আমরা এখন বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে টাকা চাইতে যাই না, নিজেরাই ফান্ড করেছি

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০১৭, ০০:৫৯


পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, ‘বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ মানুষ ৩০ থেকে ৪০ বছরের নিচে। তারুণ্যের এই শক্তি বাংলাদেশের সর্বোত্কৃষ্ট সম্পদ। বাংলাদেশের অগ্রগতিকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। বাংলাদেশ এখন সবুজ অর্থনীতি পেরিয়ে ব্লু ইকোনোমির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, আমরা এখন বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে টাকা চাইতে যাই না। আমরা নিজেদের টাকাতেই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ‘ফান্ড’ সৃস্টি করেছি। বর্তমান সরকার সেই শক্তি অর্জন করেছে। সারাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ চলছে।’ পঞ্চম এইচএসবিসি-ডেইলি স্টার জলবায়ু পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ এক নতুন বাংলাদেশ উঠে দাঁড়াচ্ছে। শহরে বসে সেই অগ্রগতি চোখে পড়বে না। আমি সকলকে বলি, তোমরা শহর দেখে বাংলাদেশ বিচার করো না। গ্রামে যাও। আজকে ঢাকা থেকে যে কোন উপজেলায়, ইউনিয়নে মানুষ যাতায়াত করতে পারছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। উপজেলার মাধ্যমে ছোট শহর গড়ে উঠছে। পৌরসভার আওতায় আসছে। এতে মানুষের জীবনে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি ‘সবুজ’ দেশ। মানুষের মাঝে পরিবেশ সচেতনতা বেড়েছে। গ্রামরে মানুষ বাজারে গিয়ে অন্য কেনাকাটার পাশাপাশি গাছ কিনছে। তাার গাছ লাগাচ্ছে। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে দেশের মানুষ বাংলাদেশকে সবুজ দেশে পরিণত করেছে।

মন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমরা পরিবেশের ক্ষতি করছি না। উন্নত বিশ্বের লোকেরাও লক্ষ লক্ষ টন প্লাস্টিক বোতল সমুদ্রে ফেলে পরিবেশ দূষণ করছে। তবে এটাও ঠিক যে, এর জন্য মানুষের পরিবেশের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।’

গতকাল শনিবার রাজধানীর হোটেল র্যাডিসনের উত্সব হলে আয়োজিত এ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন-এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফ্রাসোঁয়া ডি মেরিকো। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন এইচএসবিসি বাংলাদেশের উপ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং হেড অব কমার্শিয়াল মাহবুবউর রহমান। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মাহমুদুর রহমান। ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ গানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি পর্যায়ে নানামুখী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের প্রিয় এই মাতৃভূমিকে জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচাতে কাজ করে যাচ্ছেন অনেকে। যেসব প্রতিষ্ঠান জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় কাজ করছেন তাদের মধ্যে নির্বাচিত ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে গতকাল প্রদান করা হয় এইচএসবিসি-ডেইলি স্টার জলবায়ু পুরস্কার। এইচএসবিসি পাঁচ বছর ধরে এ পদক প্রদান করছে।

এ বছর ক্লাইমেট চ্যাম্পিয়ন ইন গ্রিন বিজনেস অর্জন করেছেন ইস্পাহানি এগ্রো লিমিটেড, ক্লাইমেট চ্যাম্পিয়ন ইন গ্রিন অপারেশন্স (বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান) জিতেছে ডিবিএল গ্রুপের হামজা টেক্সটাইল লিমিটেড, ক্লাইমেট চ্যাম্পিয়ন ইন গ্রিন অপারেশন্স (আংশিক বিদেশি প্রতিষ্ঠান) জিতেছে রেনাটা লিমিটেড, ক্লাইমেট চ্যাম্পিয়ন ইন কমিউনিটি এনগেজমেন্ট বিভাগে পদক পেয়েছে সেন্টার ফর রিহ্যাবিলিটেশন অব দি প্যারালাইজড- সিআরপি। এছাড়া জুরি বোর্ড দুইটি বিশেষ পুরস্কার প্রদান করে। এদের মধ্যে নদী দখল রোধ ও পাহাড় রক্ষাকল্পে বিশেষ অবদানের জন্য মুহাম্মদ মুনির চৌধুরী এবং বই লিখে মানুষের মাঝে জনসচেতনতা, বৃক্ষ রোপণ ও ঢাকা শহরে ১০০ বছর ও তার বেশি বয়সের গাছের তালিকা তৈরিতে অবদান রাখায় পুরস্কার পেয়েছেন মোকারম হোসেন। ক্লাইমেট চ্যাম্পিয়ন ইন নলেজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগে এ বছর কেউ পুরস্কৃত হননি। অতিথিবৃন্দ পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে পদক তুলে দেন।

সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরী বলেন. এ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান প্রমাণ করে বাংলাদেশের মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ করছে। ব্যক্তি পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে। এটা আশার কথা। বাংলাদেশ সরকারও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় যথেষ্ট তত্পর। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিবেশ রক্ষায় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানা বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। যাতে শিল্প স্থাপন করতে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি না হয়। সেইসঙ্গে গ্রিন ব্যাংকিং চালু করা হয়েছে। এই গ্রিন ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতিকারক ব্যবসায় অর্থ লগ্নি বন্ধ করা হয়েছে।

মাহফুজ আনাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা আগামীকালের সমস্যা নয়। এটা আজকের সমস্যা, এখনকার সমস্যা, এই মুহূর্তের সমস্যা। যাকে এখন থেকেই মোকাবেলা করতে হবে। এই পরিবর্তনের ঝুঁকি এতই ভয়াবহ যে, এক থেকে দুই বছরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা বাংলাদেশের উত্পাদনশীলতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। মানুষের ধারণা- জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আমাদের জীবনে পড়বে না— এটা অন্যদের সমস্যা। এমনটা যারা ভাবছেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন।

ফ্রাসোঁয়া ডি মেরিকো বলেন, বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখোমুখি। আমাদের সম্মিলিতভাবে পৃথিবীর বুকে নেমে আসা এই ঝুঁকির মোকাবেলা করতে হবে। এইচএসবিসি ব্যাংক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করছে।

মাহবুব উর রহমান বলেন, এখন বিশ্বের সবচেয় বড় ঝুঁকি হয়ে দেখা দিয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতা। পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন করে না এইচএসবিসি। উপকূলের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবে উপকূলের মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি আমাদের পুরো জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতির ওপরে পড়ছে।

ইত্তেফাক/নূহু