ধলেশ্বরীও বুড়িগঙ্গার রূপ নিচ্ছে

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০২:০৮

সাভার চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবস্থা করুণ। ফলে ধলেশ্বরীও বুড়িগঙ্গার রূপ নিচ্ছে। সোমবার পবা কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

গত ৮ সেপ্টেম্বর পবার একটি প্রতিনিধি দল সাভার চামড়া শিল্পনগরীর বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন পবা’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খান।

বক্তারা বলেন, সাভার চামড়া নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বেহাল দশার দায়ভার শিল্প মন্ত্রণালয়, বেসিক ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, শিল্প মালিক, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বুয়েটের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেউই এড়াতে পারে না। সিটিপি’র ইতিপূর্বে চালু হওয়া ১২ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য পরিশোধনের দুটি মডিউল বর্জ্য কাঙ্ক্ষিত মানমাত্রায় পরিশোধনে ব্যর্থ। সিটিপি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে এবং পরিশোধিত বর্জ্যের গুণাগুণ নিয়মিত পরীক্ষার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণাগার স্থাপিত হয়নি। যদিও সিটিপির মডিউল চালু হওয়ার সাথে সাথেই নিয়মিত বর্জ্যের গুণাগুণ পরীক্ষা করা অত্যাবশ্যক। এ গবেষণাগার স্থাপিত না হওয়ায় বর্জ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়াই সম্ভব নয়। গবেষণাগার স্থাপিত না হওয়ার দায়ভার প্রকল্প কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে।

বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের অপরিশোধিত বর্জ্য স্ক্রিনিং করার পর দুটি আলাদা পাইপ লাইনে সিটিপিতে এবং ক্রোম রিকোভারি ইউনিটে নির্গমন করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাস্তবে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বর্জ্য স্ক্রিনিং   ছাড়াই পাইপ লাইনে ছেড়ে দিচ্ছে। ফলে পাইপ লাইন ব্লক হয়ে বর্জ্য শিল্পনগরীতে ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়াও ক্রোম মিশ্রিত বর্জ্য আলাদা পাইপ লাইনে ক্রোম রিকোভারি ইউনিটে যাওয়ার কথা থাকলেও শিল্প মালিকরা তা না করে এ বর্জ্য পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরাসরি সিটিপিতে প্রেরণ করেছে। এতে সিটিপির কার্যকারিতা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ট্যানারি শিল্পের অপরিশোধিত বা সিইটিপির মাধ্যমে স্বল্প পরিশোধিত বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে ফেলা হচ্ছে। এভাবে ধলেশ্বরী নদীর পানিও বুড়িগঙ্গার মতো ক্রমান্বয়ে দূষিত হয়ে পড়ছে।

সিটিপির স্লাজ থেকে তরল বর্জ্য অপসারণসহ এর পরিমাণ হ্রাসের লক্ষ্যে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কেক বানানোর যে প্রক্রিয়া তা এখনো শুরু করা হয়নি। যা অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন করা জরুরি। অন্যথায় এ স্লাজ দ্বারা দূষণের মাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকবে।

বিভিন্ন শিল্প থেকে ক্রোমিয়াম পৃথক পাইপের মাধ্যমে ৩টি ক্রোম রিকোভারি সেন্টার পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও এখনো সব শিল্প থেকে তা আসছে না। ক্রোম মিশ্রিত বর্জ্য কিছুটা পরিশোধিত হলেও এখান থেকে ক্রোম পুনঃব্যবহার করার উপযোগী ব্যবস্থা চালু হয়নি। ক্রোম রিকোভারি সেন্টারের উচ্ছিষ্ট বর্জ্যটুকু সরাসরি পুকুরে ফেলা হচ্ছে।

কঠিন বর্জ্যের ডাম্প ইয়ার্ড তৈরির কার্যক্রম এখনো শুরুই হয়নি। কিছু অংশ পুকুরে অন্য অংশ যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। কঠিন বর্জ্য থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদন করার কথা বলা হলেও এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। লবণ রিকোভারি বা ট্রিটমেন্ট করার এখনো কোনো পরিকল্পনাই গ্রহণ করা হয়নি। বৃষ্টির পানি অপসারণের জন্য ড্রেন নির্মিত হলেও শিল্প-কারখানার মালিকরা স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের সামনে ড্রেনগুলো ভরাট করে রেখেছে। ফলে রাস্তায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বৃষ্টির পানির সাথে শিল্পবর্জ্য মিশ্রিত পানি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। শ্রমিকদের আবাসন, খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, শিক্ষার কোনো পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেই।

সংবাদ সম্মেলনে সাভার চামড়া নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই বেহাল দশার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তারা। তাছাড়া সাভার চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ সামগ্রিক কার্যক্রম তদারকির জন্য একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করারও দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পবা’র সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান, ট্যানারি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, পবা’র সহ-সম্পাদক এম এ ওয়াহেদ রাসেল, মো. সেলিম, নাসফ-এর সাধারণ সম্পাদক মো. তৈয়ব আলী, পবা’র সদস্য মোস্তারি বেগম, আবুল হাসানাত চুন্না প্রমুখ।

ইত্তেফাক/নূহু