পদ্মা সেতু ইস্যুতে তদন্ত করা আইসিসি প্রসিকিউটরের দুর্নীতির নথি ফাঁস

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০১৭, ১৭:০৮
 
পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্ব ব্যাংকের পাঠানো তদন্ত কমিটির প্রধান ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউটর লুইস মোরেনো ওকাম্পোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ইউরোপ ভিত্তিক একটি সংস্থার করা রিপোর্ট অনুসারে বিশ্বের বেশ কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী, লবিস্ট, সাংবাদিক ও তারকাদের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিতেন তিনি। আইসিসির বিভিন্ন তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য তিনি এই অর্থ নিতেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
 
এছাড়াও তার বিরুদ্ধে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে সম্পদ লুকানোর অভিযোগও রয়েছে।
 
ওকাম্পোর বিরুদ্ধে করা ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, আইসিসির প্রসিকিউটর থাকাকালে বিদেশে গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং করস্বর্গ (ট্যাক্স হেভেনস) হিসেবে পরিচিত দেশে তার অর্থায়নে কোম্পানি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
 
পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ আনে বিশ্বব্যাংক যা তদন্তে একটি পর্যবেক্ষক প্যানেল গঠন করে বাংলাদেশে পাঠায় ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে। তদন্ত কমিশন বাংলাদেশ সফর শেষে একটি প্রতিবেদন জমা দেয় যেখানে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে এমন অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয় এবং অভিযুক্তদের একটি তালিকা সংযুক্ত করা হয়, যে তালিকা প্রকাশ করেনি কমিশন।
 
IMG0
 
আইসিসির প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পালন করে আসা ওকাম্পো নেতৃত্বাধীন ওই পর্যবেক্ষক দলের পরামর্শে দুদকের করা মামলায় সে সময় জেল খাটতে হয়েছিল সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়াকে।
 
পরে কানাডার একটি আদালত পদ্মা প্রকল্পে বিশ্ব ব্যাংকের আনা দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ খারিজও করে দিয়েছে, যদিও বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপড়েনে এই প্রকল্পে সংস্থাটির অর্থায়ন আর হয়নি।
 
ফরাসি অনলাইন জার্নাল মিডিয়াপার্টের কাছে কূটনৈতিক তারবার্তা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য সম্বলিত ৪০ হাজার নথি রয়েছে। ওই সব নথি পর্যালোচনার ভিত্তিতে ইউরোপিয়ান ইনভেস্টিগেটিভ কোলাবোরেশনস (ইআইসি) বলছে, আইসিসির দায়িত্ব ছাড়ার পর সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধী অপরাধীদের পক্ষে কাজ করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন ওকাম্পো।
 
৬৫ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন আইনজীবী ওকাম্পো প্রথম আন্তর্জাতিক মহলের নজরে আসেন তার দেশের সামরিক জান্তা সরকারের সদস্যদের বিচারের মুখোমুখি করতে ভূমিকা রেখে। ২০০৩ সালে নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রথম প্রসিকিউটর হন তিনি, এই দায়িত্বে ছিলেন নয় বছর। দায়িত্বে থাকাকালে তার প্রধান তিনটি লক্ষ্য ছিল-গণহত্যার জন্য উগান্ডার গেরিলা নেতা জোসেফ কনি ও সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির এবং মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে বিচারের মুখোমুখি করা।
 
লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধের এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিমান হামলার মুখে রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া গাদ্দাফি নিজের দেশের মানুষের হাতে খুন হন, ২০১১ সালে। চরম নিষ্ঠুরতা ও শিশুদের যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য আলোচিত কনি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। কয়েক বছরের গৃহযুদ্ধে ব্যাপক প্রাণহানির পর এখনও সুদানের ক্ষমতায় ওমর আল-বশির।
 
