প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে হবে

আপডেট : ১২ মে ২০১৭, ১১:৩৫
 
প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতার যুগে শিশুরা যখন বয়স্কদের সঙ্গে সঙ্গে টেলিভিশন ও কম্পিউটারের সঙ্গে সময় কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, সেখানে বিদেশি দৈনিক ডেইলি এক্সপ্রেস এ প্রকাশিত একটি রিপোর্ট থেকে চমত্প্রদ ও বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া গেছে।
 
প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, মাত্র নয় বছর বয়সী ফেইথ জ্যাকসন সাত মাসে ৩৬৪টি বই পড়েছে! ফেইথ জ্যাকসন সমবয়সী অন্যদের মতো টেলিভিশন বা কম্পিউটার গেমসে মোটেই আসক্ত নয়। বইয়ের পাতায় লুকানো স্বপ্নরাজ্যে মগ্ন থাকাই বেশি পছন্দ তার।
 
যুক্তরাজ্যের চেশায়ারের অ্যাশলে এলাকার বাসিন্দা ফেইথ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রেরণায় দুই বছর আগে বই পড়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়। ফেইথের মা ৩৫ বছর বয়সী লরেন জানান, তার সন্তানের কাছে বই পড়ার আকর্ষণ টেলিভিশন বা কম্পিউটারের মতোই উদ্দীপক। তবে পড়ার সময় কল্পনার রাজ্যে বিচরণের যে সুযোগ রয়েছে, সেটা শুধু যন্ত্রের পর্দায় চোখ আটকে থাকলে পাওয়া যায় না।
 
রোয়াল্ড ডালের যে কোনো লেখা বা হ্যারি পটার সিরিজের বইগুলো ফেইথের ভীষণ পছন্দ। জন্তু-জানোয়ার, জাদুকরি ঘটনাবলির সমাহার আর দুঃসাহসী অভিযাত্রার গল্প ভালোবাসে সে। বিপুল পরিমাণ বই পড়ে ফেলার স্বীকৃতির সনদ সে পেয়েছে হাউ টু ট্রেইন ইয়োর ড্রাগন বইয়ের লেখক ক্রেসিডা কাওয়েলের কাছ থেকে।
 
লেখক ক্রেসিডা বলেন, আনন্দের জন্য পাঠাভ্যাস একটি শিশুর শিক্ষা জীবনে সাফল্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সব শিশুই ফেইথের মতো পড়ার মধ্যে আনন্দ খুঁজে পেলে সেটা জাতির জন্য ইতিবাচক হবে।
 
যন্ত্রনির্ভর বিনোদন ব্যবস্থার সমালোচনা করে ফেইথ বলে, বই পড়ার পরিবর্তে অনেক শিশু এসব মাধ্যমকে বেছে নিয়েছে। বিষয়টি লজ্জাজনক। তবে তার জীবন শুধু বইয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। সে প্রতি সপ্তাহে চার ঘণ্টা ব্যায়াম করে, কারাতে প্রশিক্ষণ নেয়, খেলাধুলা করে। আর এখন সে ড্রামস বাজানোও শিখছে। টেলিভিশনে উদ্ভট জিনিসপত্র দেখার চেয়ে গাছে চড়া ও সাইকেল চালাতেই বরং বেশি মজা পায় সে।
 
যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থায় ফেইথের পক্ষে যা কিছু সম্ভব আমাদের দেশের শিশুদের ক্ষেত্রে তা অসম্ভব। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ শুরু হলে আমাদের দেশের একটি শিশু ক্লাসের বাইরে বইপড়ার খুব একটা সময় পায় না বললেই চলে। সকাল সাতটায় বা আটটায় ক্লাস করার জন্য ক্লাসের বইয়ের ভারে ভারাক্রান্ত শিশুকে স্কুলের ব্যাগ নিয়ে ক্লাসে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে ভারি ব্যাগটি শিশুটি বহন করতে পারে না বলে সঙ্গে বাবা-মা ব্যাগটি বহন করে শিশুটিকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসছে। এ ছাড়াও স্কুল শেষে বাসায় এসে বিকালে প্রাইভেট মাস্টার ও হোমওয়ার্ক করতে করতে শিশুর খেলার সময়ই পায় না, সে ক্ষেত্রে বাড়তি বইপড়ার সুযোগ থাকে না বললেই চলে। এতোসবের পরে অবসর সময় যেটুকু থাকে সে সময়টুকুতে শিশুটি টেলিভিশনের বা কম্পিউটারের পর্দায় বিনোদনের উপদান খোঁজে। ফেইথ কিন্তু অবসর সময় টেলিভিশন বা কম্পিউটরের স্ক্রীনে সময় নষ্ট করেনি। আমাদের দেশের অভিভাবকরাও ফেইথের মতো তার প্রিয় সন্তানকে বইপড়ায় আগ্রহী করে তুলতে পারেন।
 
