ক্রান্তিকাল বাংলাদেশের চিরায়ত নিয়তি। জন্মের হাজার বছর পূর্ব থেকে অধ্যাবধি এ নিয়তি বহমান। ক্রান্তিকালের ভয়াবহতার মাত্রা ভিন্ন রকম হলেও ৭১'র মুক্তিযুদ্ধ নিঃসংশয়ে সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ। বৃহৎ ধ্বংসযজ্ঞ ও রক্তগঙ্গা পেরিয়ে উত্থান এই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। জন্মগত পরিবেশ ও পরিস্থিতি এতোটাই নাজুক ছিল যে এই নবীন রাষ্ট্রটির ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব নিয়ে সংশয়ে ছিল অনেক রাষ্ট্র। তৎকালীন পরাশক্তি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার রক্তলব্ধ রাষ্ট্রটিকে 'তলাবিহীন ঝুড়ি' হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
যাইহোক, সকল অলীক কল্পনাকে মিথ্যে প্রমাণিত করে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জাতির পিতার হাত ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু দেশটি তিল তিল করে সর্বক্ষেত্রে একটি শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যাত্রা শুরু করে। তিনি অল্প দিনের মধ্যেই এক শক্তিমান জাতীয়তাবাদী নেতায় পরিণত হন এবং তৃতীয় বিশ্বের সকল জাতীয়তাবাদী নেতার প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দুতে আবির্ভূত হন। বিশ্ব মোড়লদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ঘোষণা দেন, ‘পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত; শাসক ও শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব সর্বদাই বিশ্বমোড়লদের চির শত্রু এবং সর্বশেষ পরিণতি নির্মম মৃত্যু। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও এ পরিণতির ব্যতিক্রম হয়নি। পার্থক্য শুধু একটাই পৃথিবীর ইতিহাসে নৃশংসতম পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের নির্মম শিকার হন তিনি, বাদ যায়নি শিশুসহ অন্তঃস্বত্তা নারীও।
৭৫'র এ জঘন্য হত্যাকাণ্ডটি স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়াবহতম ক্রান্তিকাল। যার মাধ্যমে দেশটি জন্মগত আদর্শ ভুলে বড় শক্তিগুলির তল্পি বাহকে পরিণত হয়। জনগণের ক্ষমতা চলে যায় বন্ধুকের নলে আর বুটের নিচে। ৯১'র দিকে জনগণের হাতে ক্ষমতা আসার পথ প্রশস্ত হয়। কিন্তু ৭৫-৯১ এই ১৬ বছরে দেশপ্রেমিক অগণিত মুক্তিযোদ্ধা ও নেতৃবৃন্দকে কারাগারে কিংবা বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে হত্যা করে দেশের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে দেশদ্রোহী, দালাল ও বিশ্বমোড়লদের চর।
তাই প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতাসীন হয় দেশবাসীর বৈধ ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত দেশীয় স্বার্থ বিক্রেতারা। দেশীয় স্বার্থ বিক্রির মাধ্যমে ক্ষমতার চকলেট চুষে খাওয়ার জন্যই শুধু গদিনাসীন হয় দেশীয় পতাকাধারী বিশ্বাসঘাতকেরা। এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায় খোদ বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে যখন তিনি বলেন ২০০১ সালে গ্যাস বিক্রি করতে রাজি হননি বলেই ক্ষমতায় আসতে পারেননি। এ থেকে এ কথাও প্রমাণিত হয় ক্ষমতা জনগণের হাতে বা ভোটে নেই। ক্ষমতা এমন এক অদৃশ্য শক্তির হাতে যার লেজুরবৃত্তি করাই দেশীয় শক্তিমানদের কাজ। এ অদৃশ্য শক্তি রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলও নিয়ন্ত্রণ করে তাদের বশংবদ দাসদের বিভিন্ন পদে পদায়নের মাধ্যমে। এহেন ক্রান্তিকাল শক্ত হাতে মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন শক্তিমান জাতীয়তাবাদী নেতা। অবশ্য আমার কাছে জাতীয়তাবাদী নেতার মানদণ্ড বৈশ্বিক শক্তি কর্তৃক জীবনাবসান। বৈশ্বিক মোড়লদের স্বার্থের বিপরীতে অবস্থান নিলেই জীবন সংশয়াপন্ন হতে পারে এবং দেশীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রায় ১৯ বার হত্যাকান্ডের মুখে পতিত হয়েছিলেন।
আসন্ন দিনগুলিতে এ বঙ্গভূমি হয়ত গুরুতর ক্রান্তিকালে উপনীত হতে চলেছে। এ পরিস্থিতির জন্য যতটা না আমরা দায়ী তার চেয়ে বহুগুন বেশি দায়ী বিশ্ব ব্যবস্থার পটপরিবর্তন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর শক্তিশালী 'এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা' ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বহুধাবিভক্ত নব উথিত শক্তির মাঝে বিভাজিত হচ্ছে। যার অনেকগুলি প্রদর্শনী কেন্দ্রের একটি আমাদের এই বঙ্গভূমি। বহুমাত্রিক প্রদর্শনীর একটি রোহিঙ্গা সমস্যা বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান হলেও অনেক বিষয়ই গোচরীভূত হচ্ছে না। তথাপি ব্যাপক ধ্বংসলীলা সংঘটনের জন্য ঘূর্ণিঝড় যেমন তার কেন্দ্রে শক্তি সঞ্চয় করে তেমনি ব্যাপক অস্থিতিশীলতার অনেকগুলি উপকরণ ইত্যবসরে ব্যাপক শক্তি সঞ্চয় করেছে। আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত সময়ের ব্যাপার। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের আরো দুই কোটি বাড়তি জনসংখ্যার চাপ সামলানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। জনসংখ্যা যেমন যথার্থ ব্যবহারের অভাবে সম্পদের পরিবর্তে আমাদের বোঝা হয়েছে তেমনি আমাদের প্রাকৃতিক ও সমুদ্র সম্পদও আমাদের বোঝা হয়েছে। কারণ বৈদেশিক হায়েনাদের চোখ পড়েছে আমাদের সম্পদের উপর।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই সমুদ্র সম্পদের মালিকানা আমরা অর্জন করেছি তার সুদক্ষ নেতৃত্বেই এই সম্পদ রক্ষিত হবে বলে দৃঢ় আশাবাদ রাখি। ভৌগলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সেই সাথে ধাবমান ঘোড়ার ন্যায় অগ্রসরমান অথনীতিকে সচল রাখার চ্যালেঞ্জকে জয় করে অত্যাসন্ন ক্রান্তিকাল মোকাবেলাই হবে বর্তমান সরকারের স্মরণীয় সফলতা।
লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা
