শোকে স্তব্ধ রুপার পরিবারের সদস্যরা

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০১৭, ১০:৫৪
 
টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার জাকিয়া সুলতানা রুপার বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। একমাত্র উপার্জনক্ষম ও প্রাণবন্ত রুপাকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ পরিবারের সদস্যরা। কাঁদতে কাঁদতে মা হাছনাহেনা বেগম গতকাল বুধবার জ্ঞান হারালে তাকে তাড়াশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। রুপার পরিবারের মতো গ্রামবাসীও আহাজারি করছেন, ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। এদিকে ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠছে তাড়াশসহ পুরো সিরাজগঞ্জ জেলার সাধারণ মানুষ।
 
নিহত রুপা তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের আসানবাড়ি গ্রামের মৃত জেলহক প্রামাণিকের মেয়ে। রুপার বড় বোন জিয়াসমিন খাতুন জানান, আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন ছিল রুপার। স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে বড় উকিল হবে। কিন্তু মানুষরূপী হায়েনারা তার স্বপ্নপূরণ হতে দিল না।
 
রুপার ছোট বোন পপি খাতুন জানান, দুইবোন এক সঙ্গে চাকরি করতাম। আপু থাকতো শেরপুরে। আর আমি থাকতাম জামালপুরে। শুক্রবার দিন সকালে আপু ফোন দিয়ে বলল, আমি বগুড়ায় শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি। পরীক্ষা শেষে আমি ময়মনসিংহ হয়ে শেরপুরে ফিরব। বিকাল ৫টার দিকে বলে আমি ছোঁয়া পরিবহনের বাসে উঠেছি। রাত ৮টার দিকে ফোন দিলে আপু বলে আমি সিরাজগঞ্জ রোডে খাবার খাচ্ছি। আমি তাকে তাড়াশের বাড়িতে যেতে বলি। কিন্তু আপু বলে অফিসে না গেলে চাকরি থাকবে না। এ জন্য আবার গাড়িতে ওঠে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে পপি বলেন, বাসের চালক-হেলপাররা আপুকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। হত্যাকারীদের সরকার যেন এমন শাস্তি দেয় যাতে আর কোনো পুরুষ কোনো মেয়ের প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ না করে।
 
রুপার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী জানান, আপু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। তাহাজ্জুদের নামাজ পর্যন্ত পড়ত। এতো ভালো একজন মানুষকে এভাবে মানুষ মেরে ফেলবে কল্পনাই করতে পারি না। যারা আপুকে হত্যা করেছে তারা মানুষ নয়-মানুষরূপী জানোয়ার।
 
হাসপাতালে বেডে শুয়ে থাকা অসুস্থ মা হাছনাহেনা বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন আর বলছেন আমাকে এখন কে দেখবে? কে মা বলে ডাকবে? মেয়ে আমার অনেক বড় অফিসার হতে চেয়েছিল। খুব কষ্ট করে লেখাপড়া করছিল-কষ্ট করে ছোট বোন ও ভাইদের খরচ চালাতো।
 
তাড়াশ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হক জানান, দেশে এখনো মেয়েদের জন্য নিরাপদ নয়। রাস্তাঘাটে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে মেয়েরা। এর সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। রুপা হত্যা মামলার দ্রুত তদন্ত শেষে চার্জশিট প্রদান এবং মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের মাধ্যমে দ্রুত বিচারকার্য সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন তিনি।
 
সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহমেদ ঘটনাটিকে ন্যক্কারজনক ও বেদনাদায়ক উল্লেখ করে বলেন, প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য টাঙ্গাইল পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দীকা জানান, সংবাদ পাবার পরপরই উপজেলা প্রশাসনকে রুপার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। তাদের নিরাপত্তাসহ সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
 
রুপার পরিবারকে পুলিশ সুপারের সহায়তা
 
হাছনাহেনা বেগমের অসুস্থতার খবর পেয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার (পিপিএম) মিরাজ উদ্দীন আহমেদ। তার পক্ষে তাড়াশ থানার ওসি মো. মনজুর রহমান নিহতের পরিবারের খোঁজ-খবর নেন। হাছনাহেনা বেগমের সু-চিকিৎসার জন্য তার হাতে নগদ অর্থ তুলে দেন। আজ বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম রুপার বাড়িতে যাবেন বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
 
তাড়াশে লাশ আসবে আজ
 
অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা রুপার লাশ মধুপুর কবরস্থান থেকে উত্তোলনের পর নিজগ্রাম আসানবাড়িতে আজ আনা হবে। মধুপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, লাশ উত্তোলনের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে। অনুমতি পেলে লাশ উত্তোলনের পর বৃহস্পতিবার পরিবারের লোকজনের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এছাড়াও মামলার তিন আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পর তাদেরকে গতকালই কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। বাকি দু’জনকে জবানবন্দির জন্য আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
 
ইত্তেফাক/মোস্তাফিজ