বন্যা কবলিত খালিয়াজুরীতে খাদ্য সংকট, ঋণগ্রস্থদের দুরবস্থা

আপডেট : ১৬ মে ২০১৭, ০৯:১২
 
অকাল বন্যায় এবার নেত্রকোনার হাওরদ্বীপ খালিয়াজুরীতে সমস্ত ফসল তলিয়ে যাওয়ায় এখানকার হাজার হাজার পরিবারে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এরমধ্যে, যেসব পরিবারে ঋণ রয়েছে তাদের হচ্ছে মরণ দশা।  
 
উপজেলা প্রশাসন ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, বাধ ভাঙা ঢলের পানির তোড়ে এবার খালিয়াজুরীর প্রায় সমস্ত বোরো তলিয়ে গেছে। এখানে জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন এ ফসল তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্থ ২৫ হাজার পরিবারের অধিকাংশেই দেখা দিয়েছে খাদ্যের অভাব। অবশ্য, অভাব মেটাতে ইতিমধ্যে সরকারি ভাবে ১০ হাজার পরিবারে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে ভিজিএফ দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া, উপজেলায় ১৫ টাকা কেজি দরে খোলা বাজারে সপ্তাহের ছয় দিন বিক্রি করা হচ্ছে ৭ মে. টন চাল।
 
 প্রয়োজনের তুলনায় এসব সহায়তা একেবারেই কম হওয়ায় খাদ্যের অভাব মানুষের পিছু ছাড়ছে না। অনাহারে-অর্ধাহারে কাটানো অনেক পরিবারে আবার ঋণ রয়েছে মরার উপর খার ঘা হিসেবে। কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর মাদ্রাসা পাড়ার সুরুজ আলী মিয়ার ছেলে জামির মিয়া ও কল্যাণপুর গ্রামের হাজ্বী চান মিয়ার ছেলে আরবআলী মিয়া ইতিমধ্যে ঋণের চিন্তায় মারা গেছেন বলে তাদের পরিবার থেকে দাবি উঠেছে।  
 
খালিয়াজুরী সদর ইউনিয়নের দিয়ারাকান্দা গ্রামের সমশের আলীর ছেলে আকির হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ২২হাজার ট্যাহা ঋণ কইরা ইবার দুই এহর জমি করার পর বানের পাইন্যে সব তলাইয়া নেওয়ায় অহন টিক মত খাওন পাইনা। সরহারের কোনো সাহায্যও পাইনা। এইহানে কাম না তাহনে উপার্জন কইরা ১৫ ট্যাহা কেজির চাউল কিননেরও বাও নাই। ঋণ পরিশোধের বাওত নাই্ই। অহন ঋণ পরিশোধ করমু কেমনে আর খাওন জোগাইমু কেমনে বুঝতাছিনা। 
 
খুঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই গ্রামে আকির হোসেনের মতো আহেদ আলী মিয়ার ছেলে মস্তু মিয়া, মিরাশআলী মিয়ার স্ত্রী চন্দ্রবানু, হাসিম মিয়ার ছেলে হযরত আলী, আব্দুল মজিদের স্ত্রী রহিমা খাতুনসহ অনেকেই বুঝতে পারছেন কিভাবে তারা সারা বছরের খাবার সংগ্রহ করবেন আর কিভাবেইবা তারা ঋণ পরিশোধ করবেন। 
 
স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও জনসাধারণ সূত্রে আরো জানা গেছে, খাদ্য সংকটে এবং ঋণের যন্ত্রণায় এখন প্রতিনিয়ত ছটফট করছেন খালিয়াজুরীর নগর ইউনিয়নের গোয়ালবাড়ী নতুন পাড়ার নিতাই বিশ্বাসের ছেলে সজিদ বিশ্বাস, ধীরেন্দ্র পালের ছেলে প্রনয় পাল, নগরবাসী বিশ্বাসের ছেলে সেনা বিশ্বাস, রাজেন্দ্র দাসের ছেলে সপ্ত রঞ্জন দাস, মতি সরকারের ছেলে দীপক সরকার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের নাজিরপুর গ্রামের নিধু রামের ছেলে ঝন্টু সরকার, নিরঞ্জন সরকারের ছেলে সুরঞ্জিত সরকার, প্রমোদ সরকারের ছেলে হরিধন সরকার, বীরেন্দ্র সরকারের ছেলে চন্তু সরকার, রমেশ সরকারের ছেলে রনধীর সরকারসহ উপজেলার হাজার হাজার পরিবার। এসব পরিবারগুলো ভিজিএফ, ভিজিডি কিংবা অন্যান্য সরকারি সহায়তা খুব একটা  না পেয়ে হাহাকারের মাঝে রয়েছে।  
            
স্থানীয় জেলা পরিষদ সদস্য গোলাম আবু ইছহাক জানান, এলাকার মানুষ খুব সমস্যায় আছে। তাদের হাতে কোন কাজ নেই, ঘরে খাবার সংকট। অনেকেই ঋণের চাপ সইতে না পেরে এবং খাদ্যের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে শহরের দিকে। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ শহরমুখী হওয়ায় বিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এলাকাবাসী পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে সামনে তাদের খুব অসুবিধে হবে। 
 
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সামছুজ্জামান তালুকদার সুয়েব বলেন, সম্প্রতি, হাজারো জনতার সমন্বয়ে ঋণের সমস্যা ও খাদ্য সংকট মেটাতে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রধান মন্ত্রীর কাছে একাধিকবার স্মারকলিপি পেশ করা হয়েছে। 
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ তোফায়েল আহমেদ জানান, এলাকার সমস্ত বিপর্যয়ের বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে। তারা সহানুভূতিশীল। তারা সব দেখে শুনে যথাযথ ব্যবস্থা নিবেন।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর