৯৮ সালের অভিজ্ঞতার আলোকে সরকারের পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগে বন্যা মোকাবেলা করতে হবে : ড. আতিউর রহমান

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৭, ২২:১৪

মনে হচ্ছে সারা দেশের বন্যা পরিস্থিতি আরো দীর্ঘ হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই যে এমনটি ঘটেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কোনো কোনো এলাকায় পানি কমলেও অনেক এলাকায় বাড়ছে। পাশাপাশি নদীভাঙন তীব্র হচ্ছে। অনেক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ছেন। বন্যা কবলিত এলাকায় ফসলের ক্ষতি, কাজের অভাব, রোগ বালাই তীব্র হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু সরকার নয়, নানা সামাজিক ও ব্যক্তি উদ্যোগ বন্যার্তদের পাশে না দাঁড়ালে বন্যার ভয়াবহতা আরো বাড়বে। 

 

সম্প্রতি ইত্তেফাক অনলাইনের সঙ্গে আলাপকালে উন্নয়ন অর্থনীতিবীদ, গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান এ সব কথা বলেন।

 

দুর্যোগ দুর্বিপাক বিষয়ে বিস্তর গবেষণা ও নীতি নির্ধারণী কর্মকাণ্ডে অভিজ্ঞ ড. রহমান বলেন, দেশের এরকম দুঃসময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সরকারের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার কাজে এগিয়ে আসবে এটিই খুব স্বাভাবিক। একই সঙ্গে আশা করা যায়, সরকারও তার  দেয়া সমস্ত ত্রাণ নিয়ে বা অন্যান্য যে সমস্ত উপকরণ প্রয়োজন তা নিয়ে দৃশ্যমান থাকবে। মানুষের পাশে থেকে তাদের বাঁচার লড়াইকে সমর্থন দেবেন। ভরসার পরিবেশ তৈরি করবেন।

 

এর আগে এ রকম সঙ্কটকালে দেশের ব্যাংকিংখাত তার সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে এসেছে। এ সবের পেছনের রুপকার বা কারিগর ছিলেন ড. আতিউর রহমান। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব নেয়ার পর সামাজিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে তিনি করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কার্যক্রম নীতির ব্যাপক সংস্কার করেছিলেন। এর আগে নাম মাত্র অর্থে সিএসআর বাবদ ব্যয় করতো ব্যাংকগুলো। আর তিনি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব শেষ করেছেন তখন বছরে ৫ থেকে ৬শ কোটি টাকা সিএসআর ফান্ডে ব্যবহার করা হতো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল তৈরি করেছে এবং দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

 

দেশে এরকম একটি বন্যা চলছে, খুব স্বাভাবিকভাবে আশা করা যায় যে ব্যাংকসহ অন্যন্য আর্থিকখাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসবে। সস্প্রতি একটি গণমাধ্যমে ড. আতিউর রহমান এই আহ্বান রেখেছিলেন। তার এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সস্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমের আওতায় উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশে বন্যাদুর্গত এলাকায় প্রয়োজনীয় আর্থিক ও ত্রাণ সহায়তা প্রদানের জন্য বলা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে সার্বিক টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সিএসআর কার্যক্রমের আওতায় উত্তরাঞ্চলসহ সারাদেশে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার অসহায় জনগোষ্ঠীর মাঝে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও ত্রাণসামগ্রী (খাদ্য, বস্ত্র, বিশুদ্ধ পানি, জরুরি ওষুধ, পোর্টেবল ইমপ্রুভড কুক স্টোভ, পোর্টেবল সোলার ল্যান্টার্ন, পোর্টেবল পিকো হোম সিস্টেমস) সহায়তা প্রদানের জন্য পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আশা করা যায় প্রজ্ঞাপন দিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংক বসে থাকবে না। ব্যাংকগুলোকে বাস্তব কার্যক্রম গ্রহণ করতেও উৎসাহিত করবে। মাঠে কি পরিমাণ সাহায্য সহযোগিতা সত্যি সত্যি যাচ্ছে তারও দেখভাল করবে।

