বনানী ধর্ষণ মামলার আসামিরা দ্য রেইনট্রি হোটেলের রুম দুটি বুকিং দিয়েছিল হোটেল মালিকের ছেলের মাধ্যমে। গত ৯ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে হোটেলটি উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু তার আগেই ২৮ মার্চ রুম দুটি বুকিং দেওয়া হয়। হোটেল মালিক বজলুল হক হারুণের ছেলে মিহির ওই হোটেলের একজন পরিচালক। তার সঙ্গে আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিমের ছেলে মামলার ১ নং আসামি সাফাত আহমেদের বন্ধুত্ব রয়েছে। গতকাল শনিবার রিমান্ডের প্রথম দিন সাফাত ও মামলার ৩ নং আসামি সাদমান জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য দিয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জিজ্ঞাসাবাদে দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করলেও অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা এবং ধর্ষণের দৃশ্য ভিডিও করার বিষয়ে মুখ খোলেনি তারা।
গত ২৮ মার্চ বনানীর দ্য রেইন ট্রি হোটেলে দাওয়াত দিয়ে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে গণধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় গত ৬ মে ভুক্তভোগী দুই ছাত্রী ওই ৫ আসামির বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা করেন। বিষয়টি গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়। একপর্যায়ে গত ১১ মে সিলেট থেকে মামলার দুই আসামিকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ।
এদিকে গ্রেফতার না হওয়া ধর্ষণ মামলার অন্য তিন আসামি নাঈম আশরাফ ওরফে হোসেন মোহাম্মদ হালিম, সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল এবং দেহরক্ষী আবুল কালাম আজাদকে গ্রেফতারে ডিবির একাধিক টিম মাঠে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার গান্দাইল ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান আলী আশরাফের ছেলে নাঈম আশরাফের নাম ব্যবহার করে আব্দুল হালিম ঢাকায় প্রতারণা চক্র গড়ে তোলে। নিজেকে নাঈম আশরাফ পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পালন করেছে। এছাড়া একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর ছেলের বন্ধু পরিচয় দিয়ে আব্দুল হালিম নানা প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
হোটেলে অভিযান: দ্য রেইন ট্রি হোটেলে অবৈধভাবে বার পরিচালনা ও মাদক বিক্রির অভিযোগ তুলেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। গতকাল শনিবার সকালে বনানীর ২৭ নম্বর রোডের ৪৯ নং রেইন ট্রি হোটেলে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। অভিযানে ঐ হোটেল থেকে অবৈধ মাদক উদ্ধার করতে না পারলেও অধিদফতর বলছে, অভিযানের আগেই হোটেল কর্তৃপক্ষ অবৈধ মাদক সরিয়ে ফেলেছে। তবে হোটেলে বারটি অবৈধভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ বারের লাইসেন্স দেখাতে পারেনি।
পরিদর্শন শেষে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের গুলশান জোনের পরিদর্শক ওবায়দুল কবির বলেন, হোটেলের বিরুদ্ধে মাদক বিক্রি ও বার পরিচালনার অভিযোগ ছিল। তল্লাশি চালিয়ে আমরা হোটেলটিতে অ্যালকোহল জাতীয় কিছু পাইনি। তবে যেহেতু অভিযোগ উঠেছে সে কারণে আমরা হোটেলটির ওপর নজরদারি রাখব।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ: এছাড়া একইদিন সকালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত কমিটি হোটেলটি পরিদর্শন করে। দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় দি রেইনট্রি হোটেলটিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে আমাদের প্রতীয়মান হয়েছে ‘দ্য রেইন ট্রি’ হোটেলে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। যে কক্ষ দুটিতে ধর্ষণের ঘটনার অভিযোগ উঠেছে সেই কক্ষ দুটি বন্ধ ছিল। তবে তদন্ত কমিটির সদস্যরা বাইরে থেকে দেখেছেন। হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও তারা কথা বলেছেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে দ্য রেইনট্রি হোটেলের এক্সিকিউটিভ (ইন্টারনাল অপারেশন) ফারজানা আরাফ রিমি বলেছেন, ‘অভিযানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও মানবাধিকার কমিশন অস্বাভাবিক কিছু পায়নি। আমাদের পুরো হোটেলের স্ট্রাকচার থাইল্যান্ড থেকে করা। হোটেলটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় গত ৯ এপ্রিল। তবে এর আগে আমরা টেস্ট কেস হিসেবে কক্ষ ভাড়া দিয়েছিলাম।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের পুরো হোটেলের কক্ষ কাঁচের দেয়াল দিয়ে ঘেরা সাউন্ড প্রুফড। কাঁচের ঘরের ভেতর থেকে কেউ চিত্কার চেঁচামেচি করলে কোনোভাবে শোনার কথা নয়। তাছাড়া আমরা কোনো ধরনের অস্বাভাবিক কিছু দেখিনি। ওই দুই তরুণী যে ধরনের অভিযোগ করেছেন তা আমাদের কাছে করা হয়নি। আমাদের কাছে যদি অভিযোগ করা হতো তবে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতাম।’
অস্ত্র নিয়ে হোটেলে প্রবেশ করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তখন আমাদের ওপেনিং ছিল। ওই সময় আমাদের ফ্রন্ট ডেস্ক অফিসার ম্যানুয়ালি চেক করেছেন। অস্ত্র ফ্রন্ট ডেস্কে জমা দিয়ে হোটেলে প্রবেশ করেছিল সাফাত, সাদমান, নাঈমরা। ফলে ধর্ষণের শিকার দুই তরুণী অস্ত্রের মুখে ধর্ষণের যে অভিযোগ করেছেন, তা মিথ্যা।’
একটি ছবি ঘিরে প্রশ্ন: ছবি শেয়ারিংয়ের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইন্সটাগ্রামে নাঈম আশরাফের পোস্ট করা একটি ছবি নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ছবিতে দেখা গেছে, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনারের অফিসে নাঈম আশরাফ ওরফে আব্দুল হালিম একজন ডিবি কর্মকর্তা ও সাফাতের সঙ্গে সেলফি তুলছেন। ঐ ছবিটি গত ৩ মে ইন্সটাগ্রামে নাঈম পোস্ট করেছেন। ধর্ষণের ঘটনার পর পরই সাফাত ও নাঈমের সঙ্গে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তার যোগাযোগ থাকার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে ছবিটি ফটোশপে তৈরি করা হয়েছে কিনা-সেটি তদন্ত করে দেখছে ডিবি পুলিশ।
ইত্তেফাক/নূহু
