বছরজুড়ে মাসে মাসে কমেছে রেমিট্যান্স

আপডেট : ০৪ মে ২০১৭, ০৯:১৯
 
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের প্রতিমাসেই আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় রেমিট্যান্স কমেছে। রেমিট্যান্স বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু উদ্যোগ নিলেও তা হালে পানি পায়নি। ফলে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্বেগ সহসাই কাটছে না। বিশ্বব্যাংকও বলছে, পর পর দুই বছর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে ধস নেমেছে, যে প্রবণতা গত তিন দশকে দেখা যায়নি।
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ২৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার। অন্যদিকে গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল এক হাজার ২২৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার। অর্থাত্ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমেছে ১৯৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ১৬ শতাংশেরও বেশি। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছর দেশে ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ১১ লাখ ডলার ও ২০১৪-১৫ অর্থবছর ১ হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। সে হিসাবে গত বছর দেশে রেমিট্যান্স কমেছিল আড়াই শতাংশ।
 
একক মাস হিসাবে চলতি বছরের এপ্রিলে ১০৯ কোটি ২৬ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা গত বছরের একই মাসে ছিল যার পরিমাণ ছিল ১১৯ কোটি ১১ লাখ ডলার। সে হিসেবে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় রেমিট্যান্স কমেছে নয় কোটি ৮৫ লাখ ডলার বা ৮ দশমিক ২৭ শতাংশ।
 
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, রেমিট্যান্স কমার কারণ অনুসন্ধানে একটি রিসার্চ কমিটি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে বিভিন্ন ব্যাংকের অনুরোধে হুন্ডি বন্ধের লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোতেও চিঠি পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। আর পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আনার লক্ষ্যে বিদেশে এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলা সহজ করা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন নানা পদক্ষেপের পরও ধারবাহিকভাবে কমেই চলেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স পরিমাণ। তাই এ বিষয়ে উদ্বেগ কাটছে না বাংলাদেশ ব্যাংকের।
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনটি বড় কারণে রেমিট্যান্স কমে যাচ্ছে। সেগুলো হলো, তেলের দাম কমে যাওয়া, ইউরো এবং পাউন্ডের বিনিময় মূল্য পড়ে যাওয়া এবং হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ। রেমিট্যান্স কমার পেছনে বেশ কিছু কারণ শনাক্ত করেছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক। তাদের মতে, সামপ্রতিক সময়ে টাকার বিপরীতে পাউন্ড, ইউরো, রিয়ালের দর কমে গেছে। এ কারণে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে টাকা পাচ্ছেন কম। যে জন্য তারা এখন রেমিট্যান্স পাঠানো কমিয়ে ধরে রাখছেন। দর বাড়লে পাঠাবেন। সমপ্রতি হুন্ডির প্রবণতা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যেসব রেমিট্যান্স আসছে সেগুলোর বেশিরভাগই হচ্ছে হুন্ডি।
 
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের দেশগুলোয় বর্তমানে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। এ জন্য কাজের ক্ষেত্র যেমন সংকুচিত হয়েছে, তেমনি বেতন-ভাতার পরিমাণও কমে গেছে। ফলে প্রবাসীদের আয়ও কমে গেছে। এসব কারণেই রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরি যাওয়ার কারণে প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোয় আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন।
 
ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্স কমে যাওয়া বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে। তাই এখনই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।
 
এদিকে বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পর পর দুই বছর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে ধস নেমেছে, যে প্রবণতা গত তিন দশকে দেখা যায়নি। ২০১৬ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৪২ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে নেমেছে। ২০১৫ সালে এই দেশগুলোর রেমিট্যান্স আয় ছিল ৪৪ হাজার কোটি ডলার। ভূ-মধ্যসাগরীয় দেশগুলো ও রুশ ফেডারেশনে তেলের দরপতন ও দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি ইউরোপে দুর্বল প্রবৃদ্ধির কারণে আফ্রিকার উত্তর ও সাহারা মরু অঞ্চলের দেশগুলোর প্রবাসী আয় কমেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ডলারের হিসাবে এই রেমিটেন্সের ধস আরও বাজে পরিস্থিতিতে যখন তা তুলনামূলক দুর্বল ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড ও রুশ রুবলের সঙ্গে বিনিময় করা হয়। এর ফলে ব্যাপক প্রবাসী আয় অর্জনকারী দেশগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহে মারাত্মক পতন দেখা গেছে।
 
ইত্তেফাক/কেকে