হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় নিহতদের প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা

আপডেট : ০২ জুলাই ২০১৭, ১০:০০
 
গতকাল শনিবার সকাল থেকেই শত শত মানুষের ঢল নামে গুলশানের ৭৯ নম্বর রোডের সেই হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয়। কারো হাতে ছিল ফুল, আবার কেউ খালি হাতেই শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। কেউবা শোকের প্রতীক কালো পোশাক পরেছিলেন। মাত্র এক বছর আগে এই হলি আর্টিজানে ঘটে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও বীভত্স জঙ্গি হামলার ঘটনা।
 
ওই ঘটনার পর হলি আর্টিজান এতদিন বন্ধ ছিল। গতকাল নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে খুলে দেয়া হয় হলি আর্টিজান এলাকার প্রবেশ দরজা। তবে দোতলা ওই ভবনের দরজা উন্মুক্ত করা হয়নি। ভবনের পাশেই বারান্দার ওপর শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য অস্থায়ী বেদি তৈরি করা হয়। সেখানে ফুল দিয়ে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন আগতরা। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় অনেকেই ফুঁপিয়ে কেঁদেছেন।
 
সকালে ফুল দিতে এসেছেন জঙ্গি হামলায় নিহত ইতালিয়ান নাগরিক নাদিয়া বেনেদেত্তি’র ননদ সামিনা রাখানু। তিনি বলেন, ‘আজকের দিনটি আমার পরিবারের জন্য খুব বেদনাবিধুর। অনেক কষ্ট জমা নিয়ে হলি আর্টিজানে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। নাদিয়াকে আমরা খুব মিস করি। তাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ইতালি থেকে বাংলাদেশে এসেছি।’ একপর্যায়ে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
 
হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় ইতালির ৯ জন ও ৭ জন জাপানি নাগরিক নিহত হন। ইতালির রাষ্ট্রদূত মারিও পালমা’র নেতৃত্বে দূতাবাসের একটি প্রতিনিধ দল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জাপানের রাষ্ট্রদূত মাসাতো ওয়াতানাবে’র নেতৃত্বে দূতাবাসের একটি প্রতিনিধি দল শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি জাইকা’র একটি প্রতিনিধি দলও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
 
নিহত ইশরাত আখন্দের পরিবারের সদস্যরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ইশরাত আখন্দের মামা বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, তরুণদের জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়া রুখতে হবে। সরকারও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জঙ্গিবাদ রুখতে সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে।
 
হলি আর্টিজানের ডিশ ক্লিনার নিহত জাকির হোসেন শাওনের পরিবারের সদস্যরা শ্রদ্ধা জানায়। ‘শাওনকে পুলিশ পিটিয়ে মেরেছে। তার শরীরের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।’ কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলেন শাওনের মা মাসুদা বেগম।
 
বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত আইজি মোঃ মোখলেসুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল হলি আর্টিজানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। মোখলেসুর রহমান বলেন, ওই দিন পুলিশ জীবনবাজি রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। জঙ্গিবাদের মূল উত্পাটন করতে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্নস্থানে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।
 
এ সময় ডিএমপি কমিশনার মোঃ আছাদুজ্জামান মিয়া, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। হামলায় নিহত পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলামের স্মরণে বিসিএস ৩০তম পুলিশ ব্যাচের পক্ষ থেকে ডিবির সহকারী কমিশনার মিথুন, সহকারী কমিশনার তৌফিক উদ্দিন, গুলশানের সহকারী কমিশনার (ট্রাফিক) জুনায়েদ ও সহকারী কমিশনার কামরুজ্জামান ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
 
নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনা দেশের প্রত্যেকটি মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। এই হামলার ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিল এবং পেছন থেকে কারা মদদ দিয়েছে তা এখন পর্যন্ত উদঘাটন হয়নি। এ সময় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ, সাবেক এমপি হাবিবুর রহমান হাবিব, যুবদলের নেতা আশরাফুল আলম এবং খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তা শায়রুল কবীর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
 
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, হলি আর্টিজানের ঘটনা বাংলাদেশকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। বিশ্বে বাংলাদেশের বিষয়ে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।
 
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এখন যারা জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছে তারা ইংলিশ মিডিয়ামসহ ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করা শিক্ষার্থী। এটা একটা ভয়াবহ তথ্য। কারণ আমরা শুনেছি যে, আগে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জঙ্গিবাদে জড়াতো। এখন দেখা যাচ্ছে, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরাও জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছে। এটা জাতির জন্য বড় একটা হুমকির বিষয়।
 
শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের মেয়ে শমী কায়সার বলেন, বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। নানা ধর্মের লোকজন হাজার বছর ধরে এখানে বসবাস করে আসছেন। জঙ্গিবাদ রুখতে রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সংস্কৃতির আন্দোলনকে বেগবান করতে হবে।
 
শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সন্তান তৌহিদ রেজা নূর বলেন, ৩০ লাখ শহীদের বাংলাদেশে ধর্মের নামে জঙ্গিবাদকে কখনই মেনে নেয়া যায় না।
 
শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর ছেলে আসিক মুনীর বলেন, জঙ্গিবাদের ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি সুস্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে যে, যারা জঙ্গিবাদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, জঙ্গিবাদের মদদ দেয় এবং অর্থ প্রদান করে তাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখা হবে না। শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলিম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী বলেন, এমন কলঙ্কজনক বর্বরতা কখনই কাম্য হতে পারে না। তিনি ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি করেন। আরো শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী ড. চঞ্চল চৌধুরী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রুবাবা দৌলা, আমরা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান’র সভাপতি হুমায়ুন কবীর প্রমুখ।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর