‘আমি শারমিন আক্তার। এ বছর আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। নিজের বাল্যবিয়ে ঠেকিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ’ পুরস্কার পাওয়ার পর মনে হয়েছে—‘এ সম্মান আমার একার নয়; এ সম্মান আমার দেশের মেয়েদের।’ গতকাল বুধবার ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারের ইএমকে সেন্টারে মার্কিন দূতাবাস আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ বছর সাহসী নারীর পুরস্কার পাওয়া শারমিন আক্তার এভাবেই তার অনুভূতির কথা বলেন। সাহসিকতার সঙ্গে নিজের বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করে এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প ও রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি থমাস শ্যামনের হাত থেকে শারমিন আন্তর্জাতিকভাবে সাহসিকতার এ সম্মাননা গ্রহণ করেন। গত ২৯ মার্চ যুক্তরাস্ট্রের ফার্স্ট লেডি’র কার্যালয় হোয়াইট হাউজে এক অনুষ্ঠানে শারমিনের হাতে এ পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। শারমিন ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার মেয়ে। এ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, মার্কিন দূতাবাসের আমেরিকান সেন্টারের কর্মকর্তা মেরিনা ইয়াসমিন ও নুসরাত হোসাইন। শারমিন তার সাহসিকতার পুরস্কারপ্রাপ্তির কথা ও তার জীবনে ঘটে যাওয়া বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতার কথা শোনান সাংবাদিকদের।
শারমিন বলে, ‘তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। হঠাত্ আমার মা আমাকে বলে, ‘তোমাকে বিয়ে করতে হবে।’ আমি বলি, ‘আমি এখন বিয়ে করবো না, লেখাপড়া করবো’। এরপর বলেন, ‘ঠিক আছে তোকে বিয়ে দিবো না’। তারপর মিথ্যে বলে আমাকে খুলনা মামার বাড়ি নিয়ে যায়। পথে দেখি, যে ছেলেটির সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিল, সেও যাচ্ছে। ছেলেটি বলেন, তোমাদের সঙ্গে বেড়াতে যাচ্ছি। খুলনায় আমার মামি খাবার টেবিলে ‘ছেলেটি কে?’ জিজ্ঞেস করে, মা বলেন, ‘আমার মেয়ের জামাই’। তখন আমি ভাবি, ‘আমি কিছু জানি না, আর আমার বিয়েও হয়নি, তাহলে সে আমার জামাই হয় কিভাবে!’ সেই রাতে এ বিষয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলে, মা আমাকে মারধর করে বলে, ‘এই ছেলেকেই তোর বিয়ে করতে হবে’। এরপর আমি পালিয়ে যাই। পিরোজপুরে বাসস্ট্যান্ড থেকে আমাকে আবার ধরে নিয়ে মারধর করে। তখন আমি কৌশল করে মাকে বলি, ‘ঠিক আছে বিয়ে করবো, কিন্তু আমাকে স্কুলে যেতে যাও, আমি বান্ধবীদের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে একটু কথা বলি’ মা আমাকে স্কুলে যেতে দেয়, স্কুলে বান্ধবীদের সঙ্গে কথা বলে এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলি এবং মামলা করি। ওই মামলায় আমার মা ও ওই ছেলের জেল হয়, তারা বর্তমানে জামিনে আছেন; তবে মামলা চলছে।
এ ঘটনার পর আমি ‘চ্যানেল আই স্বর্ণ কিশোরী’ পুরস্কার পাই। সংবাদপত্রে অনেক খবর ছাপা হয় আমাকে নিয়ে। এরপর আমেরিকায় সাহসী নারীর পুরস্কার পেলাম।
আমি বড় হয়ে আইনজীবী হতে চাই। পাশাপাশি আমি আমার জেলা ঝালকাঠি ও অন্য সব জেলার মেয়েদের নিয়ে কাজ করবো।
শারমিন বলেন, আমার মতো শিশু-কিশোরীদের অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলবো, তারা যেন তাদের কন্যা সন্তানকে বোঝা না মনে করেন, তাদের যেন লেখাপড়া করায়। আর মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলে, ‘মেয়েরা যেন নিজেদের একা মনে না করে, তারা একটু সাহসী হয়’।
ইত্তেফাক/নূহু
