করের আওতা বাড়াতে সরকার ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামছে। গত ১ জুন অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বাজেটে এ আওতা আরো বিস্তৃত করার কথা বলা হয়েছে। চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই করের আওতায় আসছেন। প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন করে চারটি খাতের ব্যক্তির ই-টিআইএন (অনলাইনে কর সনাক্তকরণ নম্বর) নেওয়া বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। ফলে ৩১ খাতের ব্যক্তিকে করের আওতায় আসতেই হচ্ছে। অন্যদিকে জেলা, উপজেলা ছাড়িয়ে করজাল ছড়িয়ে পড়বে গ্রামেও। গ্রামগঞ্জের অলিগলির মোবাইল ফোন রিচার্জ ব্যবসায়ী, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবসায়ীকেও নিতে হবে ই-টিআইএন। দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদকে ই-টিআইএন দেওয়ার জন্য কাজে লাগানো হবে।
এছাড়া নজরদারির আওতায় আসছে আর্থিক লেনদেনসহ সরকারি-বেসরকারি খাত থেকে সেবাগ্রহণকারী বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। আগামী বছর থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করা হবে অনলাইনে উেস কর কর্তন (সেন্ট্রাল ই-টিডিএস) কার্যক্রম। চালু হবে কর তথ্য ইউনিট। রাজউক, ভূমি অফিস, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর এনবিআরের কাছে থাকা তথ্যের সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে করযোগ্য আয় যাচাই-বাছাই করা হবে। ফলে করজালের বাইরে থাকা অনেককেই আসতে হবে করের আওতায়।
এছাড়া জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া ভ্যাট আইনেও (মূল্য সংযোজন কর) ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে ভ্যাটের আওতা। প্লাস্টিকের পণ্য, রুটি, বিস্কুট, কেক, স্বল্প দরের জুতাসহ স্বল্প আয়ের ভোক্তার প্রয়োজনীয় অনেক পণ্যে আরোপ হচ্ছে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা হিসেবে বিদ্যুত্, পানিতেও ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ হচ্ছে। ফলে স্বল্প আয়ের ভোক্তাও চাপে পড়তে যাচ্ছে। রডের উপর ১৫ শতাংশ ভ্যাটের ফলে সব ধরণের অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয় বাড়বে।
রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানিয়েছে, গত বছর নাগাদ দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ। আগামী ২০১৯ সাল নাগাদ সরকার এ সংখ্যাকে ৪০ লাখে উন্নীত করতে চায়। এ লক্ষ্যে গত বছরের বাজেটেও করের আওতা বিস্তৃত করার জন্য ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে এক বছরেই টিআইএনধারী ১৮ লাখ থেকে এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ লাখে। আগামী জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কমপক্ষে আরো ছয় লাখ টিআইএনধারী যুক্ত হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে বেড়েছে রিটার্ন জমাদানকারী করদাতার সংখ্যাও। ২০১৬-১৭ করবর্ষে রিটার্নধারী ছিল ১১ লাখের নিচে। আর চলতি করবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৬৫ হাজার।
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের টিআইএন নেওয়া বাধ্যতামূল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্রেডিট কার্ড থাকলেও নিতে হবে টিআইএন। এ তালিকায় আরো যুক্ত হচ্ছে যে কোন কোম্পানির পণ্য পরিবেশক বা এজেন্সির মালিক, কোন উপদেষ্টা বা পরামর্শক, ক্যাটারিং সেবা প্রদানকারী, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সেবা, নিরাপত্তা সেবা প্রদানকারী ছাড়াও আমদানি রপ্তানিকারক।
গত বছরের বাজেটে করের আওতা বাড়াতে ‘ব্যাপক’ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যে কোন প্রতিষ্ঠানে ১৬ হাজার টাকা মূল বেতন হলেই তার টিআইএন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এমপিওভুক্ত স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীর মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা হলেও করের আওতায় আসতে হবে। গত বছর যে কোন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বা কর্মকর্তা পর্যায়ের ব্যক্তিকে টিআইনের আওতায় আনা হয়েছিল। এবারের বাজেটে আরেক ধাপ এগিয়ে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক, উপজেলা কিংবা পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে ; ইটভাটার মালিক, বীমার এজেন্সি, প্রাইভেট কারের মালিক হলে ; জেলা, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করতে হলে ; জেলা, উপজেলা বা পৌরসভা এলাকায় এপার্টমেন্টের (দলিল মূল্য এক লাখ টাকার বেশি হলে) মালিক হলে, সিটি করপোরেশন বা পৌরসভায় এলাকায় বিদ্যুতের বাণিজ্যিক সংযোগ নিতে, বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে, ওষুধ বিক্রির লাইসেন্স, রাউজকসহ, সিডিএ ছাড়াও খুলনা, রাজশাহীসহ এ ধরণের এলাকায় ভবন তৈরির ক্ষেত্রে, কোন বাণিজ্যিক সংগঠনের সদস্য হলে, নিকাহ রেজিস্ট্রার, কোন কোম্পানির পরিচালক হলে; ডাক্তার, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী, ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকার উপরে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে; বাস, ট্রাক, প্রাইম মোভার, লরিসহ এ জাতীয় ভারী যানবাহনের মালিক হলে; অভিজাত ক্লাবের সদস্য হলে; আমদানি বা রপ্তানি সনদ নেওয়ার ক্ষেত্রে এবং আমদানির ক্ষেত্রে এলসি (ঋণপত্র) খোলার ক্ষেত্রে ই-টিআইএন নেওয়া বাধ্যতামূলক।
দেশে জনসংখ্যার তুলনায় আয়করদাতার সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ার ইস্যুটি প্রায়ই আলোচনায় আসছে। অর্থমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, ১৬ কোটি মানুষের দেশে অন্তত ৫০ লাখ লোক আয়কর দেওয়া উচিত। অথচ কর দেয় ১০ থেকে ১১ লাখ। এ সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজনের কথা বিভিন্ন সময়েই বলেছেন তিনি। এবারের বাজেট বক্তৃতায়ও করের আওতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
এনবিআরের আয়কর বিভাগের একজন ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, করদাতার বাড়ানোর ক্ষেত্রে যে সব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তাতে আগামী ২০১৯ সাল নাগাদ নিবন্ধিত করদাতা ৪০ লাখ ছাড়াবে। তিনি বলেন, গত এক বছরেই আয়করের খাতায় নাম লিখিয়েছেন ১০ লাখের বেশি। আগামী বছর আরো অন্তত ৬ লাখ নতুন করদাতা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া আগামী বছর সেন্ট্রাল ই-টিডিএস ও কর তথ্য ইউনিট চালু হওয়ার পর কর ফাঁকি রোধ ও করদাতা বৃদ্ধিতে অনেক অগ্রগতি হবে।
বাড়ছে ভ্যাটের হার ও আওতা :
বহুল আলোচিত ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার পর বিশাল সংখ্যক পণ্য ও সেবা ১৫ শতাংশ ভ্যাটের তালিকায় আসছে। গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য ১৯ ধরণের প্লাস্টিকের পণ্য নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাটের আওতায় আসছে। এসব পণ্য সব শ্রেণীর মানুষের বাসা বাড়িতে প্রয়োজন হয়। রাস্তার পাশের একটি সাধারণ মানের রেস্টুরেন্টে খাওয়ার জন্য গুণতে হবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। এতদিন নন এসি রেস্টুরেন্টে খাওয়ার ক্ষেত্রে সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ করতে হতো। বিদ্যুত্ বিলসহ ১৫ ধরণের পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট (সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্যে) দেওয়ার সুযোগ বাতিল হয়ে ১৫ শতাংশ কার্যকর হচ্ছে। পানির উপরও গুণতে হবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। গার্মেন্টস পণ্যের উপরও আরোপ হচ্ছে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। আগে এটি ছিল চার শতাংশ। রডসহ ৭০ ধরণের পণ্য ও সেবায় ট্যারিফ মূল্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ভ্যাট দেওয়ার ব্যবস্থা আর থাকছে না। সাধারণ ও স্বল্প আয়ের মানুষের ব্যবহার্য হ্যন্ডলুম পণ্য-বিশেষত লুুঙ্গি, গামছাজাতীয় পণ্য, স্বল্প মূল্যের জুতা, হাওয়াই চপ্পল ভ্যাট অব্যাহতির তালিকায় নেই। এছাড়া ঘরে বানানো রুটি-বিস্কুট ও কেক জাতীয় পণ্যেও ভ্যাট হতে পারে ১৫ শতাংশ।
এসব পণ্যে বাড়তি ভ্যাট দিতে হলে তার প্রভাব পড়বে ভোক্তার উপর। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমানও মনে করেন, ১৫ শতাংশ ভ্যাটের কারণে মূল্যস্ফীতি হতে পারে।
ইত্তেফাক/সাব্বির
