কালবৈশাখীর তাণ্ডব ৫ জন নিহত

আপডেট : ১৬ মে ২০১৭, ২৩:০৪

কালবৈশাখী ঝড়ে সোমবার রাতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে শিশুসহ পাঁচ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। রাজধানীর কয়েকটি সড়কে গাছ উপড়ে পড়ে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে মেঘনায় ৪টি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে দুই জেলে নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরো এক জেলে নিখোঁজ রয়েছেন। নড়াইলে ঝড়ের মধ্যে আম কুড়াতে গিয়ে গাছ চাপায় এক শিশু, বগুড়ায় বিলবোর্ড ও গাইবান্ধায় ঘর ভেঙে দুই জন মারা গেছে। এছাড়া প্রচণ্ড ঝড়ে অনেক গ্রাম লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। কয়েকশ’ বসতঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়েছে। এসময় বসতঘর ও গাছপালার নিচে চাপা পড়ে আহত হন অর্ধশত লোক। বৈদ্যুতিক পিলার ভেঙে অনেক জায়গায় বিদ্যুত্ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। ঝড়ের সঙ্গে ভারী বর্ষণ ও শিলাবৃষ্টিতে বিভিন্ন ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়।

রামগতি (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার আবদুল্লার চরের হুজুরের খালের অদূরে মেঘনা নদীতে রাতে আকস্মিক ঝড়ের কবলে পড়ে ইঞ্জিনচালিত ৪টি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যায়। এতে দুই জেলে নিহত হন। এরা হলেন চর আলেকজান্ডার ইউনিয়নের শ্যামলগ্রাম এলাকার শামছুল হকের ছেলে মো. নুরনবী (৩৫) ও একই ইউনিয়নের চর ডাক্তার এলাকার মো. হারুনের ছেলে বাগন আলী (২০)। এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন চর ডাক্তার এলাকার মো. মোস্তফার ছেলে মো. হেলাল (২০)। রামগতি থানার এসআই মো. জাহাঙ্গীর ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, জেলেদের লাশ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

রামগঞ্জ (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান, ঝড়ে উপজেলার ৪টি গ্রাম লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। এতে শতাধিক বসতঘর, মসজিদ, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়েছে। এসময় বসতঘর ও গাছপালার নিচে চাপা পড়ে ৩০ জন আহত হন। গুরুতর আহতদের নোয়াখালী ও রামগঞ্জ সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, রাত ২টার দিকে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়। ঝড়ে লণ্ডভণ্ড গ্রামগুলো হচ্ছে মজুপুর, দাসপাড়া, শোশালিয়া ও শৈলখালী। ঝড়ে গাছ উপড়ে পড়ে উপজেলার ২৭টি বৈদ্যুতিক পিলার ভেঙে যায়। ফলে উপজেলাব্যাপী বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করে প্রেরণ করতে জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় এমপি লায়ন এম.এ আওয়াল বলেন, উপজেলা থেকে তালিকা পাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহযোগিতা করা হবে।

নড়াইল প্রতিনিধি জানান, রাত ১টার দিকে নড়াইল পৌরসভার ভওয়াখালী এলাকায় ঝড়ের মধ্যে আম কুড়াতে গিয়ে নারকেল গাছ চাপায় হূদয় ঘোষ (৮) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিহত হূদয় নড়াইল রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র এবং ভওয়াখালী গ্রামের দিলীপ ঘোষের ছেলে। তার মৃত্যুতে সহপাঠী, পরিবারসহ সবার মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

বগুড়া অফিস জানায়, রাতে বগুড়া শহর ও বিভিন্ন উপজেলার ওপর দিয়ে প্রচণ্ড বেগে ঝড় বয়ে যায়। পাশাপাশি বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি হয়েছে। মাত্র ৩ মিনিটের ঝড়ের সময় শহরতলির চারমাথা এলাকায় একটি বিলবোর্ড ভেঙে পড়লে নিচে চাপা পড়ে আবদুস সাত্তার নামে (৬০) এক পান দোকানি মারা যান। শিলাবৃষ্টিতে বাড়িঘর ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিদ্যুতের পিলার ভেঙে যাওয়ায় শহরের অনেক এলাকায় ১৮ ঘণ্টা বিদ্যুত্ সংযোগ বন্ধ ছিল। এসময় শহরে ভূতুড়ে অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া  ঝড়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে গাছপালা উপড়ে পড়েছে। কাঁচা ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জমিতে থাকা ধানের ক্ষতি হয়েছে। বিপুল পরিমাণ আম ঝরে পড়েছে।

বগুড়া আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অবজারভার নুরুল ইসলাম জানান,  সোমবার রাত ৮টা ২ মিনিটে বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি শুরু হয়। রাত ৮টা ১২ মিনিট থেকে ৮টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত ৩ মিনিট ঘণ্টায় ৯৮ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে যায়।

গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, রাত সাড়ে ৯টার দিকে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে উপজেলার নাকাই, হরিরামপুর, তালুককানুপুর, দরবস্ত, রাখালবুরুজ ও ফুলবাড়ী ইউনিয়নের  বেশ কিছু গ্রামের শত শত বাড়ি-ঘর, গাছপালা ভেঙে পড়েছে। বাতাসের তোড়ে ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে কলা, ভুট্টাসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল। এ সময় ঘর চাপা পড়ে নাকাই ইউনিয়নের খুকশিয়া গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের পুত্র মজিদ আকন্দ (৩৫) মারা গেছেন। তবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার দাবি করেছেন ঝড়ের সময় আতঙ্কে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মজিদ মারা যান।

বরিশাল অফিস জানায়, ঝড়ে বরিশাল নগরী ও আশপাশ এলাকায় বেশ কিছু গাছ ও ডালপালা ভেঙে বিদ্যুতের তারের উপর পড়ে। এতে বিদ্যুত্ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। ঝড়ের ৬ ঘণ্টা পর গতকাল সকাল ৮টা নাগাদ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুত্ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। এ ছাড়া দপদপিয়া সেতুর টোলপ্লাজা সংলগ্ন এলাকায় দুটি বিলবোর্ড ভেঙে বেশ কয়েকটি দোকান ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরিশাল আবহাওয়া অফিসের উচ্চ পর্যবেক্ষক মিলন হাওলাদার জানান, রাত ১টা ৩১ মিনিটে ঝড় শুরু হয়ে তিন মিনিট স্থায়ী হয়। ঝড়ের সর্বোচ্চ গতি বেগ ছিল ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার। এ সময় ২২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

বাবুগঞ্জ (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, ঝড়ের সঙ্গে শিলাবৃষ্টিতে উপজেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে কাঁচা ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। উপড়ে পড়ে গাছপালা। বোরো ধান, ভুট্টা, গমসহ বিভিন্ন ফসল ও আমের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ঝড়ের সময় ইত্তেফাক পত্রিকার এজেন্ট সুলতান আহম্মেদের দোকানের টিনের চালা উড়ে গেছে।

ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, রাত ১টার দিকে হানা দেওয়া  ঝড়ে রাজাপুর উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক বসতঘর ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানের বৈদ্যুতিক লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ১৭ ঘণ্টা বিদ্যুিবহীন কাটিয়েছেন উপজেলাবাসী। এ ছাড়া মধ্যবিল ছোনাউটা তোঁতামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। প্রধান শিক্ষক শাহজাহান সদাগর জানান,  ঝড়ে এই বিদ্যালয়ের প্রায় ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। শ্রেণিকক্ষের অভাবে বর্তমানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান,  উপজেলায় সন্ধ্যা ৭টার দিকে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে প্রায় শতাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড়ে কাঁচা-পাকা, ঘরবাড়ি, গাছপালা, বোরো ফসল, পান বরজ এবং উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও) সংবাদদাতা জানান, বিকাল ৬টার দিকে উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রচণ্ড ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে কয়েক হাজার একর জমির বোরো ধান, ভুট্টা, কলা ও পাটখেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া মৌসুমি ফল আম, লিচু ও তরমুজেরও ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও নির্ধারণ করতে পারেনি কৃষি বিভাগ। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।

লামা (বান্দরবান) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় মঙ্গলবার ভোরে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে লামা ইউনিয়নের মিরিঞ্জা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। ম্রো জনগোষ্ঠী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রায় দুই শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী স্কুলটিতে লেখাপড়া করে। বর্তমানে তাদের পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, কালবৈশাখীর তাণ্ডবে কুতুপালং বস্তি, বালুখালী ও রেজিস্ট্রার্ড শরণার্থী ক্যাম্পের প্রায় সহস াধিক ঝুপড়িঘর লণ্ডভণ্ড হয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে শত শত রোহিঙ্গা পরিবার। মঙ্গলবার ভোর ৪ টার দিকে এ ঝড় বয়ে যায়। ক্যাম্প ইনচার্জ জানান, ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা পরিবারের তালিকা করা হচ্ছে। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে তাদের গৃহনির্মাণ উপকরণ সামগ্রী সরবরাহ করার কাজ করছে।

ইত্তেফাক/নূহু