ধর্ষণের সময় হুমকিতে ব্যবহৃত শটগান নিয়ে রহস্য

আপডেট : ১৬ মে ২০১৭, ১৬:২৪
 
রাজধানীর বনানীতে হোটেলে আটকে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত সাফাত আহমেদের গাড়ি চালক বিল্লাল হোসেন ও  দেহরক্ষী রহমত আলীক গ্রেফতার করা হয়েছে। সোমবার রাত ৮ টার দিকে পুরান ঢাকার নবাবপুর এলাকা থেকে গাড়ি চালক বিল্লালকে র‌্যাব গ্রেফতার করে। একই সময়ে গুলশান এলাকা থেকে দেহরক্ষী আবুল কালাম আজাদকে পুলিশ গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর এই দুইজনকে রাতেই মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে।
 
এর আগে এই মামলায় রিমান্ডে থাকা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিমের পুত্র সাফাত আহমেদ ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। গত ২৮ মার্চ বনানীর দ্য রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের আগে তিনি আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের কথা স্বীকার করেছেন। প্রদর্শিত শটগানটি বৈধ না অবৈধ তা তদন্ত করছে পুলিশ। পুলিশ ওই আগ্নেয়স্ত্রটি এখনও উদ্ধার করতে পারেনি।
 
সাফাতকে জিজ্ঞাসাবাদকারী তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের সময় তার বডিগার্ড রহমত আলীর কাছে একটি শটগান ছিল। দুই শিক্ষার্থী তাদের কথা না শুনলে তারা ওই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাদেরকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। পরে বডিগার্ডের কাছ থেকে ঐ আগ্নেয়াস্ত্রটি নাঈম আশরাফ ছিনিয়ে নিয়ে ভয়ভীতি দেখায়-এমন অভিযোগ দুই ভিকটিম করেছে।
 
অপরদিকে, দি রেইনট্রি হোটেলের এক্সিকিউটিভ (ইন্টারনাল অপারেশন) ফারজানা আরাফ রিমি অস্ত্র নিয়ে হোটেলে প্রবেশ করার বিষয়ে বলেন, ‘তখন আমাদের ওপেনিং ছিল। ওই সময় আমাদের ফ্রন্ট ডেস্ক অফিসার ম্যানুয়ালি চেক করেছেন। অস্ত্র ফ্রন্ট ডেস্কে জমা দিয়ে হোটেলে প্রবেশ করেছিল সাফাত, সাদমান, নাঈমরা। ফলে ধর্ষণের শিকার দুই তরুণী অস্ত্রের মুখে ধর্ষণের যে অভিযোগ করেছেন, তা মিথ্যা।’
 
গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে রিমান্ডে থাকা সাফাত ও সাদমান সাকিফকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। ডিবি ও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের কর্মকর্তারা তাদেরকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। সাফাতের ৬ দিন ও সাকিফের ৫ দিনের রিমান্ডের গতকাল সোমবার ছিল তৃতীয় দিন।
 
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় বলেছেন, রিমান্ডে জ্ঞািসাবাদে তারা যে তথ্য দিচ্ছে তা বাদি ও ভিকটিমের অভিযোগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে সহায়ক তথ্য দিচ্ছে রিমান্ডে থাকা সাফাত ও সাকিফ।
 
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ কমিশনার (উত্তর) শেখ নাজমুল আলম বলেন, অস্ত্র ও ভিডিও রেকর্ড উদ্ধারে অভিযান চলছে। সম্ভাব্য সব স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
 
আপন জুয়েলার্স ও দ্য রেইনট্রি হোটেলের মালিককে তলব: স্বর্ণ, ডায়মন্ড আটকের ঘটনায় আপন জুয়েলার্স ও অবৈধ মদ রাখার দায়ে  হোটেল দ্য  রেইনট্রির মালিককে তলব করেছে শুল্ক  গোয়ন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। গতকাল  সোমবার শুল্ক  গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ জানায়, রবিবার আপন জুয়েলার্সের গুলশান, উত্তরা,  মৌচাক ও সীমান্ত স্কয়ারের পাঁচটি বিক্রয়কেন্দ্র   থেকে  সোনা ও হীরা আটক করা হয়। এগুলো ব্যাখ্যাহীনভাবে মজুদ রাখা ছিল। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা জানার জন্য দিলদার আহমেদসহ আপন জুয়েলাসের সব মালিককে তলব করা হয়েছে। এ ছাড়া  হোটেল  রেইনট্রিতে ১০ বোতল মদ রাখার দায়ে মালিকদের তলব করা হয়েছে।
 
