উত্তরাঞ্চলে বিভিন্ন স্থানে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অনেক মানুষ। সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে নির্মাণাধীন শহর রক্ষা বাঁধে ফের ধস দেখা দিয়েছে। আতঙ্কে আছেন সেখানকার মানুষ। বগুড়ার ধুনট ও সারিয়াকান্দি এবং জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। কুড়িগ্রামে ৩৩ কমিউনিটি ক্লিনিকের চারদিকে পানি উঠায় চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে সিলেটে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও কক্সবাজারের চকরিয়ায় বন্যার পানি কমলেও দুর্ভোগ কমেনি। খবর আমাদের অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের।
সিরাজগঞ্জ ঃ সিরাজগঞ্জের নিকট যমুনা নদীর পানি দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। গতকাল যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ১৭.০২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে পানি বৃদ্ধির কারণে সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, চৌহালী, কাজিপুর ও শাহজাদপুর উপজেলার যমুনা চর এলাকার ২৭টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষগুলো উঁচু বাঁধ বা বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিচ্ছে বলে জানা গেছে ।
অপরদিকে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সিরাজগঞ্জের চৌহালীতে নির্মাণাধীন শহর রক্ষা বাঁধে আবারো ধস দেখা দিয়েছে। শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাঁধটির খগেন ঘাট সংলগ্ন দক্ষিণের ব্রীজ থেকে সিদ্দিকের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৭৫ মিটার এলাকা ধসে যায়। এ কারণে যমুনা তীরবর্তী মানুষের মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সরাতৈল থেকে দক্ষিণে নাগরপুর উপজেলার পুকুরিয়া, খগেনের ঘাট, সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ঘোরজানের চেকির মোড়, আজিমুদ্দি মোড়, খাসকাউলিয়া, জোতপাড়া পর্যন্ত সাত কিলোমিটার এলাকা রক্ষায় ১০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে চৌহালী শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে যার ৯৫ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাঁধটির বিভিন্ন অংশ কয়েকবার ধসে গেছে। ধসের খবর পেয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক এ এম আমিনুল ইসলাম ও পাউবো টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক কাজী তোফায়েলের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ভাঙনকবলিত এলাকায় উপস্থিত থেকে মেরামত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই বাঁধটিতে দফায় দফায় ধস দেখা দেওয়ায় তীরবর্তী বসবাসরত মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে শুক্রবার রাতে ৭৫ মিটার এলাকা ধসে যাওয়ায় সড়ক পথে যোগাযোগ হুমকির মধ্যে রয়েছে।
এদিকে বাঁধটি নির্মাণকাজের তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহজাহান সিরাজ জানান, ‘যমুনার পানি বৃদ্ধি ও প্রবল সে াতের কারণে বাঁধের তলদেশ গর্তের সৃষ্টি হয়ে এ ধস দেখা দিয়েছে। বাঁধ সংস্কারের কাজ চলছে।
বগুড়া সারিয়াকান্দি, ধুনট ও সোনাতলা ঃ উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বগুড়ার ধুনট ও সারিয়াকান্দি উপজেলায় যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার যথাক্রমে ১৬ ও ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে উভয় উপজেলার প্রায় ৭ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। দেখা দিয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। পানিবন্দি লোকজন বসতবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে। অনেক পরিবার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। পানি বৃদ্ধির কারণে নিম্নাঞ্চলের এক হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী হারুনর রশিদ জানান, গত কয়েক দিন ধরে যমুনা নদীর পানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে শনিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত শহড়াবাড়ি ঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনা পাড়ের ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন শ্যামল বলেন, পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের অভ্যন্তরে (পূর্ব পাশে) মাধবডাঙ্গা, ভুতবাড়ি, পুকুরিয়া, কৈয়াগাড়ি, বানিয়াজান, শিমুলবাড়ি, রাধানগর, বৈশাখী ও শহড়াবাড়ি গ্রামের বাড়িঘর ডুবে যাচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৫ হাজার পরিবার। বিষয়টি ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলে অবহিত করা হয়েছে।
এদিকে বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর পানি বিপদ সীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে ছয়টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম এবং ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন করে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। ইতোমধ্যে ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন , বন্যার্তদের জন্য জেলা প্রশাসক ৫০ টন চাল বরাদ্দ করেছেন । আরও ৩শ টন চাল ও শুকনো খাবারের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে আবেদন করা হয়েছে । এদিকে বগুড়া-১ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান শনিবার বন্যাদুর্গত কয়েকটি ইউনিয়নের ১ হাজার পরিবারের মধ্যে চাল বিতরণ করেছেন । আশ্রিত পরিবারগুলোর জন্য বাঁধের উপর ২৫টি নলকূপ ও ল্যাট্রিন বসানো হয়েছে।
এদিকে বগুড়ার সোনাতলায় যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে ওয়াপদা বাঁধের পূর্ব পাশে তেকানী চুকাইনগর ও পাকুল্যা ইউনিয়নের প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও কাচারি বাজারে পানি উঠেছে।
জামালপুর ও মেলান্দহ ঃ জামালপুর জেলার সার্বিক বন্যার পরিস্থিতি আরো অবনতি ঘটেছে। দেওয়ানগঞ্জ,ইসলামপুর, মেলান্দহ,মাদারগঞ্জ উপজেলায় নতুন করে প্লাবিত হয়ে মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার পানি বৃদ্ধির ফলে ইসলামপুর উপজেলা ২০টি দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ১টি এবং মেলান্দহ উপজেলায় ১টি মোট ২২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জলমগ্ন হয়ে পড়ায় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে ১০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনার পানি বৃদ্ধির ফলে মেলান্দহ উপজেলার মুহমুদপুরে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। হাজার হাজার হেক্টর ফসলী জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার মানুষসহ গৃহপালিত গবাদিপশু, গরু, ছাগল হাঁস, মুরগি পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যাকবলিত মানুষ উঁচু বাঁধে আশ্রয় নিতেছে।
গাইবান্ধা ও সাঘাটা ঃ উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং বর্ষণের কারণে গাইবান্ধায় বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলায় পানিবন্দি হয়েছে অন্তত অর্ধ লক্ষাধিক পরিবার। নদী তীরবর্তী এলাকায় উঠতি ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের মাত্রাও বৃদ্ধি পাওয়ায় অসহায় হয়ে পড়ছেন নদী তীরবর্তী মানুষ। গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি ৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে এখন বিপদসীমার ১২ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া জেলার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা, করতোয়া এবং ঘাঘট নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমা ছুঁইছুঁই করছে।
অন্যদিকে বন্যায় রাস্তাঘাট ডুবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে চরাঞ্চলে ডাকাত আতঙ্কে মানুষজন দলগতভাবে নির্ঘুম রাত পার করছে। তবে জনগণের সম্পদ রক্ষায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী চরাঞ্চলে প্রতিদিন অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
কুড়িগ্রামঃ কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। এতে চিলমারী, উলিপুর, রৌমারী, রাজিবপুর ও সদর উপজেলার নদ-নদী তীরবর্তী চর ও দ্বীপচরের দেড় শতাধিক গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। শনিবার ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এসব এলাকার চরাঞ্চলের ৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের চারিদিকে পানি ওঠায় চিকিত্সাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এতে ২০টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তিনদিন ধরে এসব এলাকার গ্রামীণ কাঁচা সড়ক তলিয়ে থাকায় ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানি সংকট। ধান, পাট ও সবজি ক্ষেতসহ চারণ ভূমি তলিয়ে যাওয়ায় গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছে প্লাবিত এলাকার মানুষজন। শুরু হয়নি সরকারি বা বেসরকারিভাবে ত্রাণ তত্পরতা। কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. এস এম আমিনুল ইসলাম জানান, চরাঞ্চলের ৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকে বিকল্প ব্যবস্থায় চিকিত্সা সেবা অব্যাহত রাখা হয়েছে। জেলায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে কাজ করছে স্বাস্থ্যবিভাগের ৮৫টি মেডিক্যাল টিম। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ১১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান ইত্তেফাককে জানান, জেলার নদ-নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলগুলোতে পানি প্রবেশ করলেও এখনও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের সব রকমের প্রস্তুতি নেওয়া আছে।
ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল)ঃ যমুনায় অব্যাহতভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে কয়েক গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ভাঙন শুরু হয়েছে বেশ কয়েকটি এলাকায়। সরেজমিন দেখা গেছে, ভূঞাপুরে যমুনার পানি বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে উপজেলার ফকিরপাড়া, চর বেতুয়া, চর বামন হাটা, চর কুতুবপুর গ্রামে যমুনার পানি প্রবেশ করেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শত শত মানুষ। অন্যদিকে পানি বাড়তে থাকায় উপজেলার গাবসারা, গোবিন্দাসী ও অর্জুনা ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। তবে ভাঙনরোধে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়নি টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ড। বৃষ্টি হওয়ায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।
শিবালয় (মানিকগঞ্জ)ঃ পদ্মা-যমুনায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় শিবালয় উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙন তীব্র হচ্ছে। এতে নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড যমুনা তীরবর্তী শিবালয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলার ২৭টি পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে। তবে, ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করার অভিযোগ রয়েছে। এদিকে পদ্মা-যমুনায় সৃষ্ট তীব্র স্রোত ও ঢেউয়ের কারণে স্পর্শকাতর পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও আরিচা-কাজিরহাট নৌপথে ফেরি-লঞ্চ, কার্গো-নৌকা চলাচল দারুণ ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত পানি বৃদ্ধির ফলে নদী তীরবর্তী স্থান ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। এতে কাঁচামরিচ, ভুট্রা, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। অনেক পুকুরে আবাদকৃত মাছ বেরিয়ে গেছে। গতকাল শনিবার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত যমুনার পানি আরিচা পয়েন্টে বৃদ্ধি পেয়ে ৮ দশমিক ৪৭ সেন্টিমিটার স্তরে প্রবাহিত হচ্ছিল।
সিলেট ঃ এদিকে সিলেটে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গতকাল সিলেট অঞ্চলে দিনের বেলা আকাশে রোদ থাকলেও বিকালে অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হয়। সেই বৃষ্টিতে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ আরো বেড়ে যায়। সিলেট বিভাগের প্রধান দুটি নদীর পানি অনেক স্থানেই বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায় কানাইঘাটে সুরমা বিপদসীমার ২ দশমিক ৩০ সে.মিটার, অমলসীদে কুশিয়ারা ১ দশমিক ৪৫ সে.মিটার. শেওলায় কুশিয়ারা ৬৬ সে.মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও নদ-নদীর অবস্থায় সিলেটের বানভাসি মানুষের যেন কষ্টের শেষ নেই। একই সঙ্গে অনেক গ্রামীণ ও আন্তঃজেলা সড়ক ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। কোথাও সড়ক ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ শুক্রবার সন্ধ্যায় সড়ক ও জনপথ এবং এলজিইডি প্রকৌশলীদের সাথে সিলেট সার্কিট হাউজে বৈঠক করেছেন। তিনি সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন।
মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা, জুড়ি, কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবজার সদর এবং সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক, জগন্নাতপুর ও দোয়রাবাজার উপজেলা বন্যা কবলিত হয়ে আছে। ৫ লক্ষাধিক লোক অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। তারা অপেক্ষায় কখন ঘরদোয়ার থেকে পানি নামবে।
বড়লেখা (মৌলভীবাজার) ঃ হাকালুকি হাওরের বন্যায় মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি। উপজেলার শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ আছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পানিবাহিত রোগ-ব্যাধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে বড়লেখা উপজেলায় হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে শতাধিক ডায়রিয়া রোগী চিকিত্সা নিয়েছেন। পানি কমায় বন্যার কিছুটা উন্নতি হলেও পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ কমেনি।
এদিকে উপজেলার ৯৮টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২৫৩টি পরিবার আশ্রয় গ্রহণ করেছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বড়লেখা উপজেলার তালিমপুর, বর্নি, সুজানগর, দাসেরবাজার, নিজবাহাদুরপুর, উত্তর শাহবাজপুর ও দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়ন বন্যাকবলিত। বন্যায় মৌলভীবাজার-কুলাউড়া-বড়লেখা সড়কের জুড়ি থেকে বড়লেখা পর্যন্ত সাতটি-আটটি স্থান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জেলা সদরের সাথে যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলার হাকলুকি হাওর পাড়ের অভ্যন্তরীণ প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক এখনো বন্যার পানিতে নিমজ্জিত।
চকরিয়া (কক্সবাজার) ঃ কক্সবাজারের চকরিয়ায় টানা ছয়দিন পর ঝলমলে রোদের দেখা মিলেছে। বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে উপজেলার পুর্বাঞ্চলের ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিস্তীর্ণ জনপদের প্রত্যন্ত এলাকার লোকালয় থেকে নামতে শুরু করেছে বন্যার পানি। কমে গেছে মাতামুহুরী নদীর পানির প্রবল প্রবাহ। তবে উপকূলের সাতটি ইউনিয়নের হাজার হাজার পরিবার গতকাল শুক্রবারও পানিবন্দি অবস্থায় দিন পার করেছে। উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের বিএমচর, কোনাখালী, পূর্ববড় ভেওলা, ঢেমুশিয়া, পশ্চিম বড়ভেওলা ও বদরখালী ইউনিয়নের দুর্গত শত শত পরিবার পানিতে তলিয়ে থাকা বাড়ি-ঘর ছেড়ে গত চারদিন ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে চকরিয়া-টৈইটং-বাঁশখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং চিরিঙ্গা বদরখালী সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে। সড়কের ওপর তারা পলিথিনের তাঁবু টাঙ্গিয়ে সেখানে গাদাগাদি করে কোনোমতে বসবাস করছে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে চরমভাবে। সরেজমিনে দেখা গেছে, চকরিয়া-টৈইটং-বাঁশখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের চকরিয়ার লালব্রীজ থেকে কোনাখালী বাংলা বাজার সেতু পর্যন্ত এলাকায় সড়কের দুই পাশে শত শত পরিবার পলিথিন দিয়ে ছোট ছোট ঘর তৈরি করে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে।
ইত্তেফাক/নূহু
