১১ ঘণ্টায় দুই জোড়া খুন

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৭, ২৩:৫৩

খোদ রাজধানীতেই মাত্র ১১ ঘন্টার ব্যবধানে দুই জোড়া খুন হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় কাকরাইলে খুন হন মা ও ছেলে। এই খবরের রেশ কাটতে না কাটতেই বৃহস্পতিবার সকাল খবর পাওয়া যায় বাড্ডায় খুন হয়েছেন বাবা আর মেয়ে। দুটি হত্যাকাণ্ড পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থেকেই ঘটেছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। তবে অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, যে কারণেই এই হত্যাকাণ্ড দুটি ঘটে থাকুক না কেন, এটা রাজধানীবাসীর জন্য খারাপ বার্তা দেবে। বেশ কিছুদিন হলো রাজধানীতে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। হঠাত্ করে এই দুটি জোড়া খুনের ঘটনা এখন সবার মুখে মুখে। দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে হত্যাকাণ্ড দুটি।
 


বাড্ডায় বাসায় বাবা-মেয়ে খুন

স্ত্রী আটক, পারিবারিক দ্বন্দ্বকে দায়ী করছে পুলিশ

বাড্ডায় বাসার ভেতরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বাবা এবং মেয়ে। উত্তর বাড্ডার ৩০৬ ময়নারবাগ পাঠানবাড়ী কবরস্থানের মসজিদ সংলগ্ন বাড়ির তিন তলায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন— জামিল শেখ (৪১) ও মেয়ে নুসরাত (৯)। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালের দিকে নিহত জামিল শেখের স্ত্রী আরজিনা বেগম কান্নাকাটি শুরু করলে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি প্রকাশ পায়। বুধবার রাত থেকে গতকাল সকালের মধ্যে কোনো এক সময়ে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ ধারণা করছে। হত্যার কারণ হিসেবে পারিবারিক দ্বন্দ্বকে দায়ী করছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরজিনাকে আটক করা হয়েছে।    তবে ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছে ওই বাড়িতে সাবলেটে থাকা এক যুবক। পুলিশ তাকে ধরতে অভিযান শুরু করেছে। বাড়ির মালিক দুলাল পাঠানের স্ত্রী নাসিমা দুলাল জানান, রাত ১০টার পর বাড়ির প্রধান গেট লাগানো থাকে। বাইরের লোকের ভেতরে ঢোকার সুযোগ নেই।

জানা গেছে, তিনতলা বাড়ির ছাদের একটি রুম ভাড়া নিয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন জামিল। রুমের ভেতরে জামিলকে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া গেলেও মেয়ে নুসরাতের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পায়নি সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট। ধারণা করা হচ্ছে, নুসরাতকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। নিহত জামিল শেখ পেশায় প্রাইভেটকার চালক। তার ছোট ছেলে আলফি। বয়স ৫ বছর। জামিল শেখের বাবার নাম বেলায়েত শেখ। গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের বনগ্রামে। পুলিশ বাবা-মেয়ের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় জানান, হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক কোনো দ্বন্দ্ব আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ জন্য আরজিনাকে আটক করা হয়েছে। স্ত্রীকে সন্দেহ করার কারণ জানতে চাইলে কৃষ্ণপদ রায় বলেন, কারণ তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তাই ধারণা করা হচ্ছে, ঘরের ভেতর থেকে কেউ খুনিকে সহযোগিতা করেছে। তা না হলে এভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব হতো না।

পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মোস্তাক আহমেদ জানান, আরজিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

কী ঘটেছিল ?

বাড়ির দ্বিতীয় তলার ভাড়াটিয়া জ্যোস্না বেগম। তিনি বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৬টার দিকে কান্নার শব্দ পাইয়া সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠি। গিয়া দেখি আরজিনা দরজার সামনে হেলান দিয়া বইসা আস্তে আস্তে কান্নাকাটি করতাছে। আমি কইলাম, ওই কি হইছে? হে তখন কয়, ঘরে চারজন ডাকাত আইছিল, নুসরাতের বাপরে মাইরা ফালাইছে। দরজা দিয়া ভিতরে তাকাইয়া দেখি খাটের উপরে বাপ-বেটি পইড়া রইছে। এরপর আমি জলদি বাড়িওয়ালিকে ডাকতে যাই। বাড়িওয়ালি আসার পর আমরা ঘরে ঢুকে দেখি জামিলের মুখের ওপরে একটা কাপড় দেওয়া। তখন বিছানার কাপড়টা টান দিতেই দেখি রক্ত। এরপর জোরে চিত্কার মারে বাড়িওয়ালি। তারপর সবাই উপরে চলে আসে।’

তিনি আরো বলেন, তারা যখন ঘরে ঢুকে লাশ দেখে চিত্কার দিয়েছিল, তখন ছোট ছেলে আলফি বাবার পায়ের কাছে বসে কাঁদছিল।

এরপর পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। একই সঙ্গে আরজিনা ও আলফিকেও থানায় নিয়ে যায়।

বাড়ির মালিকের স্ত্রী নাসিমা দুলাল বলেন, জ্যোস্না বেগমের কাছ থেকে এই খবর শুনে দৌড়ে ছাদে আসি। উপরে গিয়ে দেখি আরজিনা মুখের উপর ওড়না দিয়ে বসে কান্নাকাটি করছে। এরপর ঘরে গিয়ে জামিল ও নুসরাতের লাশ দেখে ভয়ে চিত্কার দিয়ে উঠি। তার চিত্কারে আশপাশের মানুষ ছুটে আসে।

তিনি আরো বলেন, যখন আরজিনার কাছে জানতে চাই, এসব কীভাবে হলো?  আরজিনা বলে, রাতে চারজন ডাকাত আসছিল। তারাই তার স্বামী আর মেয়েকে মেরে ফেলেছে।

সম্পত্তি ও পারিবারিক বিরোধ নিয়েই তদন্ত

কাকরাইলে মা-ছেলে খুন

ইত্তেফাক রিপোর্ট

রাজধানীর কাকরাইলে বাড়িতে ঢুকে মা-ছেলে খুনের ঘটনায় চারজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তদন্তকারীরা বলছেন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা সম্পত্তির বিরোধ থেকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। বিপুল সম্পত্তির মালিক গৃহকর্তা আব্দুল করিম একাধিক বিয়ে করেছেন। তার সর্বশেষ স্ত্রী কয়েকদিন আগে গিয়ে প্রথম স্ত্রীকে ধমকেছেন, হত্যার হুমকিও দিয়েছেন। এই তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ করিমের ছোট স্ত্রী শারমিন আক্তার মুক্তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এর আগে করিম ছাড়াও বাড়ির কেয়ারটেকার নোমান ও গৃহকর্মী রাশিদাকে আটক করেছে পুলিশ।

গত বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে কাকরাইলে রাজমনি সিনেমা হলের পশ্চিম দিকে রাজমনি কার সেন্টার ও বায়রা ডাটাবেইজ প্রতিষ্ঠানের মাঝের গলিতে আব্দুল করিমের বাড়িতে খুন হন তার স্ত্রী শামসুন্নাহার ও ছেলে সাজ্জাদুল করিম শাওন। বাড়ির পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে ধারাল অস্ত্রের আঘাতে মা ও ছেলেকে হত্যা করা হয়। শামসুন্নাহারের লাশ শোবার ঘরে ছিল, সিঁড়িতে পড়ে ছিল শাওনের লাশ। দুটি মৃতদেহের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেছেন রমনা থানার এসআই আতোয়ার হোসেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘শাওনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে। শামসুন্নাহারের গলাকাটা ছাড়াও থুঁতনি, বুক ও পেটে ছুরিকাঘাতের জখম রয়েছে।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় ইত্তেফাককে বলেন, ‘