বড় অঙ্কের ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) প্রদান করে এমন ৪৫টি প্রতিষ্ঠানের উপর বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ তালিকায় রয়েছে রয়েছে মোবাইল ফোন কোম্পানি, সিমেন্ট, গ্যাস খাতের কোম্পানি, ওষুধ, ইস্পাত, প্রসাধনী তৈরির স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানি।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৩টিতে বিশেষায়িত নিরীক্ষা শুরু হয়েছে। তিনটি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। নিরীক্ষা হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দুটি মোবাইল ফোন কোম্পানির বড় ধরনের ভ্যাট ফাঁকির প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলো কোন কোন উপায়ে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে, তা বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারিগরি, তথ্য-প্রযুক্তিজ্ঞানে অভিজ্ঞ ও আইনগত বিষয়ে পারদর্শী এনবিআরের অপেক্ষাকৃত চৌকস কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে এলটিইউ-ভ্যাট অফিস।
এলটিইউ-ভ্যাট এর কমিশনার মতিউর রহমান নজরদারি ও বিশেষায়িত নিরীক্ষার বিষয়টি স্বীকার করে ইতিমধ্যে একাধিক কোম্পানির বড় ধরনের রাজস্ব অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছেন। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, আগেও প্রতিষ্ঠানগুলোতে মনিটরিং করা হতো। তবে বর্তমানে নীতিমালার আলোকে কার্যকরভাবে এ মনিটরিং করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিশেষায়িত নিরীক্ষার অংশ হিসেবে, প্রতিষ্ঠানের আমদানির তথ্য যাচাই, ব্যাংক হিসাব বিবরণী, ডিলারের সঙ্গে লেনদেনের তথ্য যাচাই, কোন দরে বিক্রি হচ্ছে আর কোন দর ভ্যাট অফিসকে দেখানো হচ্ছে, কাঁচামাল কোথা থেকে আসে কিংবা যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হচ্ছে কিনা - এসবের সঙ্গে এনবিআরের প্রতিমাসে দাখিল হওয়া রিটার্নের তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে। নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিবিড় পরীক্ষা করা হচ্ছে। এছাড়া আকস্মিক পরিদর্শনও করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে একাধিক কোম্পানির অনিয়নের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে।
বর্তমানে এলটিইউ-ভ্যাট বিভাগের অধীনে ১৭০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ১৫৬টি প্রতিষ্ঠান এ অফিসে ভ্যাট প্রদান করে। এগুলোকে বৃহত্ করদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এনবিআরের আদায়কৃত ভ্যাটের ৫৫ শতাংশই আসে এসব কোম্পানির কাছ থেকে। এর মধ্যে শীর্ষ ১০টি খাত হলো সিগারেট, মোবাইল ফোন কোম্পানি, ওষুধ, কোমল পানীয়, সিমেন্ট, প্রাকৃতিক গ্যাস, ব্যাংক, বিদ্যুত্ বিতরণকারী সংস্থা, সাবান কোম্পানি ও সিরামিক। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৩৬ হাজার ৯৭২ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর মধ্যে আবার ৪৮ শতাংশই আসে দুটি সিগারেট কোম্পানির কাছ থেকে। গ্যাস খাতের ১২ কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির (আইওসি) গ্যাস বিতরণকালে আদায়কৃত ভ্যাটসহ এ খাত থেকে আসে প্রায় ১৮ শতাংশ। এছাড়া ৫টি মোবাইল ফোন কোম্পানির কাছ থেকে ১২ শতাংশ, ব্যাংক খাত থেকে ৫ শতাংশ, ওষুধ খাত থেকে ৫ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতের আরো ১০৯টি ইউনিট থেকে আসে ১২ শতাংশ। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এসব কোম্পানির কাছ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে।
প্রসঙ্গত, বৃহত্ রাজস্ব প্রদানকারী অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই বড় অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকিরও অভিযোগ রয়েছে। গত কয়েকবছর থেকেই এ বিষয়ে নজরদারি বাড়িয়েছে এনবিআর। এর ফলে গ্রামীণ ফোনসহ চারটি মোবাইল ফোন কোম্পানির বিশাল অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন হয়েছে। বেশকিছু ইস্যু বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। এতে করে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট আটকা পড়ে আছে বলে জানা গেছে।
ইত্তেফাক/আনিসুর
