ব্যাংকিং খাতের ঋণের গড় সুদের হার ১০ শতাংশের নিচে বা সিঙ্গেল ডিজিটে নেমেছে বেশ কয়েক মাস আগেই। প্রতি মাসের হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, গড় সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে আসা ব্যাংকের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে ৫৭টি তফসীলি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৯ টি ব্যাংকের সুদের হার এখনো ১০ শতাংশের উপরে রয়েছে। আর বাকিগুলোর গড় সুদের হার ১০ শতাংশের নিচে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন দেশের বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। উদ্যোক্তারা যে পরিমাণ ঋণ নেওয়ার দরকার তা নিচ্ছে না। ফলে ব্যাংকিং খাতে অলস টাকা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিচালন ব্যয় কমাতে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার কমাচ্ছে। যাতে নতুন করে আমানত না আসে সেদিকেও নজর রাখছে ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এমন পরিস্থিতিতে দেখা গেছে।
এদিকে গত এপ্রিল শেষে ব্যাংকিং খাতে গড় আমানতের সুদহার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ। আর ঋণের সুদহার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এতে স্প্রেড (ঋণ ও আমানতের মধ্যকার সুদহারের ব্যবধান) দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশীয় পয়েন্টে। একমাস আগে অর্থাত্ মার্চে ব্যাংকিং খাতে গড় আমানতের সুদহার ছিল ৫ দশমিক ০১ শতাংশ। আর ঋণের হার ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আমানতের সুদহার গত এক বছরের ব্যবধানে কমেছে দশমিক ৮০ শতাংশ এবং ঋণের সুদহার কমেছে এক দশমিক দুই শতাংশ। আর দুই বছরের ব্যবধানে আমানতের সুদহার কমেছে ২ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং ঋণের সুদহার কমেছে ২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
২০১৬ সালের এপ্রিলে আমানতের সুদহার ছিল ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং ঋণের হার ছিল ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এর আগের বছর ২০১৫ সালের এপ্রিলে আমানতের সুদহার ছিল ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। আর ঋণের হার ছিল ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্র্যাক ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এসবিএসি ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক লিমিটেডের ঋণের সুদের হার ১০ শতাংশের উপরে। এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, স্যোসাল ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকের নাম রয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আমানতের সুদহার ৫ শতাংশের নিচে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী, জনতা ও সোনালী ব্যাংক। এর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের আমানত হার ৪ দশমিক ২১ শতাংশ এবং জনতার আমানত হার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং সোনালীর আমানত হার ৪ দশমিক ৭১ শতাংশ।
বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংকের আমানত হার ৪ দশমিক ১৭ শতাংশ, সিটি ব্যাংকের ৪ শতাংশ, ইউনাইটেড কর্মাসিয়াল ব্যাংকের ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ, পূবালী ব্যাংকের ৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ, উত্তরা ব্যাংকের ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ, ইস্টার্ন ব্যাংকের ৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংকের ৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ, ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ, ব্যাংক এশিয়ার ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ, ট্রাস্ট ব্যাংকের ৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ, ব্র্যাক ব্যাংকের ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ, আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ৩ দশমিক ১২ শতাংশ।
এছাড়া স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ১ দশমিক ২৭ শতাংশ, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ২ দশমিক ৯১ শতাংশ, হাবিব ব্যাংকের ৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ, সিটি ব্যাংক এন এ এর দশমিক ১৩ শতাংশ, কর্মাসিয়াল ব্যাংক অব সিলন ব্যাংকের ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ, উরি ব্যাংকের ২ দশমিক ১১ শতাংশ, এইচএসবিসির ১ দশমিক ৩৩ এবং ব্যাংক আল ফালাহর ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমানতের সুদ দিচ্ছে চতুর্থ প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংক। আমানতকারীদের ৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ সুদ দিচ্ছে ব্যাংকটি। আর সবচেয়ে কম সুদ দিচ্ছে বিদেশি সিটি ব্যাংক এন এ। বাংকটির আমানত হার দশমকি ১৩ শতাংশ।
এদিকে আমানতের সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে রাখতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেখানে বলা হয়, সমপ্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদ ঋণের সুদের তুলনায় দ্রুত কমে অনেক ক্ষেত্রে ৫ শতাংশীয় পয়েন্টের নিচে নেমে এসেছে।
এছাড়া খেলাপি ঋণ আদায়সহ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে সে পরামর্শ ফলপ্রসু হয়নি। ফলে পুরো ব্যাংক খাতে আমানতের সুদ ধারাবাহিকভাবে কমছে।
এদিকে স্প্রেড বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এখনও তা মানেনি দেশি-বিদেশি ১৫টি ব্যাংক। এ সীমা লঙ্ঘনে সবার শীর্ষে রয়েছে বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংক ও ডাচ বাংলা ব্যাংক এবং বিদেশি খাতের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক।
জানা গেছে, সুলভ বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে ঋণের সুদহার এক অঙ্কের ঘরে নামানোর দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি অনুযায়ী, ঋণের সুদহার কমাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উপর বিভিন্ন সময়ে চাপ সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
