বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরিকৃত অর্থ উদ্ধার সম্পর্কিত কার্যক্রমের অগ্রগতি

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৭, ২১:৫৩
 
সম্প্রতি কতিপয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদে কিছু বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের সংবাদ চুরিকৃত অর্থ উদ্ধার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। 
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হতে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ চুরির বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ চক্রের অপরাধ হিসেবে প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন পক্ষের তদন্তে পরিলক্ষিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের বিভ্রান্তি পরিহারের লক্ষে রিজার্ভ চুরির অর্থ উদ্ধারের সর্বশেষ অগ্রগতির বিষয়টি সকলের জ্ঞাতার্থে নিম্নে তুলে ধরা হলো- 
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে সাইবার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে পাচারকৃত ৮১ মিলিয়ন ইউএস ডলারের মধ্যে ৪.৬৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ফিলিপিনো পেসো ৪৮৮.২৮ মিলিয়ন (সর্বমোট আনুমানিক ১৪.৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ফিলিপাইন আদালতের আদেশে বাংলাদেশ ব্যাংককে ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর ফেরত প্রদান করা হয়েছে। এ অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়ায় ফিলিপাইন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহ প্রয়োজনীয় আইনী সহযোগিতাসহ সকল ধরণের সহযোগিতা প্রদান করে আসছে। 
 
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পারস্পরিক আইনগত সহায়তা অনুরোধে ফিলিপাইনের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিজ বর্তমানে বাংলাদেশকে সকল ধরণের আইনী সহায়তা প্রদান এবং ফিলিপাইনের আদালতে বাংলাদেশের পক্ষে সরকারি আইনজীবী নিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থ ফেরতে সহায়তা প্রদান করছে। এ ছাড়া ফিলিপাইনের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিবি) বাংলাদেশ ব্যাংককে ০.০৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হ্যাকিংয়ের অব্যবহিত পর ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই ফেরত প্রদান করে। 
 
হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরিকৃত অর্থের অবশিষ্ট অংশ দ্রুত উদ্ধার এবং তা ফেরত আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন আইনী কার্যক্রম বর্তমানে ফিলিপাইনে চলমান রয়েছে। (ক) সোলাইরি নামক ক্যাসিনোতে যে ২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার স্থানান্তরিত হয় তা ফিলিপাইনের আদালত কর্তৃক ফ্রিজ করা হয় এবং এ বিষয়টি বর্তমানে ফিলিপাইনের সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। (খ) ক্যাসিনো ব্যবসায়ী কিম অং এর দুইজন কর্মচারীর হিসাবে ১.২ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থের সন্ধান পাওয়া গেছে এবং ফিলিপাইনের আদালত কর্তৃক এসেস্ট প্রিজারভেশন অর্ডার জারি  করা হয়েছে অর্থাৎ এ অর্থ আদালতের আদেশ ব্যতীত সংশ্লিষ্ট হিসাব হতে কোন পক্ষই উত্তোলন করতে পারবে না। এ পরিমাণ অর্থ বাজেয়াপ্তকরণপূর্বক বাংলাদেশ ব্যাংককে ফেরত প্রদানের বিষয়টি ম্যানিলার রিজিওনাল কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। 
 
(গ) মানি রেমিটেন্স কোম্পানি পিলরিম এর নিকট ১৭ মিলিয়ন ডলার রক্ষিত রয়েছে মর্মে বিভিন্ন পর্যালোচনা ও অনুসন্ধানে পরিলক্ষিত হয়েছে। এ পরিমান অর্থ পিলরিম এর নিকট হতে উদ্ধারের জন্য ফিলিপাইনের এন্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল  কর্তৃক সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ মামলা দায়েরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ইতোমধ্যে পিলরিম ও এর স্বত্বাধিকারীদের সম্ভাব্য বাজেয়াপ্তকরণযোগ্য স্থাবর/অস্থাবর সম্পদ এন্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল কর্তৃক নিরূপন করা হয়েছে। (ঘ) বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হিসাব হতে অর্থ চুরির বিষয়ে রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিবি) এর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং এক্ষেত্রে ব্যাংকের দায় রয়েছে। 
 
সাইবার হ্যাকিং এর মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থের অবশিষ্ট ৬৬.৪ মিলিয়ন ডলার আইনী প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশের মাধ্যমে বর্ণিত উৎসসমূহ হতে উদ্ধারের পর যে পরিমাণ অর্থ অনাদায়ী থাকবে তা রিজল ব্যাংক এর নিকট হতে আদায়ের আইনী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। 
 
ফিলিপাইনের আইনী প্রক্রিয়া সম্পন্নকরণের মাধ্যমে আদালতের চূড়ান্ত আদেশ প্রাপ্তি সাপেক্ষে বর্ণিত অবশিষ্ট অর্থ উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ফিলিপাইন সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় আইনী প্রক্রিয়ায় এ অর্থ দ্রুত ফেরত পাওয়ার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে যা চলমান রয়েছে। 
 
উল্লেখ্য, সাইবার হ্যাকিং এর মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থের অবশিষ্ট অংশ দ্রুত উদ্ধার ও তা ফেরত আনা এবং তদন্ত কার্যক্রমসহ বিভিন্ন আইনগত বিষয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথেও নিয়মিত আলোচনা চলছে। সম্প্রতি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সুইফট এর মধ্যে অনুষ্ঠিত এক সভার সূত্রে একটি ত্রিপক্ষীয় স্টেটমেন্ট জারী করা হয়েছে যাতে বাংলাদেশের চুরিকৃত অর্থ উদ্ধার এবং দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। 
 
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হতে হ্যাকিং এর মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক, এপিজি, এগমন্ট গ্রুপ, ইন্টারপোলসহ বিভিন্ন সংস্থার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। 
 
বিভিন্ন পক্ষের তদন্ত ও ১৪.৫৪ মিলিয়ন ডলার ফেরত প্রদানে ফিলিপাইনের আদালতের আদেশে সাইবার হ্যাকিং এর মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপাইন, চীন, শ্রীলংকাসহ বাংলাদেশে সাইবার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের সাথে বিভিন্ন পক্ষের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের তদন্তকারী সংস্থার তদন্তাধীন রয়েছে এবং এক্ষেত্রে আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ এর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ও বাংলাদেশে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হলেই শুধুমাত্র অপরাধী শনাক্তকরণসহ সকল তথ্য যথাসময়ে প্রকাশযোগ্য হবে। 
 
এখানে উল্লেখ্য যে, ফিলিপাইনের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস কর্তৃক ফিলিপাইনের আদালতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হতে হ্যাকিং এর মাধ্যমে অর্থ পাচারের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ৭ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল কেস দায়ের করা হয়েছে।
 
 
ইত্তেফাক/ইউবি