 

ড. আতিউর রহমান আরো বলেন, হাওর দুর্যোগের পর মনে হয় এবারের বন্যা আমাদের বেশ ভোগাবে। গণমাধ্যমে বানভাসি মানুষের দুঃখ ও বেদনার কথা ভালোভাবেই প্রকাশিত হচ্ছে। বন্যার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির অভাবে অসুখ বিসুখ বাড়ছে। বন্যার পানি সরে যাবার সঙ্গে সঙ্গে নদী ভাঙনের তীব্রতাও বাড়ছে। হঠাৎ নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।

IMG0

চলমান এই দুর্যোগ-দুর্বিপাক থেকে অসহায় মানুষকে রক্ষা করার মতো প্রয়োজনীয় অর্থ ও ত্রাণ সরকারের নিশ্চয় রয়েছে। এখন প্রয়োজন সঠিক উদ্যোগ ও সমন্বয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, স্থানীয় নেতৃত্বের কোন্দল, স্বজনপ্রীতি কিংবা সমন্বয়হীনতার কারণে পরিস্থিতির আর অবনতি হতে দেয়া যাবে না।  

 

একই সঙ্গে শুধু প্রশাসনের ওপর ভরসা না করে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরো দৃশ্যমান হতে হবে। মানুষের দুর্যোগে তারা যে সমানভাবে আক্রান্ত ও তাদের পাশে থেকেই মোকাবিলা করছেন-এ বার্তাটি আরো স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে। সরকারের পাশাপাশি সমাজকেও সক্রিয় করার দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের। বর্তমানে মানুষের আয় বেড়েছে। বিত্তবানের সংখ্যা বেড়েছে। সরকারের আকার ও সক্ষমতা বেড়েছে। ফলে কোথাও বন্যাকবলিত মানুষ না খেয়ে থাকবেন তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই সমাজকে আরো সক্রিয় হতে হবে।

 

এই প্রসঙ্গে ড. রহমান ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ১৯৯৮ সালের বন্যা ছিল প্রায় দেশব্যাপী। সে বন্যা ছিল দীর্ঘমেয়াদি। খোদ ঢাকা শহরেও ঢুকে পড়েছিল বন্যার পানি। সেই বন্যা প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি পুরো সমাজ যেভাবে এগিয়ে এসেছিল, তা ছিল সত্যি দেখার মতো। এমন কোনো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল না যাদের কর্মীরা এই দুর্যোগ মোকাবিলায় পিছিয়ে ছিল। সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ সেই সময় তাদের সাধ্যমতো সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বিত্তবানরাও হাত খুলে সাহায্য করেছেন। বিশেষ করে তরুণ সমাজের অবদান ভোলার নয়। শত শত স্বেচ্ছাসেবক সেই সময় বন্যাকবলিত মানুষকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। স্বেচ্ছাসেবকদের কেউ কেউ প্রাণও দিয়েছেন। ঢাকার অদূরে আশ্রয় শিবিরে খাবার পরিবেশনার পাশাপাশি স্কুলের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষাদানের কাজেও স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যস্ত থাকতে দেখেছি। সারা দেশের নানা সংগঠন (ক্লাব, নাট্যদল, প্রাক্তন ছাত্র/ছাত্রী সমিতি ইত্যাদি) সমাজের নানা উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বন্যার্ত মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার মানবিক সংগ্রামে লিপ্ত ছিল।

 

