বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার দিকনির্দেশনা থাকবে

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০১৭, ০৯:৫২
 
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে নেই কোন হাঙ্গামা। তবে এ শান্ত পরিস্থিতিতেও বিনিয়োগের মন্দা কাটছে না। বিনিয়োগ না বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোতে প্রচুর উদ্বৃত্ত বা অলস অর্থ পড়ে আছে। উদ্বৃত্ত এসব অর্থ কাজে লাগাতে পারলে তা অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে। বেসরকারি খাতই এ অর্থ কাজে লাগানোর জন্য উত্তম জায়গা। তাই বেসরকারি খাততে উত্সাহ দেওয়ার দিকনির্দেশনা থাকবে চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতে। প্রয়োজনে বেসরকারি খাততে প্রণোদনা দেওয়ার কথাও কথাও ভাবছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাজেটে ঘোষিত জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সহায়ক বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব থাকবে। অন্যদিকে বাজারে বেশি অর্থ চলে যেয়ে যাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রেখে নতুন মুদ্রানীতি বুধবার ঘোষিত হবে।
 
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, টেকশই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনের জন্য এবারের মুদ্রানীতিতে প্রথমবাবেরমত দিকনির্দেশনা থাকবে। প্রসঙ্গত, এসডিজি অর্জনের জন্য সরকার প্রথম থেকেই কর্মসূচি নিয়েছে। পরিকল্পনা থেকে শুরু করে অর্থায়ন, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাস্তবায়ন কর্মপরিকল্পনাসহ সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য সংগ্রহ করছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য’র (এমডিজি) পর ২০১৬ সাল থেকে এসডিজি শুরু হয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের এক বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের এসডিজি অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে।
 
চলতি অর্থবছরের (২০১৭-১৮) প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা হবে আগামী বুধবার। সকাল সাড়ে ১১টায় বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির আগামী ৬ মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। গভর্নর হিসাবে গত বছরের মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার পর ফজলে কবির তৃতীয়বারের মত মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে গত কয়েকটি মুদ্রানীতির ধারা ঠিক রেখে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে।
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেন, ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য বিনিয়োগে নিয়ে আসার জন্য একটি কাঠামো গঠন করতে হবে। একইসঙ্গে ব্যাংকিং খাতের শৃংখলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। গত দেড় বছরে দেশের ব্যাংকিং খাতে এমন কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি যে খেলাপি ঋণ বাড়বে। কিন্ত খেলাপি ঋণ বাড়ছে। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ছে অন্যদিকে খেলাপি ঋণও যদি বাড়ে তাহলে ওই ঋণের কার্যকারিতা থাকে না। সঠিকভাবে ঋণ কম বিতরণ হলেও ভাল প্রবৃদ্ধি পাওয়া যায়।
 
সুদের হারের ক্ষেত্রে নৈরাজ্য চলছে বলে মনে করেন বিরূপাক্ষ পাল। তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্রে যেভাবে সুদ দেওয়া হচ্ছে তাতে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকের আমানতে সুদের হারের চেয়ে অনেক বেশি সুদ পাওয়া যায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে। তাই এ ব্যাপারে মুদ্রানীতিতে সঠিক দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন এ অর্থনীতির অধ্যাপক। বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো-রিভার্স রেপো সঠিকভাবে কাজ করছে না বলেও তিনি মনে করেন।
 
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্যে ভারসাম্য রাখার লক্ষ্য নিয়ে প্রতি ৬ মাস অন্তর আগাম মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকে অগ্রাধিকার দিয়ে মুদ্রানীতিতে ঋণ ও মুদ্রাযোগান বাড়ানো বা কমানোর লক্ষ্যস্থির করা হয়। এবারের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি সাড়ে পাঁচ শতাংশ সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছে। গত জুনে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। যা গত মুদ্রানীতিতে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা বেশি।
 
সূত্র জানিয়েছে, বেসরকারি খাতে এবারে ঋণ যোগানের প্রাক্কলন সামান্য বাড়িয়ে ১৭ শতাংশ করা হতে পারে। আবার নির্বাচনের আগে উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কাজ করতে গিয়ে সঞ্চয়পত্রের পাশাপাশি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। গত কয়েকটি মুদ্রানীতিতে ব্যাংক থেকে সরকারের যে ঋণ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে তা নেওয়া হচ্ছে না। উল্টো ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করছে সরকার। তাই বেসারকারি খাতের পাশাপাশি সরকারি ক্ষেত্রেও যেন প্রয়োজনীয় যোগান দেওয়া যায় সে দিকে নজর দেওয়া হবে।
 
গত জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে সাড়ে ১৬ শতাংশ ঋণ বাড়ানোর প্রাক্কলন করা হয়। গত মে পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে ১৬ দশমিক শুন্য ৩ শতাংশ। আর সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে ১৮ হাজার ২৯ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করেছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ যোগানে বাড়তি কোনো চাপ ছিল না।
 
জানা গেছে, নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ যোগানের প্রাক্কলন বাড়ানো হলেও ব্যাপক মুদ্রা যোগানের লক্ষ্যমাত্রা একই রকম থাকছে।
 
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং জিডিপির প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা বা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতি ৬ মাস অন্তর আগাম মুদ্রানীতি ঘোষণা করে থাকে। দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় মুদ্রানীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে পরবর্তী ছয় মাসে অভ্যান্তরীণ ঋণ, মুদ্রা সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ, বৈদেশিক সম্পদ কতটুকু বাড়বে বা কমবে তার একটি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। মুদ্রানীতি চুড়ান্ত করতে অন্যান্য বছরের মত এবারও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, বিশিষ্ট ব্যাংকার, প্রাক্তন গভর্নর, প্রাক্তন মন্ত্রী, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।