বাবরি মসজিদ: শতাব্দীব্যাপী হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দের সংক্ষিপ্ত কালপরিক্রমা

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০১৭, ১৯:০১
দেড়শ বছর ধরে ভারতের অযোধ্যায় অবস্থিত বাবরি মসজিদ হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিরোধ কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। ১৬ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের সময় বাদশাহ বাবরের নামে এই মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হলেও হিন্দুদের দাবি এটি ছিল রামের জন্মভূমি। 
 
বুধবার বাবরি মসজিদ ভাঙার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতায় লালকৃষ্ণ আদভানিসহ শীর্ষ বিজেপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তদন্তের অনুমোদন দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। এই প্রেক্ষিতে ভারতীয় দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া এই দেড় শতাব্দীব্যাপী চলমান সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক বিরোধের টাইমলাইন তুলে ধরেছে।
 
১৮৫৩- অযোধ্যার সবাব ওয়াজিদ আলি শাহের রাজত্বের সময়ে নির্মোহী নামে এক হিন্দু সম্প্রদায় দাবি করে বাবরি মসজিদ তৈরি করার জন্য একটি হিন্দু মন্দির ধ্বংস করা হয়। লিপিবদ্ধ ইতিহাসে এটাই বাবরি মসজিদ নিয়ে প্রথম সহিংসতার ঘটনা।
 
১৮৫৯- ব্রিটিশ প্রশাসকরা সেখানে একটি বেড়া তৈরি করে হিন্দু ও মুসলিমদের প্রার্থণার আলাদা আলাদা জায়গা তৈরি করে। অন্দরমহল হিন্দুদের ব্যবহারের জন্য দেয়া হয় আর মুসলমানদের দেয়া হয় বাইরের জায়গ।
 
১৮৮৫- মহন্ত রঘুবীর দাস মসজিদের বাইরে রামছাবুত্রার উপর সামিয়ানা তৈরির অনুমতি চেয়ে মামলা করেন। তার আবেদন প্রত্যাখাত হয় ফাইজাবাদ জেলা আদালতে।
 
১৯৪৯-  রামের মন্দির পাওয়া যায় মসজিদের ভেতর। অভিযোগ করা হয় হিন্দুরা এই কাজ করেছে। দুইপক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে মামলা করে। সরকার এই বাবরি মসজিদ প্রাঙ্গণকে বিরোধপূর্ণ ঘোষণা করে তালা লাগিয়ে দেয়।
 
১৯৫০- গোপাল সিং বিশারদ ও মহন্ত পরমহংস রামচন্দ্র দাস ফাইজাবাদ আদালতে জন্মাষ্টমীর সময়ে মন্দিরে প্রার্থনার আবেদন করেন। অন্দরমহল তালাবন্ধ থাকলেও প্রার্থনার অনুমতি দেয়া হয়।
 
১৯৫৯- নির্মোহী আখড়া ভূমির মালিকানা চেয়ে তৃতীয় মামলা দাবি করে। মামলায় একে রাম জন্মভূমি উল্লেখ করে নিজেদের এর রক্ষক বলে দাবি করে।
 
১৯৬১- সুন্নি সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ড মসজিদের ভেতর মূর্তি উপস্থাপনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। সেই মামলায় সেই ভূমিকে মসজিদ ও আশেপাশের ভূমিকে কবরস্থান বলে উল্লেখ করা হয়।
 
১৯৮৪- হিন্দুগোষ্ঠী কথিত রামজন্মভূমিতে মন্দির নির্মাণের উদ্দেশ্যে কমিটি গঠন করে। বিজেপি নেতা এলকে আদভানি এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
 
১৯৮৬- হরিশঙ্কর দুবের আবেদনের প্রেক্ষিতে এক আদালত নির্দেশ দেয় যে মসজিদ খুলে হিন্দুদের প্রার্থনা করার সুযোগ দেয়া হোক। মুসলমানরা এর প্রতিবাদে বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটি গঠন করে।
 
১৯৮৯- বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বাবরি মসজিদের পাশে রামমন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। পরিষদের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জাস্টিস দেওকি নন্দন মামলা দায়েল করেন যেন বাবরি মসজিদকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়া হয়। সেই সময় ফাইজাবাদ আদালতে ঝুলে থাকা চারটি মামলা হাইকোর্টের স্পেশাল বেঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়।
 
১৯৯০- বিশ্ব হিন্দু পরিষদের স্বেচ্ছাসেবীরা বাবরি মসজিদের ক্ষতিসাধন করে। সেই সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখর আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধাসের চেষ্টা করেন। সেই বছরের সেপ্টেম্বরে অযোধ্যা আন্দোলন সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করতে রথযাত্রা পালন করেন বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি। গুজরাটের সোমনাথে যাত্রা শুরু করে অযোধ্যায় শেষ করেন তিনি।
 
১৯৯১-  রথযাত্রায় ভর করে উত্তর প্রদেশে ক্ষমতায় আরোহণ করে বিজেপি, হয়ে উঠে প্রধান বিরোধী দল। করসেবক নামের স্বেচ্ছাসেবীদের উৎসাহে অযোধ্যা আন্দোলন বেগবান হয়।
 
১৯৯২- ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, শিবসেনা ও বিজেপির সমর্থনে বাবরি মসজিদকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে করসেবক স্বেচ্ছাসেবীরা। আর এর জেরে ভারতজুড়ে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। কমপক্ষে ২ হাজার মানুষ নিহত হয় সেই দাঙ্গায়। সেই বছরেরই ১৬ ডিসেম্বর জাস্টিস লিবারহানের নেতৃত্বে ঘটনার তদন্ত কমিটি গঠন করে নরসিমা রাও নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার।
 
২০০১- বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার বর্ষপূর্তিতে বিশ^ হিন্দু পরিষদ পুনরায় বাবরি মসজিদ প্রাঙ্গণে রাম মন্দির স্থাপনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।
 
২০০২- গুজরাটের গোধরা থেকে অযোধ্যাগামী করসেবকদের বহণকারী ট্রেনে হামলায় ৫৮ জন নিহত হয়। আর এর জের ধরে পুরো গুজরাটে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, নিহত হয় ১ হাজার মানুষ। ভারতের হাইকোর্টের প্রতœতত্ব জরিপ বিভাগকে নির্দেশ দেয় খনন করে নিশ্চিত করতে বাবরি মসজিদের নিচে কোনো মন্দির ছিল কী না। তিন বিচারপতি শুনানি শুরু করেন।
 
২০০৩-  ভারতের প্রত্নতত্ব বিভাগ দাবি করে বাবরি মসজিদের নিচে মন্দিরের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলো সেটি প্রত্যাখ্যান করে। সেপ্টেম্বরে এক আদালতের রায়ে বলা হয়, বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও সহিংসতার জন্য সাত হিন্দু নেতাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। সেই সময় উপ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আদভানি, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দায়েল করা হয়নি।
 
২০০৪- কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পরে উত্তর প্রদেশের এক আদালতের রায়ে বলা হয় আদভানির দায়মুক্তির বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনা করে দেখা হোক।
 
২০০৫- সন্দেহভাজন জঙ্গিরা বিরোধপূর্ণ ভূমিতে হামলা চালায়। নিরাপত্তা বাহিনী ৫ জঙ্গিকে হত্যা করে, একজন অচিহ্নিত ব্যক্তিও নিহত হন।
 
২০০৯- লিবারহ্যান কমিশনের প্রতিবেদন দাখি কনের যেখানে মসজিদ ভাঙার জন্য বিজেপি নেতাদের দায়ী করা হয়। 
 
২০১০- এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে বিরোধপূর্ণ ভূমিটি তিনভাগে ভাগ করা হয়, একভাগ- হিন্দুমহাসভা, একভাগ- ইসলামিক ওয়াকফ বোর্ড ও একভাগ নির্মোহী আখড়াকে দেয়া হয়। ডিসেম্বরে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে ওয়াকফ বোর্ড ও অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা।
 
২০১১- সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়, এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় বহাল থাকবে।
 
২০১৪- নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি ক্ষমতায় আরোহণ করে। 
 
২০১৫- ভারতীয় হিন্দু পরিষদ রাম মন্দির তৈরি করতে দেশজুড়ে পাথর সংগ্রহ অভিযান শুরু করে। ছয়মাস পরে দুই ট্রাক পাথর সেখানে নিয়ে আসা হয়। মহন্ত নৃত্য গোপাল দাস দাবি করেন, মন্দির নির্মাণে সবুজ সংকেত দিয়েছে মোদী সরকার। অখিলেশ যাদবের নেতৃত্বাধীন উত্তর প্রদেশ সরকার ঘোষণা দেয় তারা রাম মন্দির তৈরির পাথর অযোধ্যায় প্রবেশ করতে দেবে না।
 
২০১৭, মার্চ- ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট বলে বাবরি মসজিদ ভাঙার দায়ে আদভানি সহ অন্যান্য হিন্দু নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করা যাবে না। এই মামলা পুনরুজ্জীবিত করা যাবে।
 
২১ মার্চ, ২০১৭- সুপ্রিম কোর্ট বলে বিষয়টি সংবেদনশীল এবং আদালতের বাইরে এর সমাধান করতে হবে। দুই পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার আহ্বান জানায় আদালত।
 
এপ্রিল ১৯, ২০১৭- বাবরি মসজিদ ভাঙার ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের অভিযোগে আদভানিসহ বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়ে সিবিআইয়ের আবেদন মঞ্জুর করে সুপ্রিমকোর্ট।
 
ইত্তেফাক/সাব্বির