১৯৯৮ সালে এই মানবপ্রীতির এক অসাধারণ সমাবেশ আমরা দেখেছি। দেখেছি সামাজিক পুঁজির অভাবনীয় উন্মেষ। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’পড়ে আমরা পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময় দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য, ১৯৪৬ সালে কলকাতায় দাঙ্গার সময় বঙ্গবন্ধুর ত্রাণ তৎপরতার কথা জানতে পারি। মানুষ যে মানুষের জন্য সে বিষয়টি বুঝতে পারি। ১৯৭১ সালে আমরা এমন গভীর এক দুঃখের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলাম। সে সময়টায় আমরা একে অপরের প্রতি তীব্র সহানুভূতি ও সহযোগিতার ভাব পোষণ করতাম। সেই সময় আমরা ‘সকলকে লইয়া’বাঙালি জাতির মুক্তির আন্দোলনে একত্রে দুঃখের ও আনন্দের দিনগুলো পারি দিয়েছি।

 

সেই বাঙালি জাতি একইভাবে ১৯৯৮ সালের বন্যার সময় দুঃখ ভাগাভাগি করে নিতে পেরেছিল। ওই সময়টায় আজকের প্রধানমন্ত্রীই সরকারের কর্ণধার ছিলেন। দুর্যোগের ওই দিনগুলোতে তার আন্তরিক, মানবিক ও দূরদর্শী নেতৃত্ব ছিল সদা দৃশ্যমান। সে সময় আমাদের অর্থনীতি এতো বড় ছিল না। তবু কয়েকটি মাস ধরে সরকার ও সমাজ হাত ধরাধরি করে কোটি কোটি বন্যার্ত মানুষকে শুধু বাঁচিয়ে রেখেছিল তাই নয়, দ্রুত তাদের পুনর্বাসনও করেছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে, বিবিসি আমাদের দেশেরই একজন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞজনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিল, দেশে বিরাট দুর্ভিক্ষ হবে। কোটি মানুষ মারা যাবে। বাস্তবে একজন মানুষও সে সময় প্রাণ দেয়নি। তাদের সবাইকে বাঁচিয়ে রাখার এক প্রাণপণ সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেদিনের ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেদিনের অর্থমন্ত্রী মরহুম শাহ কিবরিয়া তাকে দারুণ সহযোগিতা করেছিলেন। আজকের কৃষিমন্ত্রী তখনো কৃষিমন্ত্রী। আসাদুজ্জামান প্রধানমন্ত্রীর কৃষি ও খাদ্য উপদেষ্টা। তারা সবাই এমন আন্তরিকভাবে সেই সময় নীতি সমন্বয় ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন যে দেশে কোনো খাদ্য সংকট সৃষ্টি হতে পারেনি। কোনো মানুষ না খেয়ে মরেনি। বন্যাকবলিত এলাকার কৃষকদের জন্য সুলভে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করেছিল তদানীন্তন সরকার। হাটে ও বাজারে গিয়ে ক্যাম্প করে কৃষিঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বর্গাচাষিদের বিশেষ কৃষিঋণের ব্যবস্থা করেছিল তারা। কারা ঋণ পেল সেই তালিকা প্রকাশ্য স্থানে ঝুলিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন সে সময়ের অর্থমন্ত্রী। ফলে কৃষি পুনর্বাসন খুবই সফল হয়েছিল।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকও সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে সক্রিয় করেছিল কৃষিঋণ দেয়ার জন্য। কৃষকদের বীজতলা ডুবে গিয়েছিল।  কৃষিমন্ত্রী পাশের উপজেলায় বাড়তি বীজতলা তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি হেলিকপ্টারেও ধানের চারা ফেরি করে বন্যার্ত কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস ধরে বন্যার্তদের বিনা মূল্যে চাল প্রদান করে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। সে ছিল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। মানবিক সহমর্মিতার এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।

IMG1

আগেই বলেছি, সরকারের পাশাপাশি এ দেশের এনজিও, সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাদের সামাজিক পুঁজি নিয়ে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিজেদের বেতন থেকে অর্থ দিয়ে ত্রাণকাজে সহায়তা দিয়েছেন। আমি তখন একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলাম। আমরা তাদের দেয়া অর্থ সাহায্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে তুলে দিয়েই চুপ করে বসে ছিলাম না। আমাদের ব্যাংকারদের স্বস্ব কর্মস্থানেও বন্যার্তদের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে বলেছিলাম। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা অত্যন্ত সফলভাবে ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছিলাম। 

