রামপালে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ইউনেস্কোর আপত্তি প্রত্যাহারে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে রামপাল বিরোধী আন্দোলনকারীরা। পূর্বে ইউনেস্কোর আপত্তিকে নিজেদের বক্তব্য ও লিফলেটে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করলেও এখন ইউনেস্কোর বক্তব্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে তারা।
বিরোধীদের অনেকেই বলছেন, ইউনেস্কো আগের নিরপেক্ষ অবস্থানে নেই। ইউনেস্কোর পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে শতভাগ আস্থা রাখলেও বর্তমান প্রতিবেদনকে সরকারি লবিংয়ের ফল হিসেবে প্রচার করছে তারা।
ইউনেস্কোর ৪১তম অধিবেশনে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির বৈঠকে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে ১২টি দেশ প্লান্ট তৈরির আগে এসইও করার শর্ত দিয়েছে। এ ছাড়া আর নতুন কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। আর এরপর থেকেই বিভ্রান্তমূলক বিবৃতি প্রদান করছে আন্দোলনকারীরা। সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে ইউনেস্কোর বদলে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানের নাম নিচ্ছে তারা।
পূর্বে যারা ইউনেস্কোর প্রশংসায় মত্ত ছিল, তারাই আজ জানাচ্ছে, 'ইউনেস্কোর বর্তমান দলটি দুর্বল। তাদের দক্ষতা কম।' আবার অনেকে বলছেন, লবিংয়ের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ইউনেস্কোর সামনে ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছে। অনেকে আবার ফেসবুকে প্রচার করছেন, ইউনেস্কো রামপালের ওপর থেকে কোন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি। এটা সরকারের বানানো প্রচার এবং অর্ধসত্য।
এদিকে বর্তমান ইউনেস্কোর অবস্থান পরিবর্তনের যৌক্তিক কারণগুলো নিয়ে কোন কথা বলেনি তারা। বরং ইউনেস্কোর এই প্রতিবেদন নিয়ে বর্তমান সরকারকেই দোষ দেয়া হচ্ছে। সেখানেও যৌক্তিক কোন ব্যাখ্যা না দিয়ে তারা ধারণা পোষণ করেছেন, সরকারের লবিং এর জন্য দায়ী। সরকারের কোন কোন বিভাগ এই লবিং এ জড়িত ছিল, তাও ব্যাখ্যা করা হয়নি।
অথচ ইউনেস্কোর এবারের প্রতিবেদনের বিরোধিতাকারীরা গত বছরের প্রতিবেদন নিয়ে প্রেস কনফারেন্স, সভা সমাবেশ ও মিছিল করেছিল। ইউনেস্কোর সেই প্রতিবেদনে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকর কোন কাজ না করার জন্য প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতি হতে পারে বলে ধারণা পোষণ করা হয়। কিন্তু বর্তমানে ইউনেস্কো তেমন কোন সমস্যা না থাকায় তাদের পূর্ববর্তী মনোভাব পরিবর্তন করলেও আন্দোলনকারীরা তাদের অবস্থানে অনড় আছেন। এটা কতটা সুন্দরবনের স্বার্থে এবং কতটা দেশের স্বার্থে তা যাচাই করে দেখার সময় এসেছে।
ইউনেসকোর পূর্ববর্তী ও বর্তমান রায় নিয়ে রামপাল বিরোধী আন্দোলনকারীদের ইউটার্নের চিত্র আরো স্পষ্ট হবে তাদের পূর্ববর্তী ও বর্তমান বক্তব্য থেকে। তাদের এই ইউটার্নের চিত্রপট কিছুটা স্পষ্ট করার জন্যই বক্তব্যগুলো তুলে ধরা হল।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের মহাপরিচালক আবদুল মতিন ২০১৬ সালে বলেন, 'রামপাল প্রকল্প সুন্দরবনের কোন ক্ষতি করবে না, সরকারের এমন দাবির পরেও ইউনেসকো এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং সরকারকে প্রকল্প বাতিল ও স্থানান্তর করতে নির্দেশ দিয়েছে। অন্যথায় এই বনটিকে ঝুঁকির সম্মুখীন বিশ্ব বৈচিত্র্যের তালিকাভুক্ত করা হবে বলে ১৮ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে ইউনেসকোর ওয়েবসাইটে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সুন্দরবনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ এর তালিকায় পুনর্ভুক্তি করা হবে কিনা তা সংস্থাটির বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হবে।'
তিনি লিখিত বক্তব্যে আরো বলেন, ইউনেস্কো যদি সুন্দরবনকে ঝুঁকির সম্মুখীন বিশ্ব বৈচিত্র্যের তালিকাভুক্ত করে, তা হবে বাংলাদেশের জন্য লজ্জার। ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের এই দ্বিতীয় শ্রেণীর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশকে সহযোগিতা না করার আহ্বান জানান তিনি।
কিন্তু ইউনেস্কো সুন্দরবনকে ঝুঁকির তালিকায় না রাখায় খুশি নন বাপার সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন। উল্টো তিনি অভিযোগ করেন, ইউনেস্কোর বর্তমান কমিটি খুব দুর্বল। সরকার লবিং করে ইউনেস্কোকে প্রভাবিত করছে।
এদিকে রামপাল নিয়ে ইউনেস্কোর পূর্ববর্তী মতকে সমর্থন করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, জাতিসংঘের মহাপরিচালক ইতোমধ্যেই ইউনেস্কোর রিপোর্টে স্বাক্ষর করেছেন যেটি বিজ্ঞানসম্মত এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যনির্ভর। তাই সরকারের উচিৎ সুন্দরবনের নিকটবর্তী এই প্রকল্প বাতিল করা।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইউনেস্কো সুন্দরবনে ঝুঁকির তালিকা থেকে বাদ দিলে ইউনেস্কোর বর্তমান রিপোর্টকে মেনে নেননি ইফতেখারুজ্জামান। উল্টো তিনি এটিকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লবিং হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করেছে। তিনি বলেন, পোল্যান্ডের ক্রাকো শহরে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির চলমান ৪১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সুন্দরবন ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তিকরণের সম্ভাবনা থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি পাওয়া আপাত স্বস্তিদায়ক। এই সাময়িক স্বস্তিমূলক অব্যাহতি পাওয়ার জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের কূটনৈতিক তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে ইউনেস্কোর সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য সূত্রে আছে বলে জানান তিনি। কিন্তু এ সংক্রান্ত স্পষ্ট কোন তথ্য সূত্র তিনি প্রদান করেননি।
তিনি আরো মন্তব্য করেন, এই 'সাময়িক স্বস্তি' রামপাল তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী ভারত সরকারের ওপর সুন্দরবনের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য সুরক্ষা নিশ্চিতের চ্যালেঞ্জ ও দায় বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে।
২০১৬ সালে ইউনেস্কোর প্রতিবেদন প্রকাশের পর তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ বলেছিলেন, ‘আমরা এত দিন ধরে রামপাল নিয়ে যে বক্তব্য দিয়ে আসছি, তা যে বিজ্ঞান ও যুক্তিসম্মত তা ইউনেস্কো প্রতিবেদনে প্রমাণিত হলো। সরকার কীভাবে ইউনেস্কো প্রতিবেদনের জবাব দেবে, তার উপায় না খুঁজে বরং কীভাবে এবং কত দ্রুত প্রকল্পটি বাতিল করা যাবে, সেই উপায় বের করে দ্রুত তা সম্পাদন করা উচিত।’ইউনেস্কো আর আমাদের বক্তব্য একই। সত্য ও বিজ্ঞাননির্ভর বিশ্লেষণ যেভাবেই যে দেশেই করা হোক না কেন, তা এক হবেই। পৃথিবীতে স্বাধীন কোনো বিশেষজ্ঞ নেই, যারা আমাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবেন। ইউনেস্কো বলছে, বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণ বলছে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হোক। তাই একগুঁয়েমি না করে, সময় নষ্ট না করে এই প্রকল্প বাতিল করা হোক। সরকার যত দেরি করবে, তত ক্ষতি হবে বাংলাদেশের, ক্ষতি হবে সুন্দরবনের, ক্ষতি হবে সরকারেরও।’’
