র-যুবক থেকে শুরু করে সেসব কথা কারো কানেই পৌঁছায় না।

আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আরো বলেন, সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামীতে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বাজেট হবে। এতদসত্ত্বেও কোনো দলেরই রাজনীতি জমে উঠছে না। খবর আসে মারপিট আর খুনাখুনির। রাজনীতিতে নীতি-আদর্শ না থাকলে যা হয়।

সুনীতি, সুশাসন ও সুবিচার দরকার: শেখ শহীদ

আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জেপি’র সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, সেখানে দুর্নীতি ও দুঃশাসন গণতন্ত্রের কোনো লক্ষণ নয়। গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে দুর্নীতি, দুঃশাসন ও অবিচার দূর করতে হবে। সমাজে সুনীতি, সুশাসন ও সুবিচার কায়েম করতে হবে। তাহলেই আমরা গণতন্ত্র কায়েম করতে পারব।

তিনি বলেন, যুবসমাজকেই দুর্নীতি, দুঃশাসন ও অসাম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য তারা আলোবর্তিকা ছড়াবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু যারা হতাশ হন তারা কখনো স্বপ্ন দেখাতে পারেন না। সেই স্বপ্ন দেখতে হবে জেগে, যেই স্বপ্ন ঘুমাতে দেবে না। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন বলেই সেই স্বপ্ন আমাদের ঘুমাতে দেয়নি। এই স্বপ্ন দেখানোর দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই গ্রহণ করতে হবে।

শেখ শহীদ বলেন, ব্যক্তিগত শ্রী বৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় অর্থ লুণ্ঠনের জন্য রাজনীতি নয়। রাষ্ট্রীয় অর্থে রাজনৈতিক কর্মী লালন-পালনও রাজনীতির লক্ষ্য হতে পারে না। রাজনীতি করতে হবে মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য। মানুষের জন্য যারা কাজ করেন, জনগণ তাদের কখনো ভুলে যান না। বঙ্গবন্ধু, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানী মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন বলেই মানুষ তাদেরকে মনে রেখেছেন।

অন্য নেতারা যা বললেন

আলোচনা সভায় জেপি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য এ এইচ সালাহউদ্দিন মাহমুদ বলেন, জেপির যে যোগ্য ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব রয়েছে তা দিয়ে এ দলকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ সদস্য রুহুল আমিন বলেন, দলকে শক্তিশালী করতে হলে কেন্দ্রীয় নেতাদের তৃণমূল সফরের কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার। দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সম্পাদক সাদেক সিদ্দিকী বলেন, আমরা ১৪ দলের সঙ্গে কাজ করছি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে যার মাধ্যমে সুশাসন ও সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে। যুবসমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই দেশের মুক্তিযুদ্ধসহ ঐতিহাসিক সকল আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা ছিল ছাত্র ও যুবসমাজের। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে এটাও বলতে হয়, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যুবসমাজ কিছু অসংলগ্ন কাজও করেছে। দল ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেয়ার মতো যোগ্য হয়ে ওঠার জন্য যুবসমাজকে নীতি-আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে।

যুবসংহতির সভাপতি এম এ কাইয়ুমের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেপি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা, যুবসংহতির প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক এটিএম রফিক, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, যুব-সংহতির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি দেলোয়ার হোসেন নান্নু, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহফুজুল আলম, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ.ন.ম নাজমুল হোসেন ও সাখাওয়াত হোসেন দুলাল, যুবসংহতির কেন্দ্রীয় সদস্য রমিজুল ইসলাম সোহাগ এবং জিয়ানগর থানা যুবসংহতির সাধারণ সম্পাদক আহাদুল ইসলাম শিমুল। জেপি’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবু ও সহ-সাধারণ সম্পাদক কে এম মজিবুর রহমান মজনু প্রমুখ আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভা শেষে জেপি চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদক দলের কেন্দ্রীয় এবং যুবসংহতির নেতাদের নিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটেন।

কাউখালীতে আলোচনা সভা

কাউখালী (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, পিরোজপুরের কাউখালীতে রবিবার সন্ধ্যায় জাতীয় যুবসংহতির (জেপি) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

যুবসংহতির কাউখালী উপজেলা শাখার আহবায়ক জাকির হোসেন নসুর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন উপজেলা জেপির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান খান, সাধারণ সম্পাদক শাহআলম নসু, যুবসংহতির সদস্য সচিব মঞ্জুরুল মাহফুজ পায়েল, যুগ্ম আহবায়ক মিজানুর রহমান, নুরুজ্জামান মনু, মাস্টার মিজানুর রহমান, শামীম আহমেদ, ছাত্রসমাজের সভাপতি জিয়াউল হাসান জুয়েল প্রমুখ।

ইত্তেফাক/নূহু