 

সেই মূল্যবান অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন এই আঞ্চলিক বন্যার প্রতিরোধ কেন আমরা করতে পারব না? প্রশ্ন রাখেন ড. রহমান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি এও বলেন, ‘নিশ্চয় পারব’। সরকার ত্রাণ সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছে। এ বছর বন্যার কারণে কৃষক বোরো ধান ঠিকমতো কাটতে পারেনি। ‘ব্লাস্ট’ আক্রান্ত বোরোর উৎপাদনও কম হয়েছে। আমন ধানের রোপণও ব্যাহত হয়েছে ও হচ্ছে। তাই চালের দাম বাড়ন্ত। তবে সরকার এ বিষয়ে অবহিত রয়েছে। ব্যবস্থাও নিচ্ছে। চালের দাম কমানোর জন্য শুল্ক হার কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি মার্জিন শূন্য করার নির্দেশ দিয়েছে। এ সবের ফলে চালের দাম ধীরে ধীরে কমছে।

 

সংসদে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, বন্যার্ত কৃষকদের বিনা মূল্যে বীজ সরবরাহ করা হবে। ড. রহমানের ধারণা, সরকারের পক্ষ থেকে ১৯৯৮ সালের মতো বন্যার্ত দুস্থ মানুষগুলোকে পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রীও দেয়া হবে। তবে এই ত্রাণ বিতরণে যেন কোনো অস্বচ্ছতা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি না ঘটে সেদিকে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলকে কড়া নজর রাখতে হবে বলে তিনি সাবধানবাণী উচ্চারণ করেন।

 

তিনি আরো বলেন, মানুষের বাঁচা ও মরা নির্ভর করে যে খাদ্য সাহায্যের ওপর তা নিয়ে যেন কোনো প্রশ্ন কেউ না করতে পারে সেদিকে নিশ্চয় ১৯৯৮ সালের মতো প্রধানমন্ত্রী খেয়াল রাখবেন। এরই মধ্যে এ বিষয়ে ত্রাণমন্ত্রী মুখ খুলেছেন। তা ছাড়া ওই সময় কৃষির পুনর্বাসনে তার সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছিল, নিশ্চয় এবারে সেসবই নেয়া হবে। বরং এখন সরকারের হাতে বাড়তি অভিজ্ঞতা ও সম্পদ দুই রয়েছে। তাই এবারে আরো ভালোভাবে তা করা সম্ভব। সরকারের পাশাপাশি সমাজকে আরো সক্রিয় হতে হবে। এখন পর্যন্ত সমাজের সক্রিয়তা কিন্তু সেভাবে চোখে পড়ছে না।

 

উল্লেখ্য ১৯৯৮ সালে ব্যাংকগুলোর সিএসআর কার্যক্রম সেভাবে চালু ছিল না। এখন তা পুরোদমে চালু রয়েছে। তাই তিনি আশা করেন- বাংলাদেশ ব্যাংক তার টেকসই অর্থায়ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় সব কটি ব্যাংককে সংগঠিত করতে পারে বন্যাকবলিত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়ার লক্ষ্যে। বিএবি ও এবিবিকে ডেকে বন্যা দুর্গত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে ব্যাংকগুলোকে তাদের সিএসআর তহবিলের মাধ্যমে পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা দেয়ার জন্য তাদের উৎসাহিত করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এই তহবিল থেকে সহযোগিতা নিয়ে উৎসাহী তরুণদের যুক্ত করতে পারে বানভাসি মানুষদের বাঁচানোর সংগ্রামে।

