হাওয়ার ওপর চলে ওদের গাড়ি, লাগে না পেট্রোল ডিজেল, মানুষ একটা দুই চাকার সাইকেল। হ্যাঁ মানুষ নামের সাইকেলে পেট্রোল ডিজেল না লাগলেও খুকুমণি, নিলুফা ইয়াসমিন শিলা, সোনিয়া লায়লা, মাহিনুর আক্তার, সাকিয়া হক, মানশি সাহা, মুক্তা, সুমা, নিপার দুই চাকার যান্ত্রিক সাইকেল স্কুটিতে পেট্রোল লাগে।
ঢাকার জীবনযাত্রায় একটা যান্ত্রিক সাইকেল নারীর জীবনে কতটা গতি আর স্বাধীনতা এনে দিয়েছে তারই গল্প শুনছিলাম সংসদ ভবন চত্বরে। ফেসবুকে স্বপ্নচারিণী নামের নারী স্কুটি চালকদের একটা ক্লোজগ্রুপ আছে। পেশায় তারা কেউ উন্নয়নকর্মী, কেউ হিসাবরক্ষক, কেউ ব্যবস্থাপক, কেউবা শখের ভ্রমণকারী। ভিন্ন পেশায় নিয়োজিত তারা, শহরের ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে তাদের অবস্থান। কাজের প্রয়োজনে ছুটতে হয় তাদের শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। আর এই ছোটাছুটিকে সহজ করে দিয়েছে স্কুটি।
গণপরিবহনে রাষ্ট্র ৯ সিট বরাদ্দ দিয়ে তার দায়দায়িত্ব শেষ করে ফেলেছে। পিক আওয়ারে তো ৯ সিটের পর আর কোনো নারীকে গাড়িতে তোলা হয় না সিট নেই, সিট নেই বলে। পিক আওয়ারে ঢাকায় নারীর যাত্রায় যে কতটা কষ্টকর তা শুধুই ভুক্তভোগী নারীরা জানে। তবে স্কুটি চালক নারীরা এখন ঢাকায় চলাচলে অনেকটাই স্বাধীন। অফিস থেকে ফেরার পথে এখন আর বাসের ৯ সিটের পিছনে ছুটতে হয় না। বাসের সিট না থাকলেও তাদের পিছনের সিটে সহকর্মীরা স্থান পায়।
নিলুফা ইয়াসমিন শিলা কর্মরত আছেন আগোরায়। পাশের দেশের তুলনায় স্কুটির দামটা অনেক বেশি। রাস্তায় কোনো নারী স্কুটি চালক দেখলেই আমাদের বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এভাবেই আমাদের মাঝে নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে। শহরে এখন নারী স্কুটি চালকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। যাতায়াতের ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে যাদের একটু সামর্থ্য আছে তারাই স্কুটি কিনছে।
যারা একটু দক্ষ তাদের দায়দায়িত্ব যেন একটু বেশি। কারো স্কুটি বিষয়ক কোনো সমস্যা হলে ফোন আসে। যেমন খুকুমণি দুই চাকার যান্ত্রিক সাইকেল চালানোর তার অভিজ্ঞতা প্রায় ১৫ বছর। আর তাই তার কাছে ফোন আসে সবচেয়ে বেশি। নতুনরা ফোন দিয়ে আপা গাড়ি স্টার্ট হচ্ছে না, ইঞ্জিন গরম হয়ে যাচ্ছে বেশি, ইঞ্জিন অয়েল কত কিলোমিটার চলার পর পরিবর্তন করব, কোথায় সার্ভিসিংয়ের জন্য ভালো। অভিজ্ঞতা থেকে হাসিমুখে খুকুমণি উত্তর দিয়ে যান।
খুকুমণি বলেন, আমি যখন স্কুটি কিনেছি তখন ঢাকায় গোটা ১০ নারী স্কুটি চালকও ছিল না। ঐ সময় রাস্তায় সবাই অবাক হয়ে দেখত। তখন গাড়ির কোনো সমস্যা হলে কারো সঙ্গে আলোচনা করব তার ব্যবস্থা ছিল না। এখন তো আমাদের বিশাল নেটওয়ার্ক। নিমিষেই সবকিছুর উত্তর পাওয়া যায়।
আমরা সুযোগ পেলেই ঘুরতে বের হয়ে পড়ি। আমাদের কাছে ঘোরাঘুরি মানেই দিন তিনেকের জন্য সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা নয়। আমরা ঢাকায় কিংবা ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে ঘুরিফিরি। কয়েকদিন আগে ঘুরে আসলাম মৈনটঘাট। সকাল নয়টায় রওনা হয়ে মৈনটঘাট ঘুরে চলে আসলাম দুপুর তিনটায়। সকাল ৯টায় আমরা ১০ জনের দল রওনা হলাম। তারপর সারাদিন ঘুরেফিরে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরা।