রোমানিয়া ভিত্তিক একটি ওয়েবসাইট বলছে, আইসিসির দায়িত্ব ছাড়ার পর প্রচুর অর্থ বানাচ্ছেন ওকাম্পো। নিউইয়র্ক ভিত্তিক ল ফার্ম গেটনিক অ্যান্ড গেটনিকে পরামর্শক, হার্ভার্ডের লেকচারার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ভাইয়ের সঙ্গে মোরেনো ওকাম্পো নামে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই গাদ্দাফি পরবর্তী লিবিয়ায় যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (এলএনএ) অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ধনকুবের হাসান তাতানাকিকে আইনি সহায়তা দিতে চুক্তি করেন ওকাম্পো।
 
IMG1
 
গাদ্দাফি ও তার ছেলে সাইফের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা ওকাম্পো গাদ্দাফি অনুসারী হিসেবে তাতানাকির সঙ্গে এই চুক্তি করেন ২০১৫ সালে। তিন বছর সেবা পেতে তিন মিলিয়ন ডলারের পাশাপাশি দৈনিক মজুরি হিসেবে তাকে পাঁচ হাজার ডলার দিতে চুক্তিবদ্ধ হন তাতানাকি।
 
২০১৫ সালের ১২ মে ওকাম্পো তার পক্ষে কাজ শুরু করার ছয় দিনে মাথায় আইসিসির চিফ প্রসিকিউটর ফাতোস বেনসোডা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির বেসামরিকদের হত্যা-নির্যাতন ও তাদের হাতে আটকদের নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ওই সশস্ত্র গোষ্ঠী ও তাতানাকিকে যাতে আইসিসির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে না হয় সেজন্য ওকাম্পো পথ বাতলে দিতে চেয়েছিলেন বলে তার একটি ইমেইলে উঠে এসেছে।
 
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, ওকাম্পো আইসিসির দায়িত্ব ছাড়ার দুই মাস পর তার ডাচ ব্যাংক এবিএন আমর-এর অ্যাকাউন্টে ৫০ হাজার ডলার আসে সুইজারল্যান্ডের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে। টেইন বে করপোরেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ওই অর্থ পাঠানো অব্যাহত থাকে।
 
টেইন বে করপোরেশন নিবন্ধন রয়েছে পানামায়, এই অফশোর হেভেনে কোম্পানিগুলোর মালিকদের নাম গোপন থাকে। ওকাম্পো ও তার স্ত্রী ওই কোম্পানির মালিক বলে ফাঁস হওয়া নথিতে বেরিয়ে এসেছে।
 
IMG2
 
করস্বর্গ হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে ইয়েমানা ট্রেডিং নামে ওকাম্পোর এবং আরেক করস্বর্গ বেলাইজে লুসিয়া এন্টারপ্রাইজেস নামে তার স্ত্রীর একটি কোম্পানি থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।
 
দক্ষিণ আমেরিকায় অফশোর হেভেন হিসেবে বিবেচিত উরুগুয়েতে মোরেনো ওকাম্পো কনসাল্টিংয়ের প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্ট মার্কেটস নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
 
এদিকে নিজের দেশ আর্জেন্টিনায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নিরাপদ নয় দাবি করে ওকাম্পো বলেন, বৈধ ও অবৈধ উভয় কারণেই আপনার অফশোর কোম্পানি থাকতে পারে। অর্থ বা ঘুষ নেওয়ার জন্য আপনি একজন দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি হতে পারেন। আবার একজন সৎ আইনজীবী হিসেবে আপনি বাইরে অর্থ রাখতে পারেন।
 
তবে বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে তার অপরাধ প্রমাণিত হলে আইসিসির এই সাবেক প্রসিকিউটরের পাশাপাশি বিশ্বে আরো নামীদামী বেশ কয়েক জনের নাম উঠে আসারও সম্ভাবনা রয়েছে।
 
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তার বিরুদ্ধে হওয়া প্রতিবেদন বিস্তারিত পড়তে এখানে ক্লিক করুন।