IMG2

একইভাবে তিনি মনে করেন, এমআরএ তাদের অধীনস্থ এমএফআইগুলোকে এ কাজে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে বলতে পারে। তাদের রেগুলেটেড ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো আপাতত: বন্যাকবলিত এলাকায় ঋণের কিস্তি আদায় কয়েক মাসের জন্য যেন বন্ধ রাখে এ নির্দেশ নিশ্চয় দেয়া যেতে পারে। অনেক দুর্যোগের সময় এমনটি করার উদাহাণ এমআরএর এর নথিতে নিশ্চয় রয়েছে। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, এফবিসিসিআই ও অন্যান্য দেশি ও বিদেশি চেম্বার তাদের সদস্যদের সামাজিক দায়বদ্ধ কাজের অংশ হিসেবে বন্যা মোকাবেলায় পরিকল্পিত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে বলতে পারে।

 

এদিকে গত বৃস্পতিবার (১৩ জুলাই) জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এ বিষয়টি সামনে এনেছেন এবং ৯৮ এর বন্যার অভিজ্ঞতার আলোকে কিভাবে সেদিনের সরকার বন্যা মোকাবেলা করেছিলো সে বিষয়টি নিয়ে তিনি আলাপ করেছেন। ওইদিন সংসদে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বন্যার্ত মানুষের কৃষি ঋণ দেয়ার জন্য আহ্বান করেছেন। সেখানে তিনি ড. আতিউর রহমানের নাম উল্লেখ করে বলেছেন কি করে তারা কৃষি কার্ডের মাধ্যমে ১০ টাকার অ্যাকাউন্ট খুলে ব্যাংকের কৃষি ঋণ দেয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলেছেন সে বিষয়টি বলেছেন। তাই এখন বন্যার্ত কৃষকদের কৃষিঋণ দেয়া কঠিন হবার কথা নয়।

 

ড. আতিউর রহমান তার সময়কালে দেশের গরীব দুঃখী মানুষের জন্য বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিক শ্রেণির মানুষের জন্য তাদের ঋণ সুবিধা শুধু নয় সন্তানদের লেখাপড়ার সুবিধার জন্য সিএসআর সাপোর্ট, এমনকি বাড়িতে যারা কাজ করেন, রিকশাওয়ালাসহ দিনমজুর শ্রেণির মানুষ সহজেই যাতে লেনদেন করতে পারেন তার জন্য মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করে একটা ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স ব্যবস্থা তৈরি করে যান। দেশের গরিব দুঃখী মানুষ এই ধারার অর্থায়ন ব্যবস্থার সুবিধে পেয়ে খুবই সন্তুষ্ট। একজন রিকশাওয়ালা, গার্মেন্টস শ্রমিক, ক্ষুদে ব্যবসায়ী বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং সুবিধে পাচ্ছেন। প্রতিদিন তারা শত শত কোটি টাকা লেনদেন করছেন। ফলে গ্রামীণ মানুষের ভোগ বেড়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা রয়েছে। অতি দারিদ্রের মাত্রা কমেছে।

 

২০০৯ থেকে ২০১৬ এর মধ্যে সাত বছরের দায়িত্ব পালন কালে দেশের অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধনে সম্পূরক ভূমিকা রেখেছেন ড. আতিউর রহমান। ২০০৯ সালে বিশ্বমন্দা যখন বাঘা বাঘা অর্থনীতির দেশগুলোকে শক্তভাবে জেঁকে ধরে, সেরকম একটি নাজুক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব পান তিনি। বিশ্বমন্দার চোখ রাঙানির মাঝেও সময়োচিত এবং উৎপাদনশীল মুদ্রানীতি ও ঋণনীতির মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়েছেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে। মূল্যস্ফীতিকে নামিয়েছেন এক অঙ্কের ঘরে। একইসঙ্গে ব্যাংকিং সেবা মানুষের দৌরগোড়ায় নিতে সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। বর্গাচাষী ও  কৃষক থেকে শুরু করে সবাই আজ ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের এক বিরল উদাহরণ তৈরি করেছেন তিনি।