মাহিনুর আক্তার নিপা। ভ্রমণ তার শখ নেশা যা-ই বলা হোক না কেন কোনো আপত্তি নেই। নিজের পরিচয় ভ্রমণকারী হিসেবে দিতেই বেশি পছন্দ করেন। দেহকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য খাদ্য দরকার হয়। কিন্তু মনের? মনকে তো সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। জীবন মানে শুধুই সময় পার করা নয়। সময় তো খাঁচায় বন্দি পশু-পাখিও পার করে। আমরা জীবন উপভোগ করতে চাই। তাই যখনই সময় পাই আমরা ছুটে যাই।
আমরা ছুটে যাই জীবন উপভোগ করব বলে রুহিতপুর, জাহাঙ্গীরনগর, বিরুলিয়া, মৈনটঘাট, বৈদ্যবাজার, চুনারচর, ওয়াসপুর, পুরান ঢাকা। ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ গতিতে গাড়ি চালাই আমরা। কারণ এই গতিটা নিরাপদ এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী। আমাদের দলের হেলমেট পরা এবং ট্রাফিক আইন মানা বাধ্যতামূলক। আমরা রাস্তায় পথচারীদের সম্মান করে চলি। তাই কখনোই ফুটপাতে স্কুটিটি তুলে দেই না।
ঢাকায় এখন অনেক গ্রুপ আছে নারী স্কুটি চালকদের। এই গ্রুপগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বেশ তত্পর। নারী স্কুটি চালকদের গ্রুপগুলো বেশির ভাগ ক্লোজগ্রুপ। সপ্তাহে বা মাসে কোনো কোনো দিন তারা ঘুরতে বের হয়ে যায় দলবেঁধে। তেমনি একটি গ্রুপ ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ। ফেসবুকে তাদের শুধু নারী সদস্য সংখ্যা ৮ হাজার। ২০১৮ সালে এপ্রিল মাসে ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করবে তারা। ইতোমধ্যে নারী চোখে বাংলাদেশ নামে তারা সারাদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছে। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে গত ৬ এপ্রিল রওনা দিয়ে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত চারজনের দল ঘুরে আসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, নরসিংদী জেলা।
কেমন ছিল সেই ভ্রমন? কথা হয়েছিল সেই দলের নারী ভ্রমণকারী নাজমুন নাহার মুক্তা ও শামছুর নাহার সুমার সঙ্গে। একজন ইডেন কলেজে অন্যজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। আমরা শুধুই ঘুরতে চাই না। ঘোরাঘুরি ছাড়াও আমরা চাই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে বিভিন্ন সামাজিক কাজে এগিয়ে আসতে।
তাই নারী চোখে বাংলাদেশ ভ্রমণে আমরা যেখানে গিয়েছি সেখানে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী ক্ষমতায়ন, পরিচ্ছন্নতা বিয়ষক প্রচারণা চালিয়েছি। আমাদের দলের সাকিয়া হক ও মানসি সাহা তুলি দুজনই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে পড়ে। তারা বর্তমানে মালয়েশিয়াতে আছেন। তারা ঢাকায় ফিরে আবারও শুরু করবে যাত্রা ‘নারীর চোখে বাংলাদেশ’ ভ্রমণের ।
সোনিয়া লায়লা উন্নয়নকর্মী, মাত্র কয়েক মাস হলো স্কুটি চালাচ্ছেন। নানা সীমাবদ্ধতার মাঝে তার নিজের একটা স্কুটি আছে তাতে গর্ববোধ করেন। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে সকাল বিকাল রাত যখনই দরকার তখনই আমরা ছুটতে পারি।
