উচ্চ সুদের ভার তবু সঞ্চয়পত্র নির্ভর

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৭, ০৯:১৯
 
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সরকার ঋণ নিলে উচ্চ হারে সুদ দিতে হয়। অথচ এর চেয়ে অনেক কমে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া যায়। এরপরও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য সুবিধা দেওয়ার যুক্তিতে সরকার সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমায়নি। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ বলছেন, নির্দিষ্ট আয়ের মানুষেকে সুবিধা দেওয়ার মাধ্যম সঞ্চয়পত্র নয়। বরং তাদেরকে অন্যভাবে সুবিধা দেওয়া যতে পারে। এরপরও সরকার সহজে ঋণ নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে সঞ্চয়পত্রের দিকেই ঝুঁকছে। তাই দিন দিন সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছে। সরকারের সুদের ব্যয় বাবদ চাপও বেড়ে যাচ্ছে।
 
জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সদ্য সমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে ৫২ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। গেল জুন মাসেই বিক্রি হয়েছে ৫ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র। অথচ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের শুরুতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। পরে সংশোধিত বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ৪৫ হাজার কোটি টাকা গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে গেছে মে মাসে।
 
উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ঋণ করায় সুদের চাপও বাড়ছে সরকারের উপর। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। যা মোট বাজেটের ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থাত্ বাজেটের সাড়ে দশ শতাংশই চলে যাবে সুদ পরিশোধ করতে। এসব ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেন, সঞ্চয়পত্র থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে ঋণ করায় সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় সুদের খরচ বাড়ছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং সিস্টেমেও সমস্যা তৈরি করছে। তিনি বলেন, সরকার গেল অর্থবছরে ব্যাংকিং খাত থেকে বড় অংকের ঋণ করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা নেয়নি, বরং সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে ঋণ করেছে। এতে ব্যাংকগুলোতে তারল্য অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে। আর সরকারকেও উচ্চ সুদের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এভাবে চলা ঠিক হবে না। সুদের হার বাজারের উপর ছেড়ে দেওয়া দরকার। ভারতের মতো এটি বন্ডের হারের চেয়ে ১ শতাংশ বেশি থাকতে পারে।
 
এদিকে সরকারের উপর সুদের চাপ বেড়ে যাওয়ায় অর্থমন্ত্রী সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কিছুটা কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। এরপর থেকে মানুষ সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তাই সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ বেড়ে গেছে। কারণ সুদের হার কমানোর আগে সঞ্চয়পত্র কিনলে তারা সুদ পাবেন পূর্বতন উচ্চ হারেই। তাই সুদের হার কমানোর আগে সবাই সঞ্চয়পত্র কিনে রাখতে চাইছেন।
 
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরে ৪১ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকার যে সুদ বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ সুদ বাবদ ব্যয় করা হবে ৩৯ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। আর বিদেশি ঋণের সুদ বাবদ ১ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ সুদ বেশি হওয়ার কারণ হলো— সঞ্চয়পত্রের অতিরিক্ত সুদ। গেল অর্থবছরের বাজেটে সুদ পরিশোধ বাবদ খরচ ধরা হয়েছিল ৩৯ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা; যা মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ সুদ বাবদ ৩৮ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা ও বিদেশি ঋণের সুদ বাবদ ১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। তবে সংশোধিত বাজেটে দেখানো হয়েছে সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩৫ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ সুদ বাবদ ৩৩ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা ও বিদেশি ঋণের সুদ বাবদ ১ হাজার ৮৬৩  কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সুদ পরিশোধে খরচ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৩৫ হাজার ১০৯ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে সুদ পরিশোধ বাবদ বরাদ্দ ছিল ৩১ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা। সুদ বাবদ সরকারের ব্যয় বাড়ার পরও সরকার সঞ্চয়পত্রের উপরই বেশি নির্ভর করছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি অর্থায়নে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। গেল অর্থবছরে এ খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। অর্থাত্ সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য বাড়ানো হয়েছে ৫৪ শতাংশ।