তুরস্কে এক ঐতিহাসিক গণভোটে সামান্য ব্যবধানে জয় পেয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান। এই জয় তার ক্ষমতা ২০২৯ সাল পর্যন্ত পাকাপোক্ত করার পথ সুগম করেছে। এখন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে তিনি সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবে রূপ দিতে পারবেন। এটা হলে তুরস্ক পার্লামেন্ট শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার ব্যবস্থায় প্রবেশ করবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা হবে আধুনিক তুরষ্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংস্কার।
রবিবারের গণভোটে তুরস্কের মানুষ ভোট দিয়েছে হ্যাঁ ও না ভোটে। হ্যাঁ ভোটের পক্ষে ৫১ দশমিক ৩৭ ভাগ আর না ভোটের পক্ষে পড়েছে ৪৮ দশমিক ৬৩ ভাগ ভোট। নির্বাচনে জয়ের পর এরদোয়ানের সমর্থকরা রাস্তায় নেমে উল্লাস করে। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান গণভোটের ফলাফলকে ‘স্পষ্ট’ অভিহিত করে জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। গণভোটের ফলাফল সবাইকে মেনে নিতে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, তুরস্কের জনগণ একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম আঙ্কারায় জনসাধারণের উদ্দেশে বক্তৃতায় বলেছেন, আমাদের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় শুরু হলো। আমরা একই সত্তা, একই জাতি।
তবে দেশটির প্রধান দুটি বিরোধী দল ফল এখনো মেনে নেয়নি। বিরোধীরা নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে। তারা বলছে, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ভোটের হিসেবে গড়মিল করেছে এবং একে সুপ্রিম ইলেকশন বোর্ডে চ্যালেঞ্জ করা হবে বলে জানিয়েছে। রিপাবলিকান পিপলস পার্টি অন্তত ৬০ শতাংশ ভোট পুনঃগণনার দাবি জানিয়েছে। তুরস্কের বড় তিন শহর ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা ও ইজমিরে না ভোট পড়েছে বেশি। ভোট গণনার পর ইস্তাম্বুলে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে থাকে এরদোয়ান বিরোধীরা। তবে গণভোটের ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্ন তোলার পর নির্বাচন কর্তৃপক্ষের প্রধান সাদি গুভেন গতকাল সোমবার এ ফলাফলকে বৈধ বলে দাবি করেন। ভোটের ফলাফলের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের পর্যবেক্ষণ প্রকাশের কথা রয়েছে। খবর:বিবিসি ও আল জাজিরার।
প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের দাবি করা ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় বহাল থাকলে এবং সংবিধানে সংশোধনী আনা হলে প্রেসিডেন্ট সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হবেন। প্রেসিডেন্ট হবেন নির্বাহী প্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান এবং রাজনৈতিক দলের সাথেও তার সম্পর্ক বজায় থাকবে। আর প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা বিলুপ্ত করে দুই বা তিনজন ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ তৈরি করা হবে। প্রেসিডেন্ট মন্ত্রীদের নিয়োগ দেবেন, বাজেট তৈরি করবেন, সিনিয়র বিচারপতিদের অধিকাংশকে নিয়োগও দেবেন তিনি এবং ডিক্রি জারি করে কিছু বিষয়ে আইনও করতে পারবেন। মন্ত্রিপরিষদও তার ইচ্ছার বাইরে যেতে পারবে না।
প্রেসিডেন্ট একাই জরুরি অবস্থা জারি করতে পারবেন, পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে পারবেন। পার্লামেন্ট আর মন্ত্রীদের ব্যাপারে তদন্ত করতে পারবে না। সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভোটে পার্লামেন্ট সদস্যরা প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন। প্রেসিডেন্টের বিচারের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ পার্লামেন্ট সদস্যের সমর্থন লাগবে। পার্লামেন্ট সদস্যের সংখ্যা ৫৫০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০ করা হবে। প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন একই দিনে হবে। প্রেসিডেন্ট দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৩ নভেম্বর ২০১৯। তখন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান পাঁচ বছর করে আরও দুই মেয়াদে ২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকতে পারবেন। কিন্তু দ্বিতীয়বার মেয়াদ শেষের আগেই আইনসভা ভেঙে দেওয়া হলে তাঁর তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পথও খোলা থাকবে। ১৯২৩ সালে প্রজাতন্ত্র ঘোষণার পর সাংবিধানিকভাবে কোনও একক ব্যক্তির হাতে এমন ক্ষমতা এর আগে আসেনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যর্থ অভূত্থানের পর থেকে নিজের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার চেষ্টায় থাকা প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের অবস্থান এই গণভোটে আরও শক্তিশালী হবে এবং শেষ পর্যন্ত এটি এক ব্যক্তির শাসনে পরিণত হতে পারে, যেটি হবে কোন ধরনের ভারসাম্যহীন একটি রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা।
তবে প্রেসিডেন্টের সমর্থকরা বলছেন, এই রায় তুরস্ককে আধুনিক করবে। টালমাটাল অর্থনীতি, একাধিক জঙ্গি হামলা, সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা, কুর্দিদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ, সিরিয়ার যুদ্ধ একের পর এক ধাক্কার মুখে দেশের লাগাম ধরার জন্য একটা শক্ত হাত খুবই দরকার।
ইত্তেফাক/নূহু
