বাংলাদেশের বিষয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অস্বস্তি এখনো রয়ে গেছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার রাজনীতি এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে যেসব কাজ করছে সেসব বিষয়ে অ্যামনেস্টির উদ্বেগের সবকিছুই যে একেবারে ভুল এমনটা আমরা নিশ্চয়ই বলব না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বা কোনো জাতির বিভিন্ন ইস্যুতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যখন কোনো উদ্বেগের কথা বলে তখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা যথাযথ হয়। এভাবে যখন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আমাদের উদ্বিগ্ন করে এমন বিষয় নিয়ে ভীতি বা উদ্বেগ প্রকাশ করে আমরা তা নিয়ে কোনো অভিযোগ করি না।
তবে এখন অ্যামনেস্টির সঙ্গে আমাদের মতান্তর হচ্ছে খসড়া মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার অপরাধ আইন ২০১৬ এর খসড়া নিয়ে তাদের সাম্প্রতিক মন্তব্যের জন্য। আমরা অবশ্যই উগ্র জাতীয়তাবাদী হব না। আমরা এ নিয়ে বিতণ্ডায় জড়াব না। তবে যে বিষয়টি আমরা একেবারে সুনির্দিষ্টভাবে অ্যামনেস্টিকে বলতে চাই তাহলো, আমরা যেভাবে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে তুলে ধরতে চাইছি অ্যামনেস্টির পর্যবেক্ষণে তা ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত সম্পর্কে তাদের বুঝার ব্যর্থতা রয়ে গেছে।
আজ বাংলাদেশে যে দলটি সরকারে রয়েছে ঘটনাক্রমে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে সেই দলটিই নেতৃত্ব দিয়েছিল। অ্যামনেস্টি সরকারের এই আচরণে হতাশ যে, সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কোনো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দিতে রাজি নয়। সরকারের এই অবস্থানে সমস্যা কোথায়, যেখানে দেশের সাধারণ মানুষও এর পক্ষে? কিছু খুব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র আছে, আছে কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা— যেসব নিয়ে আমরা কথা বলি না কেননা এর সঙ্গে নৈতিকতার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে।
১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিনির্মিত বাংলাদেশের ইতিহাস উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তেমনি আমাদেরও সেই নৈতিকতাই বড় মানদণ্ড। আজ সেই মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে অ্যামনেস্টি যেসব প্রশ্ন তুলে ধরেছে তা আমাদের জন্য সত্যিই অস্বস্তিকর। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এদেশিয় দোসররা ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে, দুই লাখ বাঙালি নারীর সম্ভ্রমহানি করেছে ওরা। সেই সময় এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলার গ্রাম, গঞ্জ, শহর, নগর- হানাদার বাহিনী আর তাদের দোসরদের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায়নি কোনো জনপদ।
এটাই সত্য। অ্যামনেস্টির শঙ্কা, মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার অপরাধ আইন ২০১৬ এ যুদ্ধ নিয়ে জনমানুষের আলোচনা এবং বিতর্কের ক্ষেত্রকে ‘নিয়ন্ত্রণ ও বাধাগ্রস্ত’ করবে। কিন্তু তাদের এই ধারণা ভুল। কোনোভাবেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা বা বিতর্কের পরিসর নিয়ন্ত্রণ করা এই আইনের লক্ষ্য নয়। এই মহান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতের অংশ হিসেবে আমরা আত্মপ্রকাশ করেছি সেই ইতিহাসের বিকৃতি রোধই এই আইনের মূল লক্ষ্য।
অ্যামনেস্টি যদি না জেনে থাকে তবে তাদের জেনে নেওয়া উচিত, কীভাবে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসকে এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা শাসক চক্র ভূলুণ্ঠিত করেছে। এটা খুব মজার ব্যাপার যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হলোকাস্ট বা নাৎসি বাহিনীর ইহুদি নিধনযজ্ঞকে অস্বীকার করার জন্য যখন ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ডেভিড আরভিংকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া হলো, তখন অ্যামনেস্টির মতো সংগঠনগুলো নীরব ছিল।
যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর চালানো অপরাধের ধরন এবং মাত্রা নিয়ে কোনো ধরণের প্রশ্ন তোলে বা সন্দেহ প্রকাশ করে তবে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়। গভীর এক নৈতিকতার মানদণ্ডেই সেই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ নিয়ে প্রশ্ন কেউ তুলতে পারে না, উচিতও নয়। কারণ জার্মান শাসক এডলফ হিটলার এবং তার বাহিনীর নিষ্ঠুরতম নীতির কারণে গ্যাস চেম্বারে প্রাণ গিয়েছিল ৬০ লাখ ইহুদির।
এমন একটি নিষ্ঠুরতম অতীতের অভিজ্ঞতা যাদের, সেই পশ্চিমের কিছু মানুষ ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ক্রমাগত আমাদেরকে বিব্রত করছে। এখানে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট করে এবং জোরালোভাবে বলতে চাই: মুক্তিযুদ্ধের অপরাধ অস্বীকার নিয়ে যে খসড়া আইনটি নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে তা কখনোই জনআলোচনা বা বিতর্কের পরিসরকে বাধাগ্রস্ত করবে না। যে সমস্ত পরিপ্রেক্ষিত আমাদের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল বা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশীয় এবং বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে বিপুল পরিসরে গবেষণার ক্ষেত্র রয়ে গেছে। যে দ্বন্দ্বের কারণে বাঙালিরা রক্তাক্ত একটি যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার অনেক ক্ষেত্র আছে। তবে অ্যামনেস্টি যদি মনে করে যে, ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে আমাদের ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলবে তবে তা স্রেফ অরণ্য রোদনই হবে।
এই আইনে ‘মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং এবং মিথ্যে প্রচারণা চালানোকে’ ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি এ আইন নিয়ে অ্যামনেস্টির আরেকটি উদ্বেগের কারণ। প্রশ্ন হলো, এখানে সমস্যাটা কোথায়? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল দ্রুত গঠন করে ইউরোপে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের দায়ে নাৎসিদের বিচার এবং শাস্তি শুরু হয়। আমাদের ইতিহাস-বিরুদ্ধ শক্তি দীর্ঘ সময় এ দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল। আর এ কারণেই ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের এবং যুদ্ধাপরাধে জড়িত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দোসরদের বিচার করতে বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যক্রমে কয়েক দশক লেগে গেছে।
বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ট্রাইব্যুনাল ছিল উন্মুক্ত। সেখানে অভিযুক্তদের আপিলের আবেদনসহ সমস্ত ধরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অপরাধের সমস্ত দলিল উপস্থাপন করা হয়েছে। এতকিছুর পরেও এখন আমাদের এটা শুনতে হবে যে ওই বিচার নিরপেক্ষ হয়নি? ১৯৭১ সালে আমরা যারা ওইসব যুদ্ধাপরাধীদের কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী তাদের কী এখন বলতে হবে যে আমরা যা দেখেছি ওইসময় তা ঠিক ছিলনা? ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পরপরই এ সমস্ত যুদ্ধাপরাধীকে তাদের অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি করতে অ্যামনেস্টিরই কি উচিত ছিল না কথা বলা? এ সমস্ত মানবতাবিরোধী অপরাধী সেই সময় যেসব অপরাধ করেছিল শুধু সেই অপরাধের জন্য আমরা কী আমাদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করিনি? এখন কেউ কী বলবে যে যুদ্ধেও সময় সংঘটিত অপরাধের বিচারে দ্বৈত আচরণ করাটাই ঠিক? ন্যুরেমবার্গে নাৎসিদের বিচার হতে পারে, টোকিওতে হিদেকি তোজো এবং তার সহযোগীদেরকে ফাঁসি হতে পারে, সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় অপরাধের জন্য মিলাসোভিচ এবং কারাদজিচের বিচার হতে পারে। এসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠবে না। কেবল আমরা বাঙালিরা যখন ১৯৭১ এ আমাদের বিরুদ্ধে বর্বরতম অপরাধে জড়িতদের বিচার করব তখন আমরা নিরন্তর প্রশ্নের মুখোমুখি হব, এটাই বাহ্য তাইতো?
অ্যামনেস্টি এই খসড়া আইনের ৪ ধারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা এই ধারা নিয়ে খুশী না। বিষয়টি কী এমন গর্হিত কোনো কিছু?
কেউ যদি ১৯৭১ সালে সংঘটিত ঘটনাকে অস্বীকার করে সেটা আমরা কোনো প্রতিবাদ ছেড়ে মেনে নেব?
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য বিবৃতির বহর যদি দিনের পর দিন চলতে থাকে তবে এটা কি খুব প্রত্যাশিত হবে যে আমরা নীরবে এসব হজম করে যাব, আমাদের দরজা খুলে রাখব এসব কাণ্ড-জ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য?
জাতীয়ভাবে স্বীকৃত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কোনো সরকারি প্রকাশনা কোনো সত্য তুলে ধরে, তবে সেগুলো যদি কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন ভুল করে প্রকাশ করে বা এগুলোর অসম্মান করে আমরা তা কি মেনে নিতে পারি?
এরপর আরেকটি বড় এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়টি থাকছে তাহলো, মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা শহীদ হয়েছেন অথবা যুদ্ধের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সেই সমস্ত মানুষদের কতটুকু মর্যাদা আমরা দিচ্ছি। বীর বাঙালির এই বীরত্ব গাঁথাকে যারা অশ্রদ্ধা করবে তাদের রুখতেই এই আইন। এখানে অ্যামনেস্টির মাথাব্যথা কেন এতো?
এখানে কথা প্রসঙ্গে একটা প্রশ্ন তোলাই যায়। ২০০৩ সালে ইরাকে ইঙ্গো-মার্কিন বাহিনী যে যুদ্ধাপরাধ করেছিল তা নিয়ে অ্যামনেস্টি কোনো অনুসন্ধান বা এ নিয়ে নিজেরা কোনো প্রশ্ন তুলেছে কী? সাদ্দাম হোসেনের কাছে মারণাস্ত্র থাকার যে ভুল তথ্য দিয়ে যে ধ্বংস ইরাকে চলল তার জন্য জর্জ ডব্লিউ বুশ বা টনি ব্লেয়ারের বিচারের জন্য ন্যুরেমবার্গ বা টোকিও ট্রায়ালের মতো কোনো দাবি কি অ্যামনেস্টি তুলেছে?
আগের কথায় আবার ফিরে আসি। দেশের কোনো ঘটনা নিয়ে প্রকৃত অর্থে অ্যামনেস্টি যদি উদ্বেগ জানায় তবে তা আমরা আনন্দচিত্তে গ্রহণ করব। কিন্তু ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে নির্মিত আমাদের মাতৃভূমির ইতিহাস সংরক্ষণের প্রচেষ্টা নিয়ে যদি কেউ প্রশ্ন তোলে তবে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা বিদেশি কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সুমহান ও সংগঠিত অভিজ্ঞতার অংশ। এ নিয়ে প্রশ্নকে ছাড় নয় কখনোই।
মত প্রকাশের অধিকার সমুন্নত রাখা অবশ্যই দরকার। তবে একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক প্রথা তুলে ধরা অনেক বড় বিষয়।
(লেখক: দ্য এশিয়ান এজ পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক)
