স্বাধীনতার লাভের ৪৭ বছর অতিক্রান্ত হলেও জয়পুরহাটের এক অসহায় নারী পাকসেনাদের হাতে সম্ভ্রম হারানো জাহানারা খাতুনের ভাগ্যে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি মিলেনি।
১৯৭১ সালে মুক্তযুদ্ধ শুরু হলে সারাদেশের ন্যায় জয়পুরহাটের খনজনপুরে পাকসেনারা শক্ত ঘাঁটি হিসাবে ক্যাম্প স্থাপন করেন। সেই সময়ে ১৪/১৫ বছর বয়সের সুন্দর চেহারার জাহানারা পাক সেনাদের কু-দৃষ্টি থেকে রক্ষা পায়নি। বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় হানাদার বাহিনীর সদস্যরা। খনজনপুর ক্যাম্পে দিনের পর দিন আটকে রেখে তার ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। স্বামী পরিত্যক্তা ও নিঃসন্তান এই বৃদ্ধার এখন জীবন কাটছে খেয়ে না খেয়ে। জেলা শহরের খনজনপুর পূর্বপাড়া মহল্লায় কবরস্থানের কোনায় একটি কুঁড়ে ঘরে বাস করছেন জাহানারা।
১৯৭১ সালে জাহানারা সর্বস্ব হারালেও স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে কেউ খোঁজ নেয়নি তার। মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই তো দুরের কথা এখন দু’ বেলা খাবারও জোটে না।
পিতা কফিল উদ্দিন ও মা মরিয়ম বেগমের বড় মেয়ে জাহানারা। মা অন্য মেয়ের বাড়িতে থাকেন। এলাকার মানুষ জাহানারা খাতুনকে মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন বীরাঙ্গনা হিসাবে চেনে।
দেশ স্বাধীনের পরে পাশের গ্রামের মোসলেম উদ্দিনের সঙ্গে জাহানারার বিয়ে দেওয়া হয়। কিছুদিন সংসার করার পর সেনা ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া ও ধর্ষিতা হওয়ার বিষয়টি জানার পর স্বামী আর ফিরে নেয়নি জাহানারাকে। এরপর থেকে শিকার হন নানা সামাজিক প্রতিকুলতার। এই অবস্থায় বাবার মৃত্যু, মায়ের সংসারে অভাব সব মিলে এক সময় দিশেহারা জাহানারা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। কখনও হাসি, কখনও কান্না আবার কখনও গান করেন রাস্তার পাশে। সহসা হাত পাতেন না তবে কেউ কিছু দিলে গ্রহণ করেন।
পাকসেনাদের হাতে সম্ভ্রম হারানোর স্বীকৃতি না পেলেও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি এখনো এই পাগল জাহানারার আছে অবিচল আস্থা, এখনো জাতীয় সঙ্গীতের মূর্ছনায় আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। জাতীয় সংগীতের সুর কানে বাজলেই আনমনা ভাবে গেয়ে ওঠেন ’আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’।
জাহানারার জীবনের শেষ পর্যায়ে হলেও বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের সরকার যথাযোগ্য মর্যাদা হিসাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি প্রদান করবেন এমনটায় আশা প্রকাশ করেছেন জয়পুরহাট মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ইউনিট কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আমজাদ হোসেন।
জাহানারার বীরাঙ্গনার স্বীকৃতিসহ সরকারী সহযোগিতা চেয়েছে এলাকাবাসী। ওই এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলার ও আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুস সোবাহান বলেন, অনেক লোক দেখতে এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন জাহানারার দিকে।
জয়পুরহাট মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে জাহানারার বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে আবেদন করা হয়েছে বলে জানান, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাংগঠনিক কমান্ডার জাকারিয়া হোসেন মন্টু।
বিষয়টি স্থানীয় জেলা প্রশাসনের দৃষ্টিতে এলে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্বাবধানে তদন্ত করা হয়। সেখানেও সত্যতা পাওয়ায় তদন্ত প্রতিবেদন সহ বীরাঙ্গনা হিসাবে গেজেটে নাম অন্তর্ভূক্তির একটি আবেদনপত্র পাঠানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সচিব বরাবরে(জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত চিঠির স্বারক নং ৬৬৯ তাং ১৬/১০/১৬)।
ইত্তেফাক/নূহু
