রোহিঙ্গাদের একক আশ্রয়কেন্দ্র হচ্ছে বালুখালিতে

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ২৩:৪৭

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের জন্য উখিয়ার বালুখালিতে অস্থায়ী আশ্রয় শিবির খুলছে সরকার। এই আশ্রয় শিবির থাকবে কাঁটাতার বেষ্টিত। উখিয়ার কুতুপালং-এ ইতিপূর্বে নিবন্ধিত এবং এখন যারা আসছে সকলকে ওই এক জায়গায় নেওয়া হবে। এখানে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে তাদের নিবন্ধন করা হবে। সার্বক্ষণিক ওই আশ্রয় শিবিরের নিরাপত্তায় থাকবে আনসার সদস্যসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গত দুদিনে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরিণ নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী এখন অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা ৯৮ হাজার ৫০০ জন। এর মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ১২ হাজার।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন গতকাল ইত্তেফাককে জানান, খাদ্য বা অন্যান্য কারণে রোহিঙ্গারা সারাদেশে যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য সকলকে একটি জায়গায় সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওই জায়গা থেকে কেউ যাতে পালিয়ে দেশের অন্যত্র আশ্রয় না নিতে পারে সে জন্য কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হবে। আর তাদেরকে চি?িহ্নত করে রাখতে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে রেজিষ্ট্রেশন করা হবে।

সচিব আরো জানান, রোহিঙ্গা শিবির পাহারায় আনসার নিয়োগ করা হবে। তবে যে কোন জরুরি প্রয়োজনে পুলিশ, র্যাব ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দেবে। এছাড়া ক্যাম্প স্থাপনের পর নতুন করে স্থানান্তরিতদের গতিবিধি ও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত লোকবল থাকবে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আবাসন, খাদ্যসহ নানা সুবিধা নিশ্চিত করার কৌশল ঠিক করতে গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের কক্ষে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শাহ কামাল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসতিয়াক আহমদ, ভূমি সচিব ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কক্সবাজারের ডিসি মো. আলী হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সভায় জানানো হয়, অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের জন্য স্থাপনা নির্মাণ করে দেবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) খাদ্য সহায়তা দেবে। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, রোহিঙ্গাদের আবাসন, খাদ্যসহ সব বিষয়ে সার্বিক ব্যবস্থাপনায় থাকবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এসব বিষয় দেখভাল করতে আগামীকাল বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো পরিদর্শনে যাচ্ছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব শাহ কামাল ইত্তেফাককে জানান, অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। শরণার্থীদের জন্য যা কিছু করণীয় আছে তার সবই আমরা করছি। আশা করছি, কোন সমস্যা হবে না।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অনানুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী নতুন করে ৯৮ হাজার ৫০০ জন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। এর মধ্যে কুতুপালং নিবন্ধিত ক্যাম্পে ৪৮ হাজার, কুতুপালং অনিবন্ধিত ক্যাম্পে ৩০ হাজার, বালুখালী অনিবন্ধিত ক্যাম্পে ১২ হাজার, টেকনাফের নয়াপাড়া নিবন্ধিত ক্যাম্পে তিন হাজার পাঁচশ’, লেদা অনিবন্ধিত ক্যাম্পে চার হাজার এবং শ্যামলাপুর অনিবন্ধিত ক্যাম্পে এক হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। তবে নতুন করে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের স্থান সংকুলানের মতো কোন জায়গা ক্যাম্পে বা আশেপাশে নেই। এজন্য অনেকটা বাধ্য হয়ে অনুপ্রবেশকারী আশ্রয়প্রার্থীদের ক্যাম্পের কমিউনিটি সেন্টার, স্কুল ও মসজিদ এবং খেলার মাঠে আশ্রয় দিতে হয়েছে।

কক্সবাজারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ৩৮ হাজার ৪৫৫ জন নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। যদিও বাস্তবে ৩৩ হাজার ৫৪২ জন বসবাস করছেন। তাদের থাকার জন্য নির্ধারিত জায়গায় সদ্য অনুপ্রবেশকারী ৫৬ হাজার পাঁচশ’ জনের থাকার ব্যবস্থা করায় দুটি ক্যাম্পে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রোহিঙ্গারা তিন শিফট করে এসব ক্যাম্পে ঘুমাচ্ছেন। পানি, চিকিত্সাসহ নানা নাগরিক সুবিধা পেতে সমস্যার মুখে পড়ছেন তারা। এর আগে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ কারণে ১৯৯১-৯২ সালে দুই লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন মিয়ানমার নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর মধ্যে দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জনকে প্রত্যাবাসন করা হয়। তবে পরে মিয়ানমার সরকারের অনিহার কারণে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শেষ করা যায়নি।

৩১ আগস্ট পর্যন্ত এক হিসাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বলেছে, বর্তমানে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার নয়াপাড়া এবং উখিয়া উপজেলার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে ৩৩ হাজার ৫৪২ জন নিবন্ধিত শরণার্থী বসবাস করছে। তবে মন্ত্রণালয় মনে করছে, রোহিঙ্গা নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির আগেই বাংলাদেশে প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমার নাগরিক অবস্থান করছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বেশি সংখ্যায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদকপাচারসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া রাজনৈতিক সমস্যা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু