পুঁজিবাজারে মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির অভাব থাকায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানিতে ঘুরেফিরে বিনিয়োগ করছেন। দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও ঝুঁকছেন অল্প কিছু কোম্পানিতে। বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ৩৩৩টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে মাত্র ২২টিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে। ২২৩টি অর্থাত্ প্রায় ৬৭ শতাংশ কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডে তাদের কোনো বিনিয়োগই নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাক’কে বলেন, আমাদের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল- এখানে বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানির সংখ্যা খুবই কম। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মৌলভিত্তি সম্পন্ন এসব কোম্পানির বাইরে বিনিয়োগ করেন না। দেশের ভালো বিনিয়োগকারীরাও এ কোম্পানিগুলো ঘিরেই বেশিরভাগ বিনিয়োগ করেন। তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের বাইরে অল্প কয়েকটি কোম্পানি রয়েছে যেগুলোকে খুব খারাপ বলা যাবে না। এছাড়া বেশিরভাগ কোম্পানিতেই মূলত গ্যাম্বলিং হয়। এ অবস্থায় বহুজাতিক কোম্পানি ও দেশের মুনাফামুখী ভালো কোম্পানিগুলোকে বাজারে তালিকাভুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
ডিএসইর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত কোম্পানির মৌলভিত্তি ও আর্থিক প্রতিবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে শেয়ার কেনেন। তাদের বিশ্লেষণও আন্তর্জাতিক মানের। আমাদের বাজারে ভালো কোম্পানির স্বল্পতা থাকায় তারা ৪০/৫০টি কোম্পানির বাইরে খুব একটা বিনিয়োগ করতে পারেন না।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ৩৩৩টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে মাত্র ২২টি কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিনিয়োগ করেছেন। এ কোম্পানিগুলোর মোট শেয়ারের অন্তত ৫ শতাংশ শেয়ার বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিনে রেখেছেন। ১৪টি কোম্পানির মোট শেয়ারের অন্তত ৩ শতাংশ শেয়ার কিনেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। এর বাইরে অল্প কয়েকটি কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কিছুটা বিনিয়োগ রয়েছে। আর ২২৩টি অর্থাত্ প্রায় ৬৭ শতাংশ কোম্পানির শেয়ারে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো বিনিয়োগই করেননি। ওটিসি (ওভার দ্য কাউন্টার মার্কেটের) মার্কেটের ৬৬টি কোম্পানিতেও বিদেশিদের কোনো বিনিয়োগ নেই। সেটি হিসাবে নিলে ৭৩ শতাংশ কোম্পানিতেই বিদেশিদের কোনো বিনিয়োগ নেই। মার্চেন্ট ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে মৌলভিত্তি সম্পন্ন ও ভালো কোম্পানির সংখ্যা বেশি হলে অনেক বেশি বিদেশি বিনিয়োগকারী নিয়ে আসা যেত। ভালো কোম্পানির স্বল্পতা থাকায় তারা আসতে চান না।
দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও কোম্পানির মৌলভিত্তি বিবেচনা করে শেয়ার ক্রয় করে থাকেন। তারা ভালো কোম্পানির স্বল্পতা থাকায় তারাও অল্প কিছু কোম্পানি ঘিরেই শেয়ার ব্যবসা করেন।
ডিএসইর তথ্যে দেখা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ২৯৮টি কোম্পানির মধ্যে ৩৮টি কোম্পানির উল্লেখযোগ্য শেয়ার কিনেছেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। এ কোম্পানিগুলোর অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে (যেহেতু মিউচুয়াল ফান্ডে মূল বিনিয়োগকারীই প্রতিষ্ঠান তাই মিউচুয়াল ফান্ডকে হিসাবে ধরা হয়নি)। এছাড়া ৮৪টি কোম্পানির ২০ শতাংশের বেশি (৩০ শতাংশের কম) শেয়ার রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে।
একাধিক মার্চেন্ট ব্যাংকার জানিয়েছেন, পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারলে তা পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক হবে। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখানে আসার ক্ষেত্রে ভালো কোম্পানির অভাবের কথা বলেন। পাশাপাশি যেসব কোম্পানি বাজারে রয়েছে তাদের আর্থিক প্রতিবেদেনর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন করেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। তাই পুঁজিবাজারের গতিশীলতা বাড়াতে ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন ও গ্রোথ কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাজারে নিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি দেশীয় ভালো কোম্পানিগুলোকেও বাজারে তালিকাভুক্ত করার ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি করতে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
ইত্তেফাক/নূহু