বইপড়ায় প্রধানত তিনটি প্রত্যক্ষ সুফল পাওয়া যায়। এক. কম্পিউটার স্ক্রীনের অতিরিক্ত আলো থেকে চোখের যে ক্ষতি হয়, বইপড়ায় সে রকম কোন ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না। দুই. বই পড়লে শিশুদের কল্পনার জগতে বিচরণ করা সহজ হয়। তিন. বই পড়া থেকে শিশুরা বেশ ভালোভাবে ভাষা রপ্ত করত পারে, যা তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উন্নত দেশগুলোতে সাড়ে চার বছরের আগে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ লাভ করে না। আমাদের দেশেও চার-সাড়ে চার বছরে প্লেগ্রুপে শিশুকে ভর্তি করানো গেলেও তার আগের সময়টাতে অর্থাত্ তিন থেকে চার বা পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত সময়ে শিশুকে বইপড়ায় আগ্রহী করে তোলার সময়। কারণ এই সময়ে শিশুরা গল্প শুনতে এবং ভ্রমণ করতে সবচেয়ে আগ্রহী থাকে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আগে একটি শিশুকে বইপড়ায় অভ্যস্ত করে তুলতে পারলে পরবর্তীতে পরিণত জীবনে সে এই ধারাটি বজায় রাখে। আমাদের দেশে স্কুলের এতোসব কড়াকড়ির মধ্যেও প্রতি বছর অমর একুশে গ্রন্’মেলায় শিশুদের বই কেনার আগ্রহ দেখে বোঝা যায় যে, এ দেশের শিশুরাও অভিভাবকদের উত্সাহ পেলে আরও বেশি বইপড়ায় আগ্রহী হয়ে উঠবে।
শিশুরা গল্প শুনতে পছন্দ করে, বিষয়টি মনে রেখে শিশুর ঘুমের আগে, গোসলের সময়, বাসে, ট্রেনে বা গাড়িতে সব সময়ই গল্প শোনানো যায়। এতে শিশুরা উত্ফুল্ল থাকবে। গল্প শোনার সময় শিশুরা বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করলে খুব ধৈর্য নিয়ে তার প্রতিটি কথায় উত্তর দিতে হবে। কোনভাবে তাকে জোর করে থামিয়ে দেয়া যাবে না। গল্প শোনানোর জন্য একটি শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ দরকার। জোর করে শিশুকে গল্প শোনানো ঠিক হবে না। অভিভাবকদের মুখে গল্প শুনতে-শুনতে শিশুরা বই পড়ায়ও আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।
একদিকে টিভি বা কম্পিউটার চলছে অন্যদিকে শিশুকে গল্প শোনানো হ”েছ— এ ধরনের পরিবেশে শিশুর মনোযোগ ঠিক থাকে না। এ জন্য শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ দরকার। গল্প পড়ে শোনানোর সময়ে শিশুকে এমনভাবে কাছে নিয়ে বসতে হবে যেন সে বই ও পাঠকারীর মুখ সহজেই দেখতে পারে। তবে বসাটি অবশ্যই শিশুর জন্য আরামদায়ক হতে হবে। প্রতিদিন একটি বিশেষ জায়গায় বা চেয়ারে বসে গল্প পড়ে শোনালে শিশুকে সহজেই গল্পের মধ্যে নিয়ে আসা যায়।
গল্পের মাধ্যমে শিশুদের সহজেই নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও শিষ্টাচার প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব। যেমন-বাঘ ও রাখালের প্রচলিত গল্পটি শিশুদের মিথ্যা না বলার জন্য উত্সাহিত করে। এমন ধরনের গল্প নির্বাচন করতে হবে যে গল্প শুনে শিশুর কাছে আকর্ষণীয় মনে হয় এবং সেখানে শিক্ষনীয় একটি উপদেশ থাকে। মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির বাইরের গল্প না বলাই ভালো। যদি এমন গল্প বলতেই হয় তবে তাকে বলে দিতে হবে যে, বিষয়টি আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়, এটি ওই দেশের জন্য প্রযোজ্য।
বই পছন্দ করার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন বইটি রঙিন ও ছবিযুক্ত হয়। দোকান থেকে বই কেনার সময় শিশুকে সঙ্গে নিতে হবে এবং তার পছন্দকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। কোন বই অভিভাবক পছন্দ না করলে তার সঠিক ব্যাখ্যা দিতে হবে।
প্রতিটি গল্পের মধ্যে একটি শিক্ষণীয় বার্তা থাকে। গল্প বলার সময়ে এত বেশি গুরত্ব দিয়ে শিক্ষনীয় বার্তাটি বারবার বলতে থকলে শিশুর মনে বিরূপ প্রভাব পড়ে। বার্তাটি তার কাছে অত্যাচারের মতো মনে হয়। ফলে শিশুটি বার্তাটি গ্রহণ তো করেই না বরং গল্পও শুনতে চায় না। তাই বার্তাটি গল্পের মধ্যেই এমনভাবে বলতে হবে যেন শিশু তা গল্পের অংশ মনে করে।
শিশুদের বইপড়ায় আগ্রহী করে তোলার ব্যাপারে শিশু সাহিত্যিক রহিম শাহ বলেন, শিশুদের মনোজগত রঙিন। তাকে রঙিন ও নির্ভুল বই দিতে হবে। কোনভাবে নিরস বই দেয়া যাবে না। তিনি বলেন, শিশুরা যেন প্রথম দর্শনেই বইটি পছন্দ করে এবং পড়তে আগ্রহী হয়ে ওঠে সে ধরনের বই লেখা ও প্রকাশ করতে হবে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের দেশে শিশু সাহিত্যিক খুব কম। এ জন্য শিশুদের সঠিক মানসম্পন্ন বই প্রকাশ হ”েছ না। তছাড়া প্রকাশকরাও শিশুতোষ বই প্রকাশে আন্তরিক নয়। এ কারণে শিশুদের হাতে যেসব পায় যা”েছ সেগুলো থেকে সহজেই শিশুরা মুখ ফিরিয়ে নি”েছ। তিনি বলেন, শিশুদের কিছুতেই বার বার একই গল্প শোনানো যাবে না, নতুন নতুন প্র”ছদে নতুন গল্প, কবিতা বা ছাড়ার বই শিশুদের উপহার দিতে হবে। তিনি বলেন, একমাত্র একুশে মেলা বা বছরে শিশু একাডেমীর বইমেলা ছাড়া শিশুদের জন্য বই সংগ্রহের আর কোন উপায় নেই। সহজে এবং সব সময় যাতে শিশুরা বই পেতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে। সবার আগে শিশুকে পাঠ্যাভাসের দিকে নিয়ে যেতে হলে বাবা-মাকে আন্তরিক হতে হবে।
শিশুদের বইপড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে শিক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। গল্পের ছলে শিশুদের পাঠদান করা যেতে পারে। সপ্তাহে অথবা মাসে অন্তত একটি ক্লাসের বাইরের বই পড়ানো যেতে পারে। অনেক স্কুলে ছাত্রদের জন্য লাইব্রেরী নেই। প্রতিটি স্কুলে লাইব্রেরী থাকতে হবে এবং সেখান থেকে ছাত্রদের বই সরবরাহ করতে হবে।
শিশুকে বইপড়ায় অভ্যস্ত করে তুলতে পারলে তার ভাষা, ছন্দ, অক্ষরজ্ঞান ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটে। এ ছাড়া শিশুর কল্পক্ষমতা ও কৌতূহল বৃদ্ধি পায়। শিশুটির সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানো যায়; অভিভাবক ও শিশু দুজনই আনন্দ অনুভব করতে পারে। এতে মা-বাবা ও শিশুর মধ্যে বন্ধন দৃঢ় হয়। শুধু তাই নয়, শিশুটির মধ্যে বইয়ের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী সময় বই পড়াকে কষ্টের মনে না করে আনন্দের মনে করে।

ইত্তেফাক/এএম।