‘এখানে ডাক্তার নার্সদের যে ভালোবাসা পেয়েছি, তা এর আগে কোথাও পাই নি। জীবনে এখন আর কিছু চাওয়ার নেই। আপনাদের মতো ভালো মানুষরা যখন পাশে এসে কথা বলেন, তখন ভেতরের কষ্ট অনেক কমে যায়। টাকা-পয়সা চাই না; সবার কাছে শুধু দোয়া চাই’—কথাগুলো বলছিলেন, ক্যান্সার আক্রান্ত ৩২ বছরের ‘রুবেল’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ই-ব্লকে প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টারে কথা হয় তার সঙ্গে। রুবেল নিজেও জানেন, তিনি বেশিদিন বাঁচবেন না। তাই চোখের পানি ঝরিয়ে দোয়া ছাড়া আর কিছুই চান না।
রুবেলের মতো আরো আছেন ঝর্ণা, সিদ্দিকুর, রূপজান, সালমা, মহিদুলসহ ৯ জন রোগী। যাদের রোগ অনিরাময় যোগ্য। যেমন ‘ক্যান্সার’। প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেইসব নিরাময় অযোগ্য রোগীদের সেবা দিয়ে থাকেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজিমুদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য নেই। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশে ৬ লাখ রোগীর জন্যে প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রয়োজন। যার মধ্যে সেবা পায় মাত্র দেড় থেকে ২ হাজার রোগী। বাকিরা এই সেবা থেকে বঞ্চিত। দেশে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত ১০ লাখ রোগী আছে। এরসঙ্গে প্রতিবছর নতুন করে যুক্ত হয় আরো ২ থেকে ৩ লাখ রোগী। এ সব রোগীর শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ নিরাময়ের অযোগ্য। এসব রোগীর জন্য প্রয়োজন ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার’। কিন্তু এ বিষয়ে সচেতনতার অভাবে এখনো দেশে এই নিরাময় অযোগ্য রোগীরা তাদের জীবনের শেষ দিনগুলো যন্ত্রণামুক্ত অবস্থায় কাটাতে পারছেন না। অথচ জনসচেতনতা বাড়ানোসহ দক্ষ জনবল ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে পারলে দেশে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের (প্রশমন সেবা) সুযোগ নিতে পারেন এসব রোগী।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টারের চিকিত্সক রোবাইয়াত রহমান বলেন, আমরা প্যালিয়েটিভ কেয়ারে আসা রোগীর রোগ ভালো না করতে পারলেও রোগের কারণে যে কষ্ট হচ্ছে তা উপসম করতে পারি। আমাদের কাজটা হচ্ছে রোগীর কষ্ট কমানো। রুবাইয়াত বলেন, ক্যান্সার যখন পুরো শরীরে ছড়িয়ে যায়, তখন রোগীর প্রচণ্ড ব্যথা হয়, পেটে পানি আসে, বুকের ক্যান্সারে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হয়, খাদ্য নালীর ক্যান্সারে বমি হয়. খাবার খেতে পারে না। এই যে কষ্টগুলো লাঘবের কাজটা করে এই সেন্টার। প্যালিয়েটিভ কেয়ার আসলে রোগীর চারটা জায়গা দেখে— ‘শরীর, সমাজ, মন ও আত্মা’। এই চারটা বিষয়ে রোগী এবং রোগীর আত্মীয়দের সাপোর্ট দেওয়াই প্যালিয়েটিভ কেয়ারের কাজ।
তিনি বলেন, আমাদের কাছে যে রোগী আসে তারা সবসময় আসে জীবনের অন্তিম মুহূর্তে। তারা তখন হাসপাতালে থাকতে চান না, বাসায় থাকতে চান। এ কারণে আমরা তাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রক্ষা করি। তবে এটা কেবল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ কিলোমিটারের মধ্যে। প্রতিবছর এখানে নতুন রোগী আসে ৭০০ জনের মতো। এরমধ্যে এক-তৃতীয়াংশ মারা যায়, বাকিরা সেবা নেন দুই আড়াই বছর। অথচ দেশে এ ধরনের সেবা পাওয়ার যোগ্য ৬ লাখ রোগী।
দেশে এ পরিস্থিতিতে গতকাল শনিবার দ্বিতীয়বারের মতো পালিত হলো ‘বিশ্ব হসপিস ও প্যালিয়েটিভ কেয়ার দিবস-২০১৭’। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল—‘ইউনিভার্সেল হেল্থ কাভারেজ ডোন্ট লিভ দোজ সাফারিং বিহাইন্ড’। সচেতনতা বাড়লে শেষ জীবনে পৌঁছে যাওয়া রোগীরা সুন্দর ব্যবহার, সাহস জোগানো ও পরিকল্পিতভাবে ব্যথা নিরাময়কারী ওষুধ প্রয়োগে কিছুটা শান্তি পেতে পারেন। দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা, বৈজ্ঞানিক সেমিনারসহ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।
ইত্তেফাক/আনিসুর
