মোরায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর মেরামত করে দেওয়া হবে :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০১ জুন ২০১৭, ০৪:০২

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা ঘূর্ণিঝড় ‘মোরায়’ ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেন, আল্লাহর রহমতে যে পরিমাণ ক্ষতি হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। সাগরে ভাটা থাকায় ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হয়েছে। সরকার ও সচেতন প্রশাসন দুর্যোগ মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি ও পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে প্রচুর ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, গাছপালা ভেঙে পড়েছে। প্রাকৃতিক এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত সব বাড়িঘর মেরামত করে দেওয়া হবে। খাদ্য ও নগদ সহায়তার পাশাপাশি পুনর্বাসনে সবকিছু করা হবে। কারণ আমরা জনগণের সেবার জন্যই রাজনীতি করি। কেবল সরকারে নয়, বিরোধী দলে থাকতেও যেকোনো দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে সরকারি ও বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্যের লিখিত ও সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল সকাল ৭টায় অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা সফর শেষে দেশে ফিরেই সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। তার এই ক্লান্তিহীন পরিশ্রমের ভূয়সী প্রশংসাও করেন সংসদ সদস্যরা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সেই দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। এ ধরনের দুর্যোগে মানুষের জীবন রক্ষাই আমাদের প্রথম লক্ষ্য। সরকারি দলের সংসদ সদস্য মাহবুবউল আলম হানিফের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসবেই। কিন্তু ওই সময় আমাদের প্রথম কর্তব্য মানুষের জীবন রক্ষা করা। আমরা সতর্ক আছি। যখনই ঘূর্ণিঝড়ের আভাস পাই, তখনই কতটুকু ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে এবং সেগুলো মোকাবিলায় কার কী করণীয় তা নির্ধারণ করে মানুষের পাশে ছুটে যাই। সব ধরনের আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করি বলেই দুর্যোগ মোকাবিলা করতে আমরা সক্ষম হই। তিনি জানান, গতকাল সকালে দেশে ফেরার পরপরই তিনি গণভবনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে। দলের পক্ষে একাধিক টিমও গঠন করা হয়েছে। যেগুলো আজ-কালের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ শুরু করবে। কেমন ক্ষতি হয়েছে, পুনর্বাসনে কী কী করণীয় সেগুলোও তারা (আওয়ামী লীগ) নির্ধারণ করে সুপারিশ করবে। সরকার, প্রশাসন, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও ঘূর্ণিঝড় মোরায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কল্যাণে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ও ব্যাপক সম্পদহানি হলেও তত্কালীন বিএনপি সরকারের নিদারুণ ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা ও মানুষের জানমাল রক্ষায় বিএনপি সরকারের কোনো পূর্বপ্রস্তুতিই ছিল না। এ কারণে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়, ঘরবাড়ি ও সম্পদ ধ্বংস হয়। বিপুল সংখ্যক গবাদি পশু ভেসে যায়। নৌবাহিনীর জাহাজ ও বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে সময় বিরোধী দলে থাকলেও আমরা দলের সব সংসদ সদস্যকে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি এমনকি মারা যাওয়া মানুষের মরদেহ উদ্ধার ও দাফনের পদক্ষেপও নিয়েছিলাম।  তিনি বলেন, ওই সময় আমি সংসদে দাঁড়িয়ে লাখ লাখ প্রাণহানি ও ব্যাপক সম্পদ ধ্বংসের কথা তুলে ধরলে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘যত মানুষ মারা যাওয়ার কথা ছিল, তত মানুষ মারা যায়নি।’ আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘কত মানুষ মারা গেলে আপনার তত মানুষ হতো?’ খালেদা জিয়া এই প্রশ্নের জবাব দেননি। কত লাখ মানুষ মারা গেছে, কত গবাদিপশু ভেসে গেছে, কত ঘরবাড়ি ও গাছপালা ধ্বংস হয়েছে—তার খোঁজ-খবরও বিএনপি সরকার রাখেনি।    

সরকারি দলের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবদুল্লাহের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাওরসহ দুর্গত এলাকায় নদীভাঙন রোধে বাঁধ নির্মাণসহ প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে। এটি শেষ হলে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজও শুরু হবে। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাওর, বাওর ও বিলের উন্নয়নে সরকার ইতোমধ্যেই হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করেছে। এই কার্যক্রমগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন দরকার। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড ঢিমেতালে চললে চলবে না। এই কাজগুলোতে গতিশীলতা আনতে হবে।

সরকারি দলের সিরাজুল ইসলাম মোল্লার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দেশের সামরিক বাহিনীর সুবিধা ও তাদের স্বাধীনভাবে নিজস্ব নিয়মে পরিচালিত হওয়ার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। সশস্ত্র তিনটি বাহিনীর নীতি-নির্ধারণী কার্যক্রম সম্পন্নের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে সশস্ত্র বাহিনী পরিচালিত হচ্ছে। সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে ভিশন-২০৩০ প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাহিনী প্রধানগণ কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্য বেগম ফজিলাতুন নেসা বাপ্পির প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নৈসর্গিক সৌন্দর্যমণ্ডিত কক্সবাজারে ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ অবিচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত এলাকায় সম্প্রতি কক্সবাজার শহর থেকে সীমান্তবর্তী টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটি ৩টি পর্যায়ে বিভক্ত করে এর মেয়াদ কাল ছিল সেপ্টেম্বর ১৯৯৩ হতে জুন ২০১৮ পর্যন্ত। নির্ধারিত তারিখের পূর্বেই গত ৬ মে আমি এর উদ্বোধন করেছি। সরকারি দলের সদস্য কামরুল আশরাফ খানের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের আওতায় গঠিত ৬৬ হাজার ৬০টি সমিতিতে প্রায় ২৮ লাখ সদস্যের পরিবার উপকৃত হচ্ছে। জাতীয় পার্টির (জাপা) সংসদ সদস্য ফখরুল ইমামের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা ২৪ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

সংসদে ডিজিটাল হাজিরার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় সংসদের অধিবেশনের হাজিরায় ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার একজন এমপি হিসেবে ডিজিটাল পরিচয়পত্র ব্যবহার করে হাজিরা দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রশ্নোত্তর পর্বেও সংসদ কক্ষে তাকে নীল ফিতায় সবুজ রঙের নতুন পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে অংশ নিতে দেখা গেছে।

প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেছেন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অস্ট্রিয়ায় দুই দিনের সফর শেষে দেশে ফিরেছেন। প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভিভিআইপি ফ্লাইটটি গতকাল বুধবার সকাল ৭টা ২০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণ করে।

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী সোমবার অস্ট্রিয়ায় যান। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার ‘আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার কারিগরি সহযোগিতা কর্মসূচি : ৬০ বছর পেরিয়ে উন্নয়নে অবদান’ শীর্ষক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর ক্রিস্টিয়ান কের্ন এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভ্যানডার বিলেনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। শেখ হাসিনা আইএইএ মহাপরিচালক ইয়োকিয়া আমানোর সঙ্গে তার অফিসে বৈঠকে করেন।

ইত্তেফাক/নূহু