রাজস্ব আয়ে পরোক্ষ করেই এখনো অধিক নির্ভরতা

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৭, ০৯:৪৯

সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উন্নত দেশগুলো যেখানে প্রত্যক্ষ কর বা আয়করের উপর বেশি নির্ভর করে, সেখানে আমাদের দেশে সরকার এখনও পরোক্ষ করের (আয়কর ছাড়া অন্যান্য কর) উপরই অধিক নির্ভরশীল। পরোক্ষ কর বহন করতে হয় ধনী দরিদ্র সবাইকেই। এ করের ভার সবচেয়ে বেশি পড়ে মধ্যবিত্তের উপর। তাই অর্থনীতিবিদরা সব সময় পরোক্ষ কর না বাড়িয়ে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর পরামর্শ দেন। কারণ প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়লে যোগ্য ব্যক্তিরা করের আওতায় আসবেন। ফলে অর্থনীতিতে সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে। যদিও দেশে পরোক্ষ করের উপর নির্ভরশীলতা পর্যায়ক্রমে কমে আসছে, তবু তা প্রত্যাশিত মাত্রার চেয়ে অনেক কম।

চলতি অর্থবছরের জন্য সরকার প্রত্যক্ষ করের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৮৫ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা, যা রাজস্ব আয়ের ৩৪ শতাংশ। আর পরোক্ষ করের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ১৪ কোটি টাকা, যা রাজস্ব আয়ের ৬৬ শতাংশ।

উপাত্ত ঘেঁটে দেখা গেছে, ১৯৭৩ থেকে ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ে পরোক্ষ করের অবদান ছিল গড়ে প্রায় ৮৭ শতাংশ। ১৯৮১ থেকে ১৯৯০ সালে পরোক্ষ করের অবদান ছিল গড়ে ৮৬ শতাংশ। ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পরোক্ষ করের অবদান ছিল ৮৫ শতাংশ। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তা ছিল সাড়ে ৮২ শতাংশের বেশি। আর ২০০৬ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পরোক্ষ করের অবদান দাঁড়ায় ৮০ শতাংশে। বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে প্রত্যক্ষ কর বাড়ায় পরোক্ষ করের অবদান কিছুটা কমেছে। বর্তমানে তা ৬৫ শতাংশের মতো।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. জায়েদ বখত ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশে              ই-টিআইএন (অনলাইন কর সনাক্তকরণ নাম্বার) নেওয়া মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুবই কম। তারমধ্যেও রিটার্ন জমা দেন আরও কম মানুষ। এখানে অনেককে করের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের নজরদারি বাড়ানো দরকার। কিন্তু পরোক্ষ কর আদায় কর সহজ হওয়ায় সরকার পরোক্ষ করের দিকেই ঝুঁকছে। এটা অর্থনীতির সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দুরদর্শীতার পরিচয় নয়। ড. জায়েদ বখত আরও বলেন, আমাদের দেশে কর্পোরেট কর হার অনেক বেশি। এবারের বাজেটে তা কমানোর প্রত্যাশা করা হলেও সরকার কমায়নি। এ ধরনের কর বিনিয়োগকে নিরুত্সাহিত করে। তাই সরকারের উচিত প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উন্নত দেশ হতে হলে দেশের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে উন্নত করতে হবে। আর এজন্য সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। রাজস্ব আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য। অন্যথায় সমাজে বৈষম্য বাড়তে পারে।

এদিকে প্রত্যক্ষ কর দেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষেরও অনাগ্রহ রয়েছে। এর কারণ হলো—করদাতাদের সঙ্গে যৌক্তিক আচরণ করা হয় না। একবার রিটার্ন দাখিল করলে প্রতিবছর তা করাই স্বাভাবিক, কিন্তু কর কর্মকর্তাদের কাছে হয়রানির শিকার হতে হয়। করদাতার আয় আগের বছরের তুলনায় কমে যেতে পারে, এমনটি কর কর্মকর্তারা বিশ্বাস করতে চান না। ফলে, প্রভাবশালী ব্যতীত সাধারণ করদাতাদের অনেক সময় বাধ্য হয়ে বেশি ‘খরচ’ করতে হয়। অন্যদিকে, সর্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতির কথা বলা হলেও অডিটের সুযোগ নেয় কর্মকর্তারা। ফলে বিদ্যমান করদাতাদের অভিজ্ঞতা শুনেও মানুষের মাঝে করভীতি বেড়ে যায়।

প্রত্যক্ষ কর প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়াতে না পেরে সব সময়ই সরকার পরোক্ষ করের উপর জোর দিচ্ছে। এতে দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপর চাপ পড়েছে বেশি। অথচ প্রত্যক্ষ কর অনেক বাড়ানো সম্ভব। অনেক করযোগ্য ব্যক্তি এখনও কর দিচ্ছেন না। বর্তমানে ১ কোটি টাকা বা তার বেশি আয়কর দেন ৫০ জনেরও কম ব্যাক্তি। অথচ অর্থনীতি সমিতির হিসাব মতে এ সংখ্যা হওয়া উচিত অন্তত ৫০ হাজার। সরকার এসব ধনীদের ধরতে পারছে না। ফলে তারা কর ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে।

প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর উপর জোর দিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বাংলাদেশে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ করযোগ্য আয়ের মধ্যে থাকলেও কর দেয় না। এজন্য এলাকা ও পেশাভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ উচিত। এটি করা না গেলে যারা নিয়মিত কর দেন তাদের ওপর চাপ বেড়ে যাবে।

ইত্তেফাক/নূহু