গত পাঁচ বছরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে যে অর্থ উত্তোলন করেছে তার ৩১ শতাংশই ব্যয় করা হয়েছে ঋণ পরিশোধে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ার ব্যবসায়ীরা কোম্পানিতে পুঁজির জোগান দেয় ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য। যেন কোম্পানি ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে মুনাফা বাড়াতে পারে। সে মুনাফার ভাগ পাবে শেয়ারহোল্ডার। কিন্তু ঋণ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করায় কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজার থেকে মূলধন উত্তোলনের পর তাদের মুনাফা আর প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ে না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শেয়ার বিনিয়োগকারীরা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তথ্যে দেখা গেছে, গত ৫ বছরে ৫০টি কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে আইপিওর মাধ্যমে শেয়ার ছেড়ে ২ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকার মূলধন উত্তোলন করেছে। এরমধ্যে ৩১ শতাংশই ব্যয় করা হয়েছে ঋণ পরিশোধে। আর ৪৫ শতাংশ টাকা ব্যয় করা হয়েছে ব্যবসা সম্প্রসারণে। আইন অনুযায়ী উত্তোলিত মূলধনের এক তৃতীয়াংশ টাকা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যয় করা যায়। তবে ব্যাংক ঋণে যতটা কম ব্যবহার করা হয় পুঁজিবাজারের জন্য ততই ভালো।
আইপিওর টাকা ঋণে ব্যবহারকারী কোম্পানিগুলো বলছে, আমাদের দেশে আইপিও প্রক্রিয়া খুবই শ্লথ গতির। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইপিওর মাধ্যমে মূলধন উত্তোলন করতে ২ থেকে ৩ বছরও সময় লেগে যায়। তাই আইপিওর টাকা পাওয়ার আশায় বসে থাকলে ব্যবসা করা যায় না। ফলে তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে প্রকল্প শুরু করে দেন। পরে আইপিওর মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করেন। তবে সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানিগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু কোম্পানি পুরোনো ঋণ পরিশোধেও টাকা উত্তোলন করে। কোম্পানিগুলো যখন ঋণের ভারে চলতে কষ্ট হয়ে যায় তখন তারা আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন উত্তোলন করে। কিছুদিন পর এসব কোম্পানি মুনাফা করতে পারে না। ফলে কোম্পানি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে চলে যায়।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোম্পানিগুলো ঋণ পরিশোধে অর্থ ব্যয় করতে পারে, কিন্তু বেশি পরিমাণে করা উচিত নয়। অথচ প্রায়ই দেখা যায় যখন কোনো কোম্পানি অত্যধিক ঋণের ভারে চলতে পারে না। তখন তারা পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করে। ফলে অর্থ উত্তোলন করে পুঁজি বাড়ানো হলেও কোম্পানির আয় তেমন বাড়ে না। এতে অনেক কোম্পানিই পুঁজিবাজার তালিকাভুক্ত হওয়ার পর তাদের শেয়ারের দাম অফার প্রাইসের (যে দামে শেয়ার বিক্রি করে কোম্পানি) নিচেও নেমে আসে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ বলেন, আইপিওর অর্থে ঋণ পরিশোধ করা যেতে পারে। তবে আমাদের দেশে সাধারণত যারা আইপিওর অর্থ ঋণ পরিশোধে বেশি ব্যয় করেছে সে কোম্পানিগুলো ভালো মুনাফা করতে পারেনি। ফলে কোনো কোম্পানির ঋণ পরিশোধ করে ভালো অবস্থায় ফিরে আসার সত্ উদ্দেশ্য থাকলেও তারা বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে পারে না। তাছাড়া আমাদের দেশের কোম্পানিগুলোতে সুশাসনের অভাব রয়েছে। এতে যেসব কোম্পানির ঋণ বেশি থাকে সেসব কোম্পানির উদ্যোক্তারা বেশি শেয়ার হাতে রাখেন না। কোম্পানিগুলোর অবস্থাও ভালো থাকে না। ফলে আস্থা হারান বিনিয়োগকারীরা। তাই কোনো কোম্পানি আইপিওর টাকা ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে দেখলেই বিনিয়োগকারীরা ভয় পান।
ইত্তেফাক/এমআই
