বিচারকদের রায়ে রাগ বা বিরাগের প্রতিফলন ঘটেছে কি না তার বিচার করবে কে? বাংলাদেশের সংবিধানে এ ধরণের কোন ক্ষমতা কাউকে দেওয়া হয়নি। এদিকে, বাংলাদেশের সংবিধান প্রধান বিচারপতিকে অপসারণের ক্ষমতা শর্তসাপেক্ষে রাষ্ট্রপতিকে দিলেও এখন পর্যন্ত এর কোনো স্বাভাবিক প্রয়োগ দেখা যায়নি। অবশ্য সামরিক শাসন আমলে দুইজন প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিলো। ওই সময় সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদের ক্ষমতা বলে তা করা হয়নি। কেননা তখন সংবিধান স্থগিত ছিলো।
রাষ্ট্রপতি কেবল চারটি কারণে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে দিতে পারেন— যদি প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হয়, কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বলে রাষ্ট্রপতির কাছে সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয়। রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা স্বেচ্ছাধীন নয়। রাষ্ট্রপতির কাছে এটি সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হতে হবে। এ সংক্রান্ত সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে প্রধান বিচারপতি তাঁহার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে ক্ষেত্রমত অন্য কোন ব্যক্তি অনুরূপ পদে যোগদান না করা পর্যন্ত কিংবা প্রধান বিচারপতি স্বীয় কার্যভার পুনরায় গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারকের মধ্যে যিনি কর্মে প্রবীণতম, তিনি অনুরূপ কার্যভার পালন করিবেন।’
যে চারটি কারণের কথা বলা হয়েছে তার একটিও বর্তমান প্রধান বিচারপতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তার পদ শুন্য বা তিনি অনুপস্থিত নন, তিনি অসমর্থ বা অসুস্থও নন। বরং এ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির পদে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি সক্ষমতা দেখিয়েছেন। রায় প্রদান ও মামলা নিষ্পত্তির গতি অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়েছে গেছে বহুগুণে। ফলে প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কাছে চারটি কারণের কোনটিই সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মাণ হওয়ার সুযোগ নেই। তদুপরি, রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা স্বেচ্ছাধীন নয়। রাষ্ট্র বনাম দশ অতিরিক্ত বিচারকের মামলায় এটি প্রমাণিত হয়েছে। প্রধান বিচারপতির সুপারিশ থাকার পরও রাষ্ট্রপতি তাদের স্থায়ী নিয়োগ দেননি। রাষ্ট্রপতির এই কাজকে সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে। সুতরাং রাষ্ট্রপতি নিয়োগ কর্তা হলেও তার ক্ষমতা স্বেচ্ছাধীন নয়।
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ও এর পর্যবেক্ষণ নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রধান বিচারপতিকে তার পদ থেকে সরালে অন্য কিছু প্রতীয়মান হবে। তিনি অসুস্থ বা অসমর্থ তা প্রতীয়মাণ হবে না।
বিচারপতি খায়রুল হক বলেছেন, ‘(বিচারক) যদি রাগ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে রায় লেখেন তাহলে তার শপথ ভেঙে যায়। আর শপথ ভঙ্গ হলে কী হতে পারে, তা আপনারা ভালোই জানেন। শপথে বলা হয়, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে আমি কিছু করব না। কিন্তু রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়েছে, তাতে অনুরাগ না হোক, বিরাগ তো বহন করছে।’ সাবেক এই প্রধান বিচারপতির ইংগিত বা উস্কানি যা-ই বলি না কেন তিনি সরকারকে পথ দেখাচ্ছেন যে, প্রধান বিচারপতিকে এভাবে অপসারণ করা যায়। তার এই মন্তব্য বর্তমান এবং ভবিষ্যতে বিচার বিভাগকে ভয়ংকর বিপদে ফেলবে। আদৌও কি এই কারণে কোন বিচরপতিকে অপসারণ করা যায়? বাংলাদেশের সংবিধানে ১ থেকে ১৫৩ টি অনুচ্ছেদ আছে। কিন্তু কোথাও বিচারপতি খায়রুল হকের সমর্থনে এ ধরনের একটি বাক্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। বরং সংবিধানের ৯৪ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারকগণ বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন।’ অর্থাত্ মামলার শুনানি ও রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারকরা স্বাধীন। আর সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে যে, বিচারক রায়টি অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে দিয়েছেন কিনা এর বিচার করার ক্ষমতা সংবিধান কি কাউকে দিয়েছে?
নিম্ন আদালতের যে কোন রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে এবং হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে প্রতিকার চাওয়া যায়। কিন্তু ভুল-শুদ্ধ বা রাগ-অনুরাগ যাই হোক—আপিল বিভাগের রায় দেশের সবাই মানতে বাধ্য। আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি আবদুল মতিনের অভিমত হচ্ছে, সাংবিধানিক প্রশ্নে আপিল বিভাগের রায়ই সংবিধান। কেননা সংবিধানের ব্যাখ্যা, তার সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব সংবিধানই সর্বোচ্চ আদালতকে দিয়েছে।
খায়রুল হকের এই অপব্যাখ্যা গ্রহণ করলে বিচারকরা আর তো বিচার করতে পারবেন না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলতে কিছু থাকবে না। একটা খারাপ নজির স্থাপন হলে বিচার বিভাগের বিভিন্ন সময়ের দেওয়া রায় নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা যদি রাগ বা বিরাগের অভিযোগ তুলেন, এমনকি যিনি এই থিওরি দিচ্ছেন তার রায় নিয়েই যদি কেউ প্রশ্ন তোলে, তখন খায়রুল হক এবং তার চিন্তার সমর্থকরা কি জবাব দেবেন? বিচারপতি খায়রুল হক কোন বিরাগে, কার কাছে, কী অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন?
ইত্তেফাক/আনিসুর
