ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন উত্তেজনার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকেই ইরান-বিরোধী মনোভাব ব্যক্ত করে এসেছেন। যদিও এখন পর্যন্ত দেশ দুটো বড় কোনো ধরনের দ্বন্দ্বে জড়ায়নি। কিন্তু হোয়াইট হাউস পুরনো অভ্যাস মতো ঠিকই তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনামলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ভিয়েনায় একটি চুক্তি হয়েছিল।
এ চুক্তির পর তেহরান-ওয়াশিংটনের মধ্যে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত না হলেও দু’দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ ও ইইউ’র এ যাবত্ আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো কিছুটা শিথিল হওয়ায় ইরান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবার ফিরতে শুরু করেছিল। পরমাণু ইস্যুতে ইরানকে ঘায়েল করার সুযোগ না থাকায় যুক্তরাষ্ট্র এখন ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ এনে দেশটির বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা করছে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন জঙ্গি গ্রুপকে সহায়তা করে এবং সেদেশে বিদেশি নাগরিকরা অকারণে হেনস্থার শিকার হয়ে থাকে। অতিসম্প্রতি ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি চালানোর দায়ে একজন ইরানি-আমেরিকান নাগরিককে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার ছয়টি মিত্র দেশের সঙ্গে সম্পাদিত পরমাণু চুক্তি ইরান মেনে চলছে কী না তা পর্যবেক্ষণ করা গ্রুপগুলোর প্রতিবেদন সাপেক্ষে মার্কিন কংগ্রেস প্রতি ৯০ দিন পরপর সত্যায়ন করে। ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ১৭ জুলাই কংগ্রেস সেটি দ্বিতীয়বারের মতো সত্যায়ন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা এটি নিশ্চিত যে ইরান পরমাণু কর্মসূচি স্থগিত রেখেছে। তারপরও দেশটিকে নিয়ে তাদের অস্বস্তি কাটছে না। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত চলতি বছর আরও আগের দিকে লিখেছিলেন, ‘এটি নিশ্চিত যে পরমাণু চুক্তি তেহরান মেনে চলছে। বড় কোনো পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তারা এগোচ্ছে না। কিন্তু দেশটির আঞ্চলিক ভূমিকা মোটেই ইতিবাচক নয়।’ মে মাসে প্রথম বিদেশ সফরের শুরুতে সৌদি আরব গিয়ে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরব দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের সূত্রে এটি জানা গেছে যে, তিনি ইরানের ব্যাপারে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত কেবল কংগ্রেসের সত্যায়নের ওপর বসে থাকতে চান না। তেহরানের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক মিত্রদের দিয়ে হোক অথবা নিজেই উদ্যোগী হয়ে কিছু একটা করতে চান ট্রাম্প।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ওবামার কীর্তিগুলো ইতিহাস থেকে মুছে যাক সেটি ট্রাম্পের ঐকান্তিক কামনা। যেমন- ওবামাকেয়ার নামে পরিচিত তার সময়ে গৃহীত অ্যাফোর্ডেবল হেলথ কেয়ার বিলটি বাতিল করে সেখানে নতুন স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার আনতে তিনি এখন মরিয়া। নানা কারণে এ চেষ্টা আলোর মুখ দেখছে না। তাই বলে দমে যাওয়ার পাত্র নন ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পদক্ষেপ গ্রহণ ছিল ওবামার সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ওবামাই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর প্রথম ইরানের একজন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিটি যেন গুরুত্ব হারায় ট্রাম্প এখন সে চেষ্টাই অব্যাহত রেখেছেন। ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের প্রধান ত্রিতা পারসি বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন ইচ্ছাকৃত ও উদ্দেশ্যমূলক এমন একটি পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে যেন পরমাণু চুক্তিটি স্বাভাবিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। এভাবে এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে ইরানে শাসক পরিবর্তনের ঘোষণা দেবে।’ উল্লেখ্য এই কাউন্সিল তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।
পারসি বলেন, ইরানের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো যেখানে সংলাপকে প্রাধান্য দিচ্ছে সেখানে ট্রাম্প প্রশাসন চেষ্টা করছে উত্তেজনার পারদ উপর দিকে নিয়ে যেতে। পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিষয়টিকে তারা একেবারেই আমলে নিচ্ছে না। যেমন- পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের সঙ্গে যেন ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে নেয় মে মাসে ব্রাসেলসে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প সে চেষ্টাই করেন। অথচ এ কাজটি চুক্তি-বিরোধী। চুক্তির একটি ধারায় বলা হয়েছে, চুক্তি মেনে চলা অবস্থায় কোনো পক্ষ এমন আচরণ করতে পারবে যাতে ইরানের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র যাই প্রত্যাশা করুক চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্যান্য দেশ (ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও রাশিয়া) এখনো এ চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার আগ্রহ দেখায়নি। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গ্যাব্রিয়েল গতমাসে এ চুক্তিকে ‘নতুন আশা’ অভিহিত করে বলেন, এটি ইউরোপের বহু কোম্পানিকে ইরানের ভোক্তাদের কাছে যাওয়ার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে।
ফ্রান্সের বৃহত্ জ্বালানি কোম্পানি ‘টোটাল’ জুলাই মাসে ইরানের সঙ্গে ৫ বিলিয়ন ডলারের এক ঐতিহাসিক চুক্তি করেছে। স্পষ্টত আমেরিকা যে পথে হাঁটছে ইউরোপে সে পথে না গিয়ে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাওয়াদ জারিফ গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনের এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘ওয়াশিংটন বৈপরীত্যমূলক বার্তা দিচ্ছে’। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়নি সম্ভবত তারা সেটি করবেও না। তা সত্ত্বেও তারা যে বার্তাটি দিচ্ছে সেটি বিভ্রান্তিকর। এর মধ্যদিয়ে তারা নিজেদের অবস্থান অস্পষ্ট করে তুলছে।
ইত্তেফাক/আনিসুর
