আমিরুলের স্বপ্ন ছোঁয়ার গল্প

আপডেট : ২১ মে ২০১৭, ১২:৫২
 
গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ এ বছর শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাচ্ছেন আমিরুল ইসলাম। কিন্তু যাকে বলে শিকড়; ঠিক সেই জায়গা থেকে উঠে আসা এই মানুষটার খোঁজ হয়তবা অনেকেই রাখেন না। সেই শিশুকালেই যোগ দিয়েছিলেন নিজ শহর কুষ্টিয়ার একটি থিয়েটারে। এরপর দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কুষ্টিয়া ও ঢাকা মিলিয়ে কাজ করেছেন প্রায় ২০/৩০টি থিয়েটারে। একাধারে অবদান রেখেছেন টেলিভিশনেও। অভিনেতা, গীতিকার, সুরকার ও গায়ক; নানাগুণে পরিপূর্ণ আমিরুল ইসলাম অবশেষে পেলেন জাতীয় স্বীকৃতি। ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’ চলচ্চিত্রে গীতিকার, গায়ক ও অভিনেতা হিসেবে অবদান রাখার পাশাপাশি শিল্প নির্দেশনা ও কসটিউমের কাজও করেছেন তিনি। ‘উথাল পাথাল জোয়ার ভাটা’ গানটির জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১৫। এ উপলক্ষে ইত্তেফাককে দেয়া একান্ত সাক্ষাত্কারে জানালেন, শিল্পী জীবনের নানা চড়াই উৎরাইয়ের গল্প।
 
IMG0
 
মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ছেলে আমিরুল ছোটবেলাতেই হারিয়েছেন বাবাকে। কিন্তু সেই অভাব বুঝতে দেননি বাবার মতো বড়ভাই কুষ্টিয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহ-সভাপতি সাইদুর রহমান। উনাকে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন আমিরুল ইসলাম। তবে আরো কিছু মানুষকেও বেশ গুরুত্বের সঙ্গে অবদান দিয়েছেন। মায়ের অনুপ্রেরণার পাশাপাশি মায়ের মতো বড় ভাবীকেও স্মরণ করেন তিনি। জানালেন, ভাবী পারুল আক্তারই ছিল তার সকল আবদার রক্ষার বড় আশ্রয়স্থল। শত আবদার মুখ বুঝে মিটিয়েছেন পারুল আক্তার। ছোট ছোট অপরাধগুলোকে লুকিয়েছেন নিজের আঁচলে। আর জীবন সঙ্গী সেলিনা আক্তারকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা হারানো আমিরুল ইসলাম বললেন, তার সহযোগিতা ছাড়া এসব হয়তবা কিছুই সম্ভব ছিলনা। এছাড়াও এই পুরস্কার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান প্রয়াত প্রখ্যাত নাট্যকার মরহুম জিন্না হক, একমাত্র সন্তান আর্য্য দিগন্তকে।
দীর্ঘ সাধনার ফসল ঘরে তুলতে পেরে আনন্দে উদ্বেলিত আমিরুল ইসলাম বললেন, এই পুরস্কার আমাকে আজীবন কাজ করে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাবে, পথ দেখাবে। আজ আমাকে যে সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে, তার ঋণ কতটুকু শোধ করতে পারবো জানিনা। তবে বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতির ঝাণ্ডা সমুন্নত রাখতে চেষ্টা করবো। তিনি বলেন, আমি আমার এই প্রাপ্তি উৎসর্গ করছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের।
 
 
শিশু অভিনয় শিল্পী হিসেবে চৌরহাস মুকুল সংঘ স্কুল থিয়েটার থেকে যাত্রা শুরু। এরপর রাসেল স্মৃতি সংসদ, নুপুর, বোধন, পরিমল থিয়েটারসহ কুষ্টিয়ার সবগুলো থিয়েটারেই কমবেশি অবদান আছে তাঁর। সেই সাথে সমান গতিতে চলেছে লালনের মাজার কেন্দ্রিক বাউল গানের চর্চা।
 
২০০১ সালে সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটারে কাজের সুযোগ পেয়ে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। কাজ করার সুযোগ পান শহীদুল আলম সাচ্চুর ‘থিয়েটার সেন্টারে’। এর কিছুদিন পরেই প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন রিসোর্স বাংলাদেশ থিয়েটারে। ২০০৭ সালে প্রখ্যাত নাট্যকার মাসুম রেজা ও শামসুল আলম বকুল প্রতিষ্ঠিত দেশনাটকে অভিনেতা হিসেবে কাজ শুরু করেন।
তার রচিত টেলিভিশন নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম (ধারাবাহিক) লালন কয় যেতে পারি, নীলচন্দ্র, স্বচ্ছ স্বরবর, অবোধ, আলাল দুলাল, বিষাক্ত বিষাদ, ময়ূর চিত্ত, অবগুণ্ঠিত চাঁদ।
একক ও টেলিফিল্ম: ভাটির কলমী, বায়ুবীয় ভালবাসা, কালোপদ্ম, বিষচোখ, কালোপদ্ম, নিন্দার কাটা, রংমাখামুখ ও ভুজঙ্গনা।
মঞ্চ নাটক রচনা: বেড়া, ত্রিবেণী, কমলা পুরের ককিলারা, পদ্ম গোখরা ও পরমানুষ।
আমিরুল ইসলাম অভিনীত টিভি নাটকগুলো হলো— আরশি নগর, কোন সীমানায় মুক্তি, তেভাগা, তের কাহন, ইট কাঠের খাঁচা, নীল নির্জনে, চৌদ্দ ফ্রেম, বারোটা বেজে পাঁচ, একটি সাধারণ প্রেমের গল্প, ঘরে ফেরা ও নূরজাহান অন্যতম।
তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো হলো—হেলেনের চোখে বাংলাদেশ, প্রিন্স অব বেঙ্গল, লালন, কান্না, বাপজানের বায়োস্কোপ ও সোনাদ্বীপ ।
অভিনীত মঞ্চ নাটক: বিরসাকাব্য, জনমে জন্মান্তর, ভক্ত, বাঘাল, প্রাকৃত পুরাঙ্গণা, দর্পণে শরত্ শশী, সোনাবিবির শাড়ি, একটি পয়সা, এবার ধরা দাও, উনিশ শ একাত্তর ও বেড়া অন্যতম।
 
নাট্য নির্দেশনাতে দেখিয়েছেন সমান পারদর্শিতা। তোতা কাহিনী, ডোমরু, ত্রিবেনী, কমলাপুরের ককিলারা, পদ্ম গোখরা পরমানুষ, পাল্লায় ফের নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন বেশ শক্ত হাতে।