মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের সংঘর্ষে হতাহতের পর সেখানে কম্বিং অপারেশন শুরু করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে রাখাইন ছেড়ে পালাতে শুরু করেছে রোহিঙ্গারা। এদের অনেকেই ভিড় করছে বাংলাদেশ সীমান্তে। এরই মধ্যে গতকাল বাংলাদেশ সীমান্তে আশ্রয় নেওয়া কিছু রোহিঙ্গাকে লক্ষ্য করে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীরা গুলি ছুড়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানানোর পর মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) দুঃখ প্রকাশ করেছে। এদিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে গতকাল চিকিত্সাধীন মোহাম্মদ মুছা (২২) নামে এক রোহিঙ্গা মারা গেছেন। মোঃ মোক্তার (২৭) নামে আরেক রোহিঙ্গা চিকিত্সাধীন রয়েছেন। অন্যদিকে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা ও ব্যাপকহারে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টার কারণে ঢাকায় মিয়ানমারের দূতকে তলব করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা।
গত বছরের অক্টোবরের পর আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। শুক্রবার মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের সংঘর্ষে ৮৯ জন নিহত হয়েছেন। দ্য আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (এআরএসএ) এই হামলার দায় স্বীকার করে আরো হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে। সংঘর্ষের পর থেকে রাখাইনে কম্বিং অপারেশন চলছে। এ কারণে প্রাণভয়ে রাখাইন ছাড়ছে রোহিঙ্গারা।
গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ সীমান্তে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীরা গুলি ছোড়ে। ইত্তেফাকের বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, বেলা ১টার দিকে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তমব্রু এলাকায় শূন্যরেখায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে সীমান্তে ওপার থেকে বিজিপি কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। বিজিবির কক্সবাজার ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঞ্জুরুল হাসান খান বলেন, বিজিপি’র গুলিবর্ষণের ঘটনায় তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়েছে বিজিবি। এজন্য ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছে বিজিপি। গুলির এই ঘটনায় উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে ঢুকতে মরিয়া রোহিঙ্গারা
ইত্তেফাকের টেকনাফ সংবাদদাতা জানান, রাখাইনে অস্থিরতা শুরুর পর বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গারা। অনুপ্রবেশের আশায় দলে দলে রোহিঙ্গা সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় ভিড় করছেন। কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী সীমান্ত দিয়ে শুক্রবার বাংলাদেশে প্রবেশের পর নাফ নদীর প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীরে বসে আছে সহায় সম্বলহীন কয়েক হাজার মানুষ। কিন্তু বিজিবি, কোস্টগার্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের বাড়তি সতর্কতার কারণে রোহিঙ্গারা অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন না। ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম আরিফুল ইসলাম জানান, রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে না। যত দূর সম্ভব আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি রোহিঙ্গারা যেন অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করতে না পারেন। ইতিমধ্যে সীমান্তে অতিরিক্ত কর্মকর্তা ও জনবল বাড়ানো হয়েছে। এদিকে গতকাল কক্সবাজারের টেকনাফে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১৭ রোহিঙ্গাকে আটক করেছে পুলিশ। আটক রোহিঙ্গাদেরকে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করার পর তাদেরকে আবার নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি।
চমেক হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ এক রোহিঙ্গার মৃত্যু
চট্টগ্রাম মেডিক্যালে গতকাল চিকিত্সাধীন মোহাম্মদ মুছা (২২) নামে এক রোহিঙ্গা নাগরিক মারা গেছে। হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ি জানায়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে চোরাইপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে চিকিত্সা নিতে শনিবার সকালে চমেক হাসপাতালে ভর্তি হয় দুই রোহিঙ্গা নাগরিক। এতে সকাল সাড়ে ৯টায় চিকিত্সাধীন অবস্থায় মুছা মারা যায়। মোঃ মোক্তার (২৭) নামে আরেক রোহিঙ্গা চিকিত্সাধীন রয়েছেন। তাদের বাড়ি মিয়ানমারের মংডু জেলার জেদিন্না থানার মেহেন্দি এলাকায়।
দূতকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ ঢাকার
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতা এবং রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের প্রেক্ষাপটে ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত অং মিন্টকে তলব করে প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা। গতকাল বিকালে তাকে তলব করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) মাহবুবুজ্জামান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে রাখাইনে সহিংসতার নিন্দা জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে, রোহিঙ্গারা যেন দলে দলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ না করে সে ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে অং মিন্টের কাছে একটি অনানুষ্ঠানিকপত্র হস্তান্তর করেছে ঢাকা।
উল্লেখ্য, গত বছরের অক্টোবরে একই ধরনের হামলায় ৯ পুলিশ নিহত হওয়ার পর রাখাইন রাজ্যে বড় আকারের সামরিক অভিযান চালানো হয়। ওই সময় প্রাণ বাঁচাতে অন্তত ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। যদিও মিয়ানমার মুসলিম রোহিঙ্গাদের নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে মানতে নারাজ। মিয়ানমারের অনাগ্রহের কারণে এসব রোহঙ্গাির প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে।
ইত্তেফাক/নূহু