জানতে চাইলে গতকাল শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মঈনুল খান সাংবাদিকদের জানান, শুল্ক গোয়েন্দার অভিযানে ব্যাখ্যাহীনভাবে মজুদ স্বর্ণ ও ডায়মন্ড আটকের ঘটনায় আপন জুয়েলার্সের মালিকদের তলব করা হয়েছে। একই সময় দ্য রেইনট্রি হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালককেও (এমডি) মদ রাখার দায়ে সমন দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, আগামী ১৭ মে বেলা ১১টায় তাদের শুল্ক  গোয়েন্দার কাকরাইলের সদর দফতরে কাগজপত্রসহ হাজির হতে বলা হয়েছে।
 
গুলশানে আপন জুয়েলার্সে ফের অভিযান: রাজধানীর গুলশান ২ নম্বর সার্কেলের সুবাস্তু টাওয়ারে সিলগালা করে দেওয়া আপন জুয়েলার্সের বিক্রয় কেন্দ্রে ফের অভিযান চালিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের যুগ্ম পরিচালক সাইফুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, গত রবিবার গুলশান এলাকায় সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় তাদের সদস্যরা সুবাস্তু টাওয়ারের ওই দোকান সিলগালা করে গিয়েছিলেন। সোমবার সেটি খুলে অভিযান চালানো হয়েছে।
 
এর আগে রবিবার শুল্ক গোয়েন্দার দল আপন জুয়েলার্সের গুলশান, উত্তরা, মৌচাক ও সীমান্ত স্কোয়ারের শাখায় অভিযান চালায়। অভিযানে ২৮৬  কেজি স্বর্ণ ও ৬১ গ্রাম ডায়মন্ড ব্যাখ্যাহীনভাবে মজুদ রাখার দায়ে তা সাময়িক আটক করা হয়। এগুলো আইন অনুসারে সিলগালা করে তাদের হেফাজতে দেওয়া হয়। শুল্ক  গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মঈনুল খান জানান, স্বর্ণ ও রত্ন সংগ্রহের তথ্যে অস্বচ্ছতা এবং মালিকের ‘অবৈধ সম্পদের’ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবেই শুল্ক আইনের বিধান অনুসারে ওই অলঙ্কার তারা আটক করেছেন।
 
এদিকে গতকাল র‌্যাব সদস্যরা আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদের গাড়িচালক বিল্লালকে রাজধানীর নবাবপুর রোডের ইব্রাহীম হোটেল থেকে গ্রেফতার করে। এ ব্যাপারে গতকাল রাতে এক ব্রিফিংয়ে র্যাব-১০ অধিনায়ক জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নবাবপুরে হোটেল ইব্রাহীম থেকে বিল্লালকে গ্রেফতার করা হয়। বিল্লাল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুই তরুণীকে হোটেলে নিয়ে আসা এবং ধর্ষণের সময় ভিডিও ধারণের অভিযোগ স্বীকার করেছে।
 
তিনি আরো জানান, বিল্লাল হোসেন অন্য আসামিদের সঙ্গে সিলেটে পালিয়েছিল। সে গতকাল  সকালেই সিলেট থেকে ঢাকায় এসে এই হোটেলে উঠে। গ্রেফতার এড়াতে সুজন ছদ্মনাম ব্যবহার করে ওই হোটেলে একটি কক্ষ ভাড়া করেছিল। আগাম জামিন নেওয়ার জন্য হোটেলে বসে আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিল।
 
বিল্লাল র‌্যাবকে বলেছে, গত ৬ মে মামলা দায়েরের খবর শুনে সাফাতসহ তারা সিলেটে চলে যান। সেখান থেকে সে ছাতক চলে যায়। তারপর সিলেট হয়ে সোমবার ভোরে ঢাকায় ফেরে। বিল্লালের বাড়ি নাটোরের বড়াইগ্রামের দাড়িডোমা গ্রামে, তার বাবার নাম সিরাজুল ইসলাম।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর