সাংবিধানিকভাবে, বিশেষ করে আইনিভাবে বৈধ কোনো সরকারকে দেশের ভেতর কিংবা বাইরে থেকে অন্যায়ভাবে ধাক্কা বা চাপ দেয়া যাবে না। ঢাকায় চলমান ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন-আইপিইউ’র সম্মেলনে সোমবার এরকম একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। একইসঙ্গে সার্বভৌম কোনো রাষ্ট্রে অন্য কোনো প্রভাবশালী দেশের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ হস্তক্ষেপও সমর্থন করবে না আইপিইউ, গতকাল এই প্রস্তাবও গৃহীত হয়। তবে দুটি প্রস্তাবেই রাশিয়া ও জার্মানিসহ পাঁচটি দেশ আপত্তি জানায়। পরে ভোটাভুটির মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য-দেশের সমর্থনে প্রস্তাব দুটি গৃহীত হয়।
বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে চলমান সম্মেলনে গতকাল মূলত তিনটি ইস্যুতে আলোচনা হয়। এগুলো হলো- শান্তি ও নিরাপত্তা, গণতন্ত্র এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ও বাণিজ্য। শান্তি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে আলোচনায় অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের প্রতিনিধি দলের সদস্য এবং জাতীয় পার্টি (জাপা) দলীয় এমপি ফখরুল ইমাম প্রস্তাব দুটি গৃহীত হওয়ার বিষয়টি ইত্তেফাককে জানান। আলাপকালে ফখরুল ইমাম জানান, গণতন্ত্র নিয়ে যখন আলোচনা ওঠে তখন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা নানামুখী মত দেন। কেউ বলেছেন- সব দেশে তো নির্বাচিন সরকার দিয়ে দেশ চলছে না। অনেক দেশে তো গণতন্ত্রই নেই। এই পরিস্থিতিতে অন্তত যেসব দেশে আইনিভাবে বৈধ সরকার রয়েছে সেখানে অভ্যন্তরীণভাবে সামরিক বাহিনী এবং বাইরের এনজিও, সুশীল সমাজ ও বর্হিশক্তি যেন হস্তক্ষেপ না করে।
জানা গেছে, গণতন্ত্র এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে আলোচনার পর গৃহীত প্রস্তাবে ‘স্বাধীন’ শব্দটির পরিবর্তে এবার ‘সার্বভৌম’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি ‘ইন্টারফেয়ার’ শব্দের বদলে এবার ‘ইন্টারভেনশন’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। যেখানে বলা হয়েছে, সার্বভৌম কোনো রাষ্ট্রে ইন্টারভেনশন আইপিইউ মেনে নেবে না। শান্তি, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনার সময় যেসব মত উঠে আসে সেগুলোর সারকথা হচ্ছে, জঙ্গিবাদ এখন বৈশ্বিক সমস্যা। এর সঙ্গে জড়িতদের পাকড়াওয়ের পাশাপাশি এতে অর্থ যোগদানদাতাদেরও খুঁজে বের করা জরুরি। এক্ষেত্রে বিশ্বের সংসদগুলো অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার উপরও জোর দেয়া হয়েছে। যুবসমাজ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের মর্যাদা যেন হানি না হয়, সেদিকেও বিশ্বকে সজাগ থাকতে হবে। সর্বোপরি মানবাধিকার রক্ষায় সংসদ এবং এর সদস্যদেরকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার উপর গুরুত্ব দেন আলোচনায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা।
গতকাল বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনার এক ফাঁকে ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ইত্তেফাককে জানান, তৃতীয়দিনের সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের প্রধান ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া এসডিজি’র উপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। সেখানে এসডিজি অর্জনে সরকারের গৃহীত কর্মসূচিগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এই আলোচনায় অংশ নিয়ে রজ্ নামে একজন বিদেশি দার্শনিক বলেছেন- উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি তখনই সত্যিকারের উন্নয়ন হয় যদি সেটা হতদরিদ্র মানুষের জীবনকে স্পর্শ করে।
শিরীন শারমিন জানান, এসডিজির আলোচনায় যে কথাটি উঠে এসেছে তা হলো, ধনী-গরীবের বৈষম্যের বৃত্তকে ভাঙতে হবে। দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষদের বেশি করে সুযোগ দিয়ে সমাজে বৈষম্য দূর করতে হবে। এক্ষেত্রে সমগ্র বিশ্বকে কাজ করতে হবে। দরিদ্রদেরও মেধা বিকাশের জন্য রাষ্ট্রে সমসুযোগ থাকা দরকার। তা হলে যতোই প্রবৃদ্ধি হোক, দারিদ্র্য থেকেই যাবে। মোট কথা, প্রবৃদ্ধির সুফলকে পিছিয়ে পড়াদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন আলোচনায় অর্থনৈতিক রাজনীতির কথা বলেছেন প্রতিনিধিরা। অন্তর্ভূক্তিমূলক গণতন্ত্র ও সামজিক ন্যায়বিচারের কথাও এসেছে।
এসডিজি’র উপর আলোচনায় অংশগ্রহণকারী আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক ইত্তেফাককে জানান, এখানে বেশিরভাগ প্রতিনিধি নারীদেরকে সরাসরি আর্থিক সুবিধা দিয়ে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার উপর জোর দিয়েছেন।
সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য লে. ক. (অব.) ফারুক খান ইত্তেফাককে বলেন, আলোচনায় আফ্রিকার ক্ষরা ও দুর্ভিক্ষ, ফিলিস্তিনে জনবসতি স্থাপন, এক্ষেত্রে ইসরাইলের সংসদের ভূমিকার মত জরুরি বিষয়গুলোতে কথা এসেছে। দুর্বল দেশের উপর শক্তিশালী রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিষয়ে বলা হয়েছে, বাইরের হস্তক্ষেপ কখনও কাম্য হতে পারে না। হস্তক্ষেপ করে কোনো দেশকে বদলে দেয়াও সম্ভব হয় না। কারণ একেকটি দেশের রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক সংস্কৃতি একেকরকম। তিনি বলেন, এই সম্মেলনের বড় বিষয় হচ্ছে-আমরা সবার কথা শুনছি, এর ফাঁকে আমরা নিজেদের কথাগুলোও বলছি। যেমন আমরা একাত্তরে পাকিস্তানের গণহত্যার কথা তুলে ধরেছি। রোহিঙ্গা ইস্যু তুলে ধরেছি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধি দল আমাদের অকুণ্ঠু সমর্থন দিয়েছে। এমনকি রাশিয়াও এ ব্যাপারে মিয়ানমারের সমালোচনা করেছে।
ইত্তেফাক/রাফাত