 

২০০৮-০৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৫.০৫ শতাংশ। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি মন্দার পরিবেশেও অর্থবছর ২০১৪-১৫ এর ৬.৫৫ শতাংশসহ গত সাত বছরে এই হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। সরকারের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের উৎপাদনমুখী ভূমিকার কারণে ম্যাক্রো অর্থনীতির এই স্থিতিশীলতা ও পারদর্শিতা দেশে বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে এবং হচ্ছে।

 

২০১১ এর পর থেকে মূল্যস্ফীতির হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বিচক্ষণ মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতির হারকে নিয়ন্ত্রণ করে। বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি জুন ২০১৪ ও জুন ২০১৫ এ যথাক্রমে ৭.৩৫ ও ৬.৪ শতাংশ থেকে আরো কমে জুন ২০১৬ শেষে ৫.৯২ শতাংশে নেমে আসে। এই ধারা এখনো ক্রম হ্রাসমান।

IMG3

এই সময়কালে দেশে আমদানি বাড়ে ৮১ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় হয় ৪২.৯২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বাড়ে ৫.৪৫ শতাংশ। একইসঙ্গে গত সাত বছরের ব্যবধানে দেশের রপ্তানি বেড়েছে ১০০ শতাংশ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে  মোট রফতানি আয় হয় ১৫.৬ বিলিয়ন ডলার। সেখানে গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোট রফতানি আয় হয় ৩১.২ বিলিয়ন ডলার। এ বছর রফতানি বৃদ্ধির হার কমে গেলেও সার্বিকভাবে এই খাতের সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরিতে তিনি যথেষ্ট অবদান রেখে গেছেন।

 

২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৯.৭ বিলিয়ন ডলার সেখানে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৫.৩ বিলিয়ন ডলার  রেমিট্যান্স আসে। তবে হালে এই খাতের পারফরমেন্স নেতিবাচক। বাংলাদেশ ব্যাংক এর কারণ খুঁজছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছর শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৭.৫ বিলিয়ন ডলার। ৩০ মার্চ ২০১৬ তা প্রায় চারগুণ বেড়ে ২৮.২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয় এবং জুন ২০১৬ তে ৩০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। এখন তা আরো বেশি (৩২.১ বিলিয়ন ডলার)। এর ফলে বাংলাদেশের ঋণমান উন্নত হয়েছে। তাই বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে।

 

২০১৪-১৫ অর্থবছর শেষে দেশের মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৬ ডলারে। বর্তমানে তা প্রায় দেড় হাজার ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছর শেষে এর পরিমাণ ছিল ১০৪৪ ডলার। একই সঙ্গে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য তেমন বাড়েনি। সামাজিক সংরক্ষণ বরং বেড়েছে।

 

দেশের কৃষকদের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন ড. আতিউর রহমান। ২০১০ সালে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কৃষকদের ১০ টাকার অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করেন তিনি। কৃষি খাতে অভিযোগ ছিল সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন ভর্তুকি কৃষকের হাতে সঠিকভাবে পৌঁছায় না। এই ‘১০ টাকার অ্যাকাউন্ট’সে সমস্যা দূর করেছিলেন। একইসঙ্গে ব্যাংক থেবে বর্গা চাষিদের  জন্য তিনি ঋণ ব্যবস্থা চালু করেন। এ ঘূর্ণায়মান ঋণ প্রকল্পের আওতায় গত ৭ বছরে ১১ লাখ ৮১ হাজার বর্গা চাষিকে ২২৩৯ কোটি টাকার বেশি অর্থায়ন করা হয়। তা ছাড়া, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষি উদ্যোক্তাদের ঋণের ব্যবস্থা করেছেন। ফলে পেয়ারা, আম, লিচু উৎপাদন বেড়েছে। মাত্র চার শতাংশ হারে হলুদ, মরিচ, আদা, পেয়াজ, রসুনের চাষের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করেছেন। ফলে এসব মসলাজাতীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে।

 

গত সাত বছরে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতে অর্থয়নের উপর বিশেষ জোর দেয়। এসএমই ঋণের জন্যে সাধারণ স্থিতি .২৫ শতাংশ নির্ধারণ করে এবং পূনঃঅর্থায়নের ব্যবস্থা করে তিনি এই খাতের ব্যাপক বিস্তার ঘটাতে সাহায্য করেছেন। ২০১০-১৫ থেকে এই ছয় বছরে ব্যাংকগুলো ৩০ লাখের বেশি নারী উদ্যোক্তাকে ৪ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা এসএমই ঋণ দেয়। ই-কমার্সের আওতায় হাজার হাজার উদ্যোক্তা, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা, এখন আয়-রোজগারে ব্যস্ত রয়েছেন।

 

ব্যাংকিং সেবাকে সাধারণের কাছে নিয়ে যেতে ড. আতিউর রহমান মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করেন। এখন প্রায় চার কোটি গ্রাহক মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় দৈনিক গড়ে ৮৫০ কোটি টাকা লেনদেন করছে। একইসঙ্গে তিনি এজেন্ট ব্যাংকিংয়েরও অনুমোদন দেন। এর ফলে দেশে আনাচে কানাচে এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে প্রযুক্তি নির্ভর ব্যাংকিং সেবার প্রসার ঘটানো হচ্ছে। সারা দেশে ব্যাংকের শাখা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গ্রামেই বেশি শাখা চালু হয়েছে। এভাবেই দেশে ‘ব্যাংকিং পেনিট্রেশন’বেড়েছে।

IMG4

সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’গড়ার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে গত সাত বছরে ব্যাংলাদেশ ব্যাংক ও দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ডিজিটাইজড করা হয়েছে। দেশের নব্বই ভাগ ব্যাংক এখন প্রযুক্তি নির্ভর ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। দেশকে এগিয়ে নিতে এমন হাজারো উদ্যোগ নিয়েছিলেন নেন ড. আতিউর রহমান। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের অর্থনীতি আজ শুধু যে বাড়ন্ত তাই নয়, একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পেরেছে। 

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ সহযোগিতা পেয়েছিলেন বলেই এসব কাজ করা সম্ভব হয়েছে। একথা জানান সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তিনি বলেন, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের মধ্যে আরো বোঝাপড়া থাকা উচিৎ। কৃষিখাতের সাপোর্ট আরো বাড়াতে হবে। দেশের যুবসমাজের কর্মসংস্থানের সুযোগবৃদ্ধি করতে হবে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরির দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। দেশে তিন ভাগের ১ ভাগ তরুণ, এই সমাজকে কাজে লাগাতে হবে। ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার ঘটিয়ে এই তরুণদের উদ্যোক্তা ও কর্মী বানানোর দিকে নীতি নির্ধারকদের মনাযোগী হতে হবে। তিনি বলেন, ভোটের বিচারে তরুণরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের অবহেলার কোনো সুযোগ নেই।

 

তিনি আরো বলেন, রফতানি দেশের অর্থনীতির বড় খাত। এটি বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে। সর্বোপরি সবকিছুর সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে। ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা ও জবাদিহিতা আরো বাড়াতে হবে। তাদের সুশাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণ খেলাপির হার কমাতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো বেশি স্বাধীন ও সক্ষম করে তুলে আর্থিক খাতকে সর্বদাই স্থিতিশীল ও উদ্যোক্তা-সহায়ক রাখা সম্ভব। টেকসই উন্নয়নের জন্যে টেকসই অর্থায়ন অপরিহার্য। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখার ক্ষমতা রাখে। শুধু প্রয়োজন তাদের কাজের পরিমণ্ডলে অযথা কোনো বাধা তৈরি না করা।

 

 

ইত্তেফাক/ইউবি