কিন্তু ইউনেস্কোর নতুন প্রতিবেদন কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি তিনি। এই প্রতিবেদন বিস্ময় প্রকাশ করে এক যুক্ত বিবৃতিতে আনু মুহাম্মদ বলেন, এটা খুবই বিস্ময়কর যে, সরকারের পক্ষ থেকে দেশের মানুষের টাকা খরচ করে, ইউনেস্কোতে বহু লবিংও হয়েছে। আজ যদি ইউনেস্কো তার এই অবস্থান থেকে সরে আসে তাহলে তার অর্থ হবে একটাই- ইউনেস্কো কোনো না কোনো প্রভাবে তার নিজেরই বৈজ্ঞানিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে গোষ্ঠী স্বার্থের লবিং-এর কাছে আত্মসমর্পণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ডাহা মিথ্যা বলেছে। তিনি আরো দাবি করেন, এখন চতুর্থবার এসে, বিভিন্ন লবিং করে ইউনেস্কোকে তাদের অবস্থান থেকে কিছুটা সরানো গেছে। এখন ইউনেস্কো হয়তো মনে করছে যে ঠিক আছে এটা তো তাদের দেশ তারা উন্নয়ন এভাবে করতে চায় তাহলে ঠিক আছে কিছুটা ছাড় দিই। যার কারণে তারা দুটি বিষয়কে ছাড় দিয়েছে।
তবে ইউনেস্কোর বদলে বর্তমানে গ্রিনপিসের প্রতিবেদনের উপরেই বেশি ভরসা করছেন তিনি। ঢাবির এই অধ্যাপক বলেন, গ্রিনপিসের মতো প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষাকেও তারা (সরকার) গুরুত্ব দিচ্ছে না। গ্রিনপিস সুন্দরবন এবং রামপাল নিয়ে খুবই নেগেটিভ রিপোর্ট দিয়েছে এবং প্রকল্পটিকে সরকারের একটি নিম্নমানের প্রকল্প হিসেবে বর্ণনা করেছে। তিনি আরো দাবি করেন, জোর করে ইউনেস্কোকে এ পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে।
রামপাল বিরোধী আন্দোলনের প্রতিনিধিত্বকারী এমন কিছু মানুষ ইউনেস্কোর প্রতি গত বছর পর্যন্ত পূর্ণ আস্থা রাখলেও খুব দ্রুত তাদের এই অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে চলতি বছরের জুলাই মাসে। ইউনেস্কোর নতুন প্রতিবেদন তাদের আন্দোলনের পক্ষে না হওয়ায় অনেকেই এই প্রতিষ্ঠানটির দুর্বলতা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
২০১৬ সালে ইউনেস্কোর দেয়া প্রতিবেদন পাওয়ার পর বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে যারা পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে কাজ করেন, এমন কোন সংগঠন রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পে আপত্তি জানালে বা উদ্বেগ প্রকাশ করলে সরকার চুপ করে থেকেছে না হয় অবৈজ্ঞানিক উপায়ে অথবা অযৌক্তিকভাবে পালটা বিবৃতি দিয়েছে। ইউনেস্কো’র রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পে উদ্বেগ কোন নতুন বিষয় নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন জাতিসংঘের সংস্থাটির মতো আমরাও চাই প্রকল্পটি স্থানান্তর করা হোক।
সাংবাদিক সম্মেলনে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি দাবি করে, যারা রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে কথা বলছেন তারা ব্যক্তিস্বার্থ দ্বারা চালিত। এই কমিটর আহ্বায়ক সুলতানা কামাল বলেন, সরকার দাবি করছে আমরা বিজ্ঞানসম্মতভাবে কথা বলছি না। কিন্তু আমরা পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলেই আমাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। তিনি আরো বলেন, যেসকল বিদেশিরা এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পক্ষে কথা বলছেন তারাও ব্যক্তি স্বার্থে এমন কথা বলছেন। তাদের স্বার্থ কি সেটা জানতে পারলে তা প্রকাশ করা হবে।
এদিকে কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মাকসুদ বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে সুন্দরবনের অন্তর্ভুক্তি হবে বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক। 'এটি বর্তমান সরকারের খামখেয়ালী আচরণের সবচাইতে বড় উদাহরণ' হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং বাপার সহ-সভাপতি রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সরকার রামপাল আন্দোলনের বিপক্ষে কোন বৈজ্ঞানিক তথ্য উপস্থাপন করতে পারেনি। যা প্রমাণ করে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দূষণ দূর করার বিষয়টি অনেক দূরের বিষয়। তিনি আরো বলেন, 'রাজনৈতিক দিক বিবেচনায় সরকার এ সকল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।'
