জঙ্গলে বাঘের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণীর বসবাসের গল্প। জঙ্গলের ছোট ছোট প্রাণীর নেতৃত্ব দেয় খরগোশ। তাদের হাতে লাল আর্মব্যান্ড বা লাল ফেট্টি বাঁধা। একদিন তাদের এসে শাসায় উদ্ধত বাঘ। হম্বিতম্বি করে বলে আমার বশ্যতা তোমাদের স্বীকার করতে হবে; কিন্তু কূটবুদ্ধি হেজহগ বাঘকে জব্দ করে। কারণ নিজেকে রক্ষা করতে সে গুটিয়ে ছোট্ট তুলোর বল হয়ে যায় আর সুযোগে গায়ের কাঁটা উঁচিয়ে বাঘের নাকে খোঁচা দেয়। উপায় না দেখে বাঘ পালায়।
অন্য ছোট জন্তুরা যারা প্রথমদিকে অনিচ্ছায় হলেও বাঘের আনুগত্য মেনে নিতে রাজি ছিল- তারা তখন বিজয়ী হেজহগের সাহস ও কৌশলী বুদ্ধির প্রশংসা করে উত্সবে মেতে ওঠে। এই গল্প নিয়ে সাধারণের মনে প্রশ্ন উঠত না; কিন্তু উত্তর কোরিয়ার সংবাদ সংস্থা এই কার্টুনের ভূয়সী প্রশংসা করে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে যাকে বলা হচ্ছে এটি সর্বকালের সেরা কাহিনী।
গল্পে কমলা রঙের বাঘটা আমেরিকার প্রতীক-অন্য ছোট জন্তুগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আর সাহসী অথচ বিপজ্জনক হেজহগটি হল উত্তর কোরিয়া। সংবাদ সংস্থা কেসিএনএতে নিবন্ধটি লিখেছেন কিম জং সন নামের একজন। তার মতে, হঠকারী ওই বাঘটা জঙ্গলের অন্য যেসব জন্তুর ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছিল তাদের চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত সাহসী হেজহগটার চরিত্রের। এটা বর্তমানের বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছে। কোনো দেশেরই আমেরিকাকে প্রশ্ন করার সাহস নেই। এদের পাশে নিজের দেশকে দেখে আমার গর্ববোধ হচ্ছে, বলেন কিম।
উত্তেজনা বাড়ছে: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, উত্তর কোরিয়ার হুমকি এমনভাবে মোকাবেলা করা হবে যা বিশ্ব এর আগে কখনো দেখেনি। তিনি বলেছেন, সামরিক অভিযান চালাতে যা কিছু প্রয়োজন তার সবকিছুই প্রস্তুত। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কেন, এর কোনো মিত্রদের ওপর হামলা চালালেও কিম জং-উনকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে। আর উত্তর কোরিয়ার হুমকি, তারা প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন দ্বীপ গুয়ামে হামলা চালাবে, যেখানে প্রায়১ লাখ ৬৩ হাজার মানুষ বসবাস করে।
এ সবকিছুই ঘটছে যখন উত্তর কোরিয়া এমন এক প্রকার পারমাণবিক বোমা তৈরিতে সফল হয়েছে, যা আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রে সংযোজন করা যাবে। ফলে পুরো বিষয়টি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র আর তার মিত্রদের। গুয়ামের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র গুয়ামে আসতে সময় লাগবে ১৪ মিনিট। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমেই উত্তর কোরিয়ার ওপর হামলা চালাবে না। দেশটি যদি হামলা চালায় তাহলেই পাল্টা জবাব দেওয়া হবে; কিন্তু কিভাবে সামরিক অভিযানে যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র? এ ব্যাপারে সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির সিনিয়র ফেলো এবং নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন জেরি হেনড্রিক্স বলেন, উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করতে হলে বিভিন্ন কৌশলে হামলা চালাতে হবে। কারণ উত্তর কোরিয়ার স্থল থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার যুদ্ধবিমান এফ-১৫ এবং এফ-১৬-এর সহযোগিতায় মার্কিন যুদ্ধবিমান স্টিলথ আমেরিকান এফ-২২, এফ-৩৫ এবং বি-২ বোমারু বিমান হামলা চালাতে পারে।
এমনকি মন্যুষবিহীন যুদ্ধবিমানও ব্যবহার করা হতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার ওসান এবং কুনসানে দুইটি মার্কিন বিমান ঘাঁটি আছে যেখানে এফ-১৬, এ-১০ ট্যাংক কিলারস রয়েছে। গুয়ামেও যুক্তরাষ্ট্রের বি-১, বি-২ এবং বি-৫২ বোমারু বিমান আছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা আকাশ থেকে এবং যুদ্ধজাহাজ থেকে হামলা চালাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কেন্দ্র টার্গেট করে তোমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে। জাপানের ঘাঁটিতে মার্কিন নৌবাহিনীর ১০ গাইডেড মিসাইল ক্রুজারস এবং ডেস্ট্রয়ার অবস্থান করছে। এসব যুদ্ধজাহাজে তোমাহক মিসাইল আছে। পিয়ংইয়ংয়ের অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধে সাইবার হামলাও চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
কেবলই মৌখিক যুদ্ধ: দুই দেশের মধ্যে পুরোদস্তুর যুদ্ধ বেঁধে যাবার সম্ভাবনা কতটা? কতটা বিপদ অপেক্ষা করছে সামনে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ নিয়ে এখনই খুব বেশি আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। তারা কিছু যুক্তিও তুলে ধরেছেন। প্রথমত-কোনো পক্ষই যুদ্ধ চাইছে না। কোরীয় উপদ্বীপে যুদ্ধ কারো জন্যই কোনো সুবিধা আনবে না। উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতাসীনদের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে ক্ষমতায় টিকে থাকা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি যুদ্ধ বেঁধে গেলে ক্ষমতার আসন নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।
বিবিসির জোনাথন মার্কাস বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র আর উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ হলে তা আরো বড় আকারে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে তা উত্তর কোরিয়ার জন্য হবে আত্মঘাতী। আবার ঠিক এ কারণেই দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে চাইছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন। কারণ আর যাই হোক, তিনি লিবিয়ার গাদ্দাফি বা ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের ভাগ্য বরণ করতে চান না। আবার যুক্তরাষ্ট্রও সহজে উত্তর কোরিয়ায় হামলা চালাবে না। কারণ, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
যুদ্ধে অনেক প্রাণহানি ঘটবে, বিশেষ করে সাধারণ আমেরিকান আর সৈনিকদের। দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ এর তথ্যমতে, উত্তর কোরিয়া ২১ হাজার ১০০ আর্টিলারি ফোর্স ব্যবহার করতে পারে যাদের হামলার আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ার ২৫ মিলিয়ন নাগরিক রয়েছে। সর্বোপরি ওয়াশিংটন এমন কোনো ঝুঁকিতে যেতে চায় না, যার ফলে আমেরিকান ভূখণ্ডে কোনো পারমাণবিক হামলা হতে পারে। দ্বিতীয়ত-কথার লড়াই? ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে যেভাবে হুমকি দিয়েছেন, সেটা একজন প্রেসিডেন্টের জন্য ব্যতিক্রম। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র পুরোদমে যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে।
মার্কিন একজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা বলেছেন, উত্তেজক কথাবার্তা বাড়ছে মানে এই নয় যে, আমাদের অবস্থানও বদলাচ্ছে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর দুইজন কর্মকর্তাও সিএনএনকে জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে যুদ্ধ বাধার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। ব্যর্থ রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়া শিগগিরই হামলা চালাতে পারে এমন কোনো তথ্যও তাদের কাছে নেই। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, দুই দফা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর, জাতিসংঘের মাধ্যমে অবরোধ আরোপের সেই পুরনো পথেই হেঁটেছে যুক্তরাষ্ট্র। এখনো কূটনীতিকরা আশা করছেন, রাশিয়া আর চীনের সহায়তায় উত্তর কোরিয়াকে আলোচনার টেবিলে আনা যাবে। যদিও কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, এরকম উত্তেজক পরিস্থিতিতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি থেকেও একটি যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। তৃতীয়ত-আগেও এরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সাবেক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিজে ক্রাউলে বলেছেন, ১৯৯৪ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্র একবার সশস্ত্র যুদ্ধের কাছাকাছি চলে এসেছিল। তখন পারমাণবিক কমপ্লেক্সে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষককে প্রবেশে বাধা দিয়েছিল দেশটি। তবে কূটনীতি দিয়েই তা সমাধান করা হয়েছে। এরপর অনেকবার যুক্তরাষ্ট্র, জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়ায় হামলার হুমকি দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। কিন্তু সেগুলো কখনো বাস্তব হয়নি। যদিও উত্তর কোরিয়া এ মাসেই গুয়ামে হামলার চিন্তা করছে বলে জানিয়েছে। আর এখন ট্রাম্প যেভাবে পাল্টা হামলার হুমকি দিচ্ছেন, তাও একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের আচরণের পক্ষে যুক্তিসঙ্গত নয়। এটাই আশঙ্কার যে, তিনি হঠাত্ করে কোনো কাণ্ড ঘটিয়ে বসবেন কিনা। তবে তার এ ধরনের কাজে নিশ্চয়ই পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন কিংবা প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বাধা দেবেন।
আর তাই ট্রাম্পের এরকম ব্যতিক্রমী আচরণে কারো উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই বলেই মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। এজন্যই বোধ হয়, মার্কিন মিত্র দক্ষিণ কোরিয়াও আগাম একটি যুদ্ধের আশঙ্কায় খুব একটা উদ্বিগ্ন নয়। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলছেন, এখনো পরিস্থিতি সংকটজনক সময়ে পড়েনি। আশা করা হচ্ছে, শান্তিপূর্ণভাবেই সমস্যার সমাধান হবে। চতুর্থত-চীন কি চায়? উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় মিত্র প্রতিবেশি চীন। অনেক কিছুর জন্যই দেশটি চীনের উপর নির্ভরশীল। বড় কোনো যুদ্ধে জড়াতে হলে চীনের মনোভাব বিবেচনা করতে হবে।
ইউনিভার্সিটি অব মালয়েশিয়ার চীন বিষয়ক বিভাগের একজন ফেলো এবং চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া বিষয়ক গবেষক ড. মাহমুদ আলী বলছেন, যদিও সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর কোরিয়া প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে। কিন্তু চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্য সহায়তাতেই উত্তর কোরিয়া এতদিন ধরে টিকে আছে। বতর্মান বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই হয় চীনের সঙ্গে। তিনি জানান, চীন ঐতিহাসিকভাবে উত্তর কোরিয়াকে বাঁচিয়ে রেখেছে। উত্তর কোরিয়া ধ্বংস হয়ে যাক চীন তা চায় না। তাহলে এমন একটি সংযুক্ত, অবিভক্ত কোরিয়া সৃষ্টি হবে, যার ফলে মার্কিন সৈন্যরা একেবারে চীনের সীমানায় চলে আসবে। আবার উত্তর কোরিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত হলে কোটি কোটি মানুষ চীনে আশ্রয় নেবে। তখন একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হবে। চীন সেটি চায় না বলে স্থিতিশীলতাই তাদের কাম্য। আশার আলো এখানেই।
ইত্তেফাক/আনিসুর
