জলঢাকার জনগণের স্বপ্ন কেড়ে নিল বন্যা

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ০১:৪৮

নীলফামারীর জলঢাকায় জনগণের স্বপ্ন কেড়ে নিল বন্যা। গত তিনদিনের ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে তিস্তা নদীসহ অন্যান্য নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে।

নীলফামারীর ডালিয়া তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার (৫২.৪০) ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে নদীর পানি উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। অবিরাম বর্ষণের কারণে মাঠঘাট, বাড়িঘর, সড়ক, ফসলী জমিসহ মাছের প্রকল্প তলিয়ে গেছে। অবিরাম বর্ষণে জনজীবন থমকে গেছে। রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচল কমে গেছে। মানুষজন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না। উপজেলা শহরের প্রতিটি পাড়া মহল্লার পথঘাট ও বাসাবাড়ি বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানানো হয়েছে, কয়েক দিনের ভারি বর্ষণে তিস্তা নদী ছাড়াও বুড়ি তিস্তা, চারালকাটা, বুড়িখোড়া, যমুনেশ্বরী, খড়খড়িয়া, দেওনাই, খেড়ুয়া, শালকি, নাউতারা, কুমলাই, ধুম, ধাইজান, চিকলি, আউলিয়া খানা ও ইছামতি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের লক্ষিমারাই গ্রামের দিগলটারী এলাকার কৃষক মাহাবুবুর রহমানের কলেজ পড়ুয়া কন্যা মাহাবুবা আক্তার মৌসুমী কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ‘৮৮ সালে আমার বাবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করেছিল, তখনকার বন্যায় সব মাছ ভেসে যাওয়ায় ঐ ঋণ এখনো পরিশোধ করতে পারে নাই। এখন আবারও যেটুকু চাষাবাদ করেছে সেটুকুও বন্যায় খাইলো। সামনের দিনগুলো কিভাবে যাবে এবং ব্যাংকের ঋণের টাকা কিভাবে পরিশোধ হবে তা একমাত্র আল্লাহ্ জানেন।’

উপজেলা শহরের বাসিন্দা মাহাবুবের স্ত্রী মারুফা জানান, দির্ঘদিন ধরে এই এলাকায় বসবাস করছি এরকম বন্যা দেখি নাই। চাওড়াডাঙ্গি এলাকার মাছচাষী তারেকুল ইসলাম বলেন, আমার জীবনের সবটুকু উপার্জন দিয়ে এবারে মাছের চাষ করেছিলাম, এখন সব বন্যায় ভেসে গেলো। আমি সর্বশান্ত! মাছ চাষের ওপরে অনেক স্বপ্ন ছিল, কিন্তু সব স্বপ্ন কেড়ে নিল বন্যায়।

উপজেলার শৌলমারী ইউপি চেয়ারম্যান প্রাণজিৎ রায় পলাশ বলেন, তার ইউনিয়নে গতকাল তিস্তার বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তিনি নিজেস্ব তহবিল থেকে শুকনো খাবারের জন্য কিছু অর্থ দিয়েছেন। সরকারি ত্রানের জন্য পানিবন্দিদের তালিকা করার কথা আলাপ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে। সে অনুযায়ী আগামীকাল সরকারি ত্রাণ বিতরন করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মাদ রাশেদুল হক প্রধান বন্যার বিষয়ে বলেন, জলঢাকা উপজেলায় কয়েকটা নদী রয়েছে, এরমধ্যে খুটামারা ও শিমুলবাড়ির বন্যার চিত্র ভয়াবহ। এ এলাকাগুলোতে জরুরিভাবে আমরা দিনভর বন্যায় আটকেপড়া লোকদের উদ্ধার করে, সরকারি ত্রাণ তহবিল থেকে তাদের খাওয়া এবং থাকার ব্যবস্থা করছি। আগামীকাল থেকে উপজেলার সকল বন্যার্ত মানুষের কাছে সরকারি ত্রাণ পৌছে দেওয়া হবে।

নীলফামারী ৩ আসনের এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা বলেন, বন্যা শুরু থেকে আমি আমার নির্বাচনী এলাকায় আছি। বন্যা কবলিত প্রতিটি এলাকায় গিয়েছি। তাতে যা দেখছি সেই ৮৮র বন্যাকেও হার মানিয়েছে। বন্যায় পানিবন্দী মানুষদের দেখে আমি আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নাই।

এমপি আরও বলেন, নীলফামারী জেলা প্রশাসক, জলঢাকার ইউএনও এবং আমার দলীয় লোকদের সঙ্গে নিয়ে দিনভর পানিবন্দী কয়েক হাজার মানুষকে উদ্ধার করে, তাদের হরিসচন্দ্র পাট এবং পাঠান পাড়া স্কুলে থাকার জায়গা ও খাওয়ার ব্যাবস্তা করে দিয়েছি। এমপি বলেন, আমি ইউএনওকে আমার নির্বাচনী এলাকার সকল বন্যাকবলিত মানুষের কাছে সরকারি ত্রাণ পৌছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। এবং দলীয় লোকদের বলেছি, ঘরে বসে না থেকে পানিবন্দী মানুষের পাশে থাকেন, তাদের যেন কোনো জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি না হয়।

এমপি পানিবন্দী মানুষদের আশ্বাস দিয়ে বলেন, আপনারা কোন চিন্তা করবেন না। দূর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের সরকার সবসময় প্রস্তুত আছে। সরকারের ঘরে সবকিছু রেডি আছে, যখন যা দরকার হবে সবকিছু পেয়ে যাবেন ইনশা আল্লাহ।

ইত্তেফাক/নূহু