ঘড়ি বিক্রির ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান টাঁকশাল

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৭, ২০:৩৮
মাহবুব হাসান একসময় ছিলেন সফটওয়্যার ডেভেলপার। সেখান থেকে হয়েছেন উদ্যোক্তা। গড়ে তুলেছেন টাঁকশাল ডট কম নামে নিজের প্রতিষ্ঠান। নিজের মেধা ও শ্রমের পর্যাপ্ত ব্যবহার করে আজ তিনি সফল উদ্যোক্তা। ইত্তেফাক অনলাইনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানান তার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প। 
 
আপনার উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প জানতে চাই ?
 
আসলে আমার উদ্যোক্তা হবার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। আমার ক্যারিয়ার শুরু হয় একটি পত্রিকায় সাংবাদিকতার মাধ্যমে। সেখানে কিছুদিন কাটানোর পরে আমি বুঝতে পারি যে আমি আসলে কিছু শিখছি না, তাই চাকরি ছেড়ে দেই। তারপরে সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে কাজ করা শুরু করি। চাকরি করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে আমার পুরোপুরি মেধা ও শ্রম আসলে কাজে লাগাতে পারছি না। তাই আমার কাছে মনে হয়েছে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান খুলে ফেলি যেখানে আমি আমার মেধা ও শ্রমের পর্যাপ্ত ব্যবহার করতে পারবো।
 
কোন ভাবনা থেকে আপনাদের এই ই-কমার্স প্রকল্প শুরু করেন? প্রথমে কী কী সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন?
 
নিজে কিছু একটা করব, উদ্যোক্তা হব, ব্যবসায়ী হব, সেরা ধনীদের একজন হব, সুপারম্যান হব, সুপার হিরো হব। ছোট বেলার এমন স্বপ্নগুলো আমি কবরে পাঠাইনি। ছোট বেলা যে স্বপ্ন গুলো দেখেছি আমি সেগুলো লালন করেছি। অনিশ্চয়তা দেখে ইদুরের গর্তে মুখ লুকিয়ে বলিনি চাকরিই তো ভাল। মাস গেলেই বেতন। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য, নিজে কিছু করার জন্য চেষ্টা করেছি বিফল হয়েছি, আবার করেছি। কেউ কেউ দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন এই চাকরি নামক নিরাপত্তার খোঁজে। কখনওবা নিজেকে সপে দিয়েছেন মৃত্যুর মুখে কিংবা হারিয়েছেন শেষ সম্বল ভিটা মাটি টুকুও প্রতারণায় পড়ে। কিন্তু আমি তাদের মত হইনি। আমি ঝুঁকি নিয়েছি। একটা ঝুঁকি নিয়ে যদি জীবনের স্বাদ গ্রহণ করা যায়, স্বপ্নগুলোকে আলোর মুখ দেখানো যায়, দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যায় তাহলে কিসের এত ভয়? রোম যেমন একদিনে তৈরি হয়নি সফলতাও একদিনে আসবে না এটুকু বুঝতে কেন এত অসুবিধা হয়? তাই আমি টাঁকশাল ডট কম শুরু করি আর আমার স্বপ্নকে বাস্তবের রুপ দিতে শুরু করি। শুরুতে যে সব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি আমি দৃঢ়তার সঙ্গে সেগুলো মোকাবিলা করেছি। মার্কেটিং করা, পেমেন্ট সিস্টেম নির্বাচন করা, পণ্য ডেলিভারি নিয়ে ভাবা, কাস্টমার সাপোর্ট এসব সমস্যা সবারই কম বেশি থাকে।
 
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কী কী সমস্যা বাংলাদেশে রয়েছে? আপনি কীভাবে সেগুলো সমাধান করলেন?
 
বাংলাদেশে ই–কমার্সে লেনদেন এর সিংহভাগ এখনো ক্যাশ–অন ডেলিভারি প্রক্রিয়াতে হয়ে থাকে। কার্ডে লেনদেনএখনো অনেক কম। আমাদের কুরিয়ার সার্ভিস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ই-কমার্স ওয়েবসাইটের মালিক পক্ষ এবং ই-কমার্স পেমেন্ট গেটওয়ে প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সমূহকে এক সাথে কাজ করতে হয়েছে এই সমস্যা সমাধানে। প্রত্যেকে তাদের নিজেদের অবস্থান থেকে অনলাইনে কার্ডে পেমেন্ট করাকে উৎসাহিত করতে হবে। তাহলে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি। এতে প্রত্যেক পক্ষই উপকৃত হবে এবং কার্ডে লেনদেন বাড়বে বলে আমি বিশ্বাস করি।  তবে এ যাত্রায় সমস্যা রয়েছে, এখনো আমাদের সবগুলো ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড অন করে (চালু) রাখে না। ফোন করে অন করাতে হয়। এই বিষয় গুলোর যত দ্রুত সমাধান করা যাবে ততই আমরা ই-কমার্সের পরিপূর্ণ সুফল ভোগ করতে পারব। বাংলাদেশে ই– কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সাধারণ অভিযোগ হচ্ছে যে পেমেন্ট গেটওয়ে সেবাদানকারি প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চহারে চার্জ করে। এক্ষেত্রে আমরা যদি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে নজর দিই তাহলে বুঝতে পারব আসলে আমাদের স্থানীয় বাজারে এর হার বেশি কিনা। এটাও সত্যি যে কিছু প্রতিষ্ঠান উচ্চ হারে চার্জ করছেন। তবে হ্যা বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পূর্ণ রুপে পেমেন্ট সুইচ চালু  করলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে। ভিসা ও মাস্টার কার্ডের খরচ অনেক কমে আসবে। এতে করে সবগুলো ব্যাংক একটি পদ্ধতির মধ্যে চলে আসবে।
 
আপনি কাজের জন্য এই সেক্টরটিকেই কেন বেছে নিলেন? 
 
এখন চারিদিকে প্রচুর দোকান। আপনি যে পন্যেরই ব্যবসা শুরু করুন না কেন আপনি একাই সেই ব্যবসা করছেন না, আছে আরো অনেক বিক্রেতা। তাই আলাদাভাবে নজরে পড়তে আপনার পণ্যকে হতে হবে যথেষ্ট আলাদা। ভিন্নতাই হবে একমাত্র কৌশল যা ক্রেতাকে হাজার অনলাইন শপের ভিড়ে ফিরিয়ে আনবে আপনার কাছে। প্রতিযোগিতার বাজারে নিজের অনলাইন ব্যবসায়কে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে একটাই উপায়। আপনাকে থাকতে হবে সদা উদ্যমী। অলসতা ভুলে নিতে হবে কঠিন পরিশ্রমের জন্য মানসিক প্রস্তুতি। ব্যবসায় করবো করবো ভেবে অনেকেই করে বসেন রাজ্যের ভুল। আপনার সেই ভুলের ফায়দা নিয়ে অন্যপ্রতিষ্ঠান ভোগ করে মুনাফা। আমি কাউকে এই সুযোগ দিতে চাইনি। তাই আমিই হাজির হয়েছি টাঁকশাল ডট কম নিয়ে। যে কোন ধরনের ঘড়ির সমারোহ পাবেন আমার এই অনলাইন শপে। আপনার হয়তো সাধ আছে কিন্তু সাধ্য নাই। আমি আপনার সেই ইচ্ছাও পূরণ করে দেয়ার চেষ্টা করেছি। আপনি জামানত ছাড়াই আমার অনলাইন দোকান থেকে আপনার পছন্দের ঘড়িটি কিনতে পারবেন। এটি একটি নতুন আইডিয়া যা আমি বাস্তবে রুপ দিতে চেয়েছি।
 
আশানুরূপ সাড়া পেয়েছেন কী? সম্ভাবনা কেমন দেখছেন? 
 
একটুতে হাফিয়ে উঠা বাঙালি আমরা। কোন কিছুতে দীর্ঘক্ষণ স্থির রাখতে পারি না নিজেকে। একদণ্ড সুস্থির হয়ে বসার মত সময়ও যেন নেই। কৌতুহলের জন্য যদি নোবেল দেয়ার ব্যবস্থা থাকত তবে নিশ্চিত বাঙালি সবার প্রথমে অর্জন করত। রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের বাতি লাগানোর দৃশ্যও কৌতুহলী বাঙালি হা করে গিলতে পারে। কিন্তু আমি বাঙালির এই চিরচরিত চেহারা পাল্টে দিতে চাই। আমি যেখানেই গিয়েছি সেখানেই সাড়া পেয়েছি। আমার নতুন আইডিয়া বিশেষকরে যুব সমাজের কাছে চরম গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
 
আপনাদের এখন পর্যন্ত কি ধরনের সফলতা এসেছে? 
 
আমরা সাধারণ একটি আউট সোসিং কোম্পানি থেকে বাংলাদেশের বাজারে অনলাইন ঘড়ি বিক্রির বড় প্লাটফর্মের পরিণত হতে যাচ্ছি।  আমরা ঘড়ি বিক্রির ক্ষেত্রে গুণগত মান এবং অভিনব পন্থা ব্যবহার করেছি। এখন কোন জামানত ছাড়াই বাকিতে একজন তার প্রিয় শখের ঘড়ি ক্রয় করতে পারে।
 
আপনার অনুপ্রেরণা কে বা কারা? 
 
 মারিও কুওমো এর কথা দিয়েই শুরু করি। মাত্র দুটি পন্থায় সফল হওয়া যায়! একটি হচ্ছে সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা, ঠিক যা তুমি করতে চাও। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া। আমি এটি সব সময় মেনে চলার চেষ্টা করি। তবে একজনের কথা বলতে ইচ্ছা করছে যাকে দেখে আমার মনে আরও এগিয়ে যাওয়ার বাসনা তৈরি হয়েছে। তিনি আর কেউ নয় তিনি বাংলাদেশের বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ সংসদ সদস্য জুনাইদ আহমেদ পলক। ২০১৬ সালের মার্চে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম  তাকে ইয়াং গ্লোবাল লিডার ২০১৬' হিসেবে মনোনীত করে। আমিও এমন কিছু স্বপ্ন দেখি। অনুপ্রাণিত হই কিভাবে তিনি এগিয়ে গেলেন, কিভাবে তিনি কঠিন সময় সামলে এগিয়ে চলেন।
 
 
ইত্তেফাক/ইউবি