নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে স্থানীয় সময় সোমবার পালিত হলো নাইন-ইলেভেন হামলার ১৬তম বার্ষিকী। মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণ্য এই সন্ত্রাসী হামলায় ১১ জন বাংলাদেশিসহ ৯৬টি দেশের প্রায় ৩ হাজার লোক প্রাণ হারিয়েছিল। প্রতিবছর দিনটি নানান আনুষ্ঠানিকতায় পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু বছর যত গড়াচ্ছে নাইন-ইলেভেনের বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলো ততই ফিকে হয়ে যাচ্ছে। ছোট হয়ে আসছে আনুষ্ঠানিকতাও। তবে চাকচিক্য বাড়ছে গ্রাউন্ড জিরোর। আর জৌলুস বাড়ছে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রের। কিন্তু নিহতের স্বজনেরা আজও জানে না কেন এই হামলা, প্রকৃত হামলাকারী কারা আর কী ছিল তাদের উদ্দেশ্য।
২০০১ থেকে ২০১৭। সময়ের ব্যবধান ১৬ বছর। আর এই ১৬ বছরে বিশ্বের সব ঘটনা প্রবাহকে পেছনে ফেলে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র-১। তিন হাজার প্রাণের 'বেদনার অনুস্মারক' এই ভবনটি এখন নিউইয়র্কের সবচেয়ে সুউচ্চ অট্টালিকা। আর এটি দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়ার মাধ্যমে শুরু হয়েছে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে যেভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার-১, তেমনি টুইন টাওয়ারের হামলাকারী সংগঠন আল-কায়েদার পরিবর্তে সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের মাথাব্যথার কারণ এখন ইসলামিক স্টেট (আইএস)।
৯/১১-এর হামলার পর পাল্টে যায় গোটা বিশ্বের প্রেক্ষাপট। ভয়াবহ এ হামলার জন্য জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদাকে দায়ী করে আফগানিস্তান ও ইরাকে সেনা অভিযানসহ বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির গতিপথই পালটে যায় এ ঘটনায়। এরই ধারাবাহিকতায় নতুন ত্রাস হিসেবে উত্থান ঘটেছে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল কায়দা সদস্যরা নাটকীয়ভাবে যাত্রীবাহী চারটি বিমান ছিনতাই করে একযোগে নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটনের গ্রাউন্ড জিরোতে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রের টুইন টাওয়ার ও ভার্জিনিয়ার পেন্টাগনে সন্ত্রাসী হামলা চালায়। যদিও এই হামলার পর সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদাকে দায়ী করে মার্কিন প্রশাসন। ২০০৪ সালে আল কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেন এই সন্ত্রাসী হামলার দায় স্বীকার করেন। হামলার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, ইসরায়েলের প্রতি মার্কিনিদের সমর্থন, সৌদি আরবে মার্কিন সেনা উপস্থিতি ও ৯০ এর দশকে ইরাকের উপর করা মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধকে। ১১ বছর ধরে ধাওয়া করার পরে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে বিন লাদেনকে খুঁজে পায় মার্কিন বাহিনী এবং সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে হত্যা করে বিশেষ কমান্ডো বাহিনী ইউএস নেভি সিল। ২০০১ সালের ওই হামলার পরে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
১৬তম বার্ষিকীতে স্থানীয় সময় সোমবার গতানুগতিক ধারায় নিউইয়র্ক সিটির গ্রাউন্ড জিরোতে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণসভা। নিউইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাজিও, মার্কিন সিনেটর চাক শ্যুমার, পুলিশ কমিশনার জেমস ও'নিল অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নানান কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়। প্রথম বিমান হামলার সময় অনুযায়ী নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোতে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে সকাল ৮টা ৪৬ মিটিটে শুরু হয় স্মরণ অনুষ্ঠান। এরপর হামলার সময় অনুযায়ী ৮টা ৪৬ মিনিটে নীরবতা পালনের মাধ্যমে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আরো পাঁচটি স্থানে হামলার নির্দিষ্ট সময় সকাল ৯টা ৩ মিনিট, সকাল ৯টা ৩৭ মিনিট, সকাল ৯টা ৫৯ মিনিট, সকাল ১০টা ৩ মিনিট এবং সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে নিহতদের স্মরণে নীরবতা পালন করা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকে সঙ্গে নিয়ে মার্কিন সামরিক সদর দফতর পেন্টাগনে নাইন ইলেভেনের নিহতদের স্মরণ করেন। নিউইয়র্কে বাংলাদেশিরাও প্রতিবছরের মত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্মরণ করেন নিহতদের।
ইত্তেফাক/জামান
