সদ্য রোপিত রোপা আমন ধান, বীজতলা ও অন্যান্য ফসল বন্যার পানিতে ডুবে নষ্ট হওয়ায় কৃষক হতাশ। গাইবান্ধায় বন্যা কবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে ডাকাত আতঙ্ক। ডাকাতরা কৃষকের গরু নিয়ে যাচ্ছে। ডাকাতদের বাধা দিতে গিয়ে চারজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পদ্মার চরাঞ্চলের বানভাসি মানুষ খাবার ও পানির কষ্টে আছে। কুষ্টিয়ায় শহর রক্ষা বাঁধের দুটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র গতকালের পূর্বাভাসে জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, পদ্মা, সুরমা-কুশিয়ারা নদীসমূহের পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে। অপরদিকে গঙ্গা নদীর পানি সমতল সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি সমতল হ্রাস আগামী ৭২ ঘন্টায় অব্যাহত থাকতে পারে। গঙ্গা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি আগামী ২৪ ঘন্টা অব্যাহত থাকতে পারে, যা পরবর্তীতে স্থিতিশীল হয়ে যেতে পারে। সুরমা-কুশিয়ারা নদীসমূহের পানি সমতল হ্রাস আগামী ২৪ ঘন্টা অব্যাহত থাকতে পারে।
জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুর জেলায় বন্যার পানি ধীর গতিতে নেমে যাচ্ছে। সদ্য রোপিত রোপা আমন ধান পানিতে তলিয়ে নষ্ট হওয়ায় সাধারণ কৃষকদের মাঝে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা। জামালপুর জেলার ৭টি উপজেলায় এবারের বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, বন্যায় সর্বমোট ৪৮ হাজার ৭৯৭ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে রোপিত রোপা আমন ধান, বীজতলা, আখ ও সবজির। এর মধ্যে ৪৪ হাজার ৩৯০ হেক্টর জমির রোপা আমন, ১ হাজার ৬৭২ হেক্টর জমির রোপা আমন বীজতলা, ১২৫ হেক্টর জমির আউশ, ২ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়েছে। এখনও হাজার হাজার কৃষকের ফসলাদি ও বীজতলা বন্যার পানির নিচে রয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (কৃষি) হযরত আলী বলেন, বন্যার পর আমরা কৃষকের সঙ্গে থেকে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করার চেষ্টা চালিয়ে যাব।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধা জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, তিস্তা ও করতোয়া নদীর পানি গত কয়েকদিন ধরে কমতে থাকলেও মানুষের দুর্ভোগের অবসান হয়নি। মানুষ এখনও নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেনি। খাবার পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বন্যা কবলিত এলাকার মানুষ ডাকাত আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। রবিবার মধ্যরাতে সুন্দরগঞ্জের বোচাগাড়ী (কাজিয়ারচর) গ্রামে নৌ ডাকাত দল হামলা চালিয়ে ২৮টি গরু নিয়ে যায়। বাধা দিতে গেলে ডাকাতদলের গুলিতে ৪ জন গুলিবিদ্ধসহ সাতজন আহত হয়েছেন।
গাইবান্ধা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আ কা মো. রুহুল আমিন মুঠোফোনে বলেন, এবার জেলায় বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গাইবান্ধা সদর, সাদুল্লাপুর, পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জ, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলায় ২৪ হাজার ৯৩৭ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এরমধ্যে আমন বীজতলা ১৫১ হেক্টর, রোপা আমন ২৩ হাজার ৯৩৫ হেক্টর, শাকসবজি ৮৪১ হেক্টর ও পান বরজ ১০ হেক্টর। তিনি আরো জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য কৃষি বিভাগের আপদকালীন বীজতলায় ইতিমধ্যে বীজ বোনা হয়েছে। এছাড়া মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ চেয়ে পত্র পাঠানো হয়েছে।
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, প্রমত্তা পদ্মার শাখা গড়াই নদীতে পানির প্রবল চাপে কুষ্টিয়া শহর রক্ষা বাঁধের দুটি স্থানে ব্যাপক ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধের দুটি স্থানে প্রায় ৫০ মিটার ভেঙে গেছে। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড বালুর বস্তা ফেলে বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, শহর রক্ষা বাঁধের শ্মশান ঘাট এলাকায় প্রায় পাশাপাশি দুটি জায়গায় সিসি ব্লক ধসে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধে এ ভাঙনের কারণে নদী তীরবর্তী বসতিসহ শহরবাসীর মধ্যে ভীতি ও শংকা দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহেদুল ইসলাম, ভাঙনে আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। আমরা সতর্ক নজর রেখেছি। জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে বন্যার পানি কিছুটা কমলেও বানভাসি মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। বিশেষ করে পদ্মার চরাঞ্চলের বানভাসি প্রায় ১০ হাজার মানুষ খুব কষ্টে আছে। তাদের ঘর-বাড়িতে চাল ছুঁই-ছুঁই পানি। ঘর-বাড়ি ছেড়ে অনেকে বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে চলে গেছেন। অনেকে টং ঘর তুলে সেখানেই থাকছেন।
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) সংবাদদাতা জানান রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মার পানি কমতে শুরু করলেও মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। গোয়ালন্দ বাজার স্টেশন থেকে দৌলতদিয়া ঘাট রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যকার যোগাযোগ এখনো বন্ধ রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে প্রাথমিক সংস্কার করে লাইন চালু করতে আরো অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে।
সিংড়া (নাটোর) সংবাদদাতা জানান, লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। মোট ৭ হাজার হেক্টর জমির ধান ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলার প্রায় ৭০টি স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা ও ১৩টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, নওগাঁর আত্রাইয়ে বন্যার পানিতে ডুবে আলেফ হোসেন (৯) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বংশাই ও লৌহজং নদীর পানি বিপদ সিমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতিমধ্যে বন্যা কবলিত এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।
ইত্তেফাক/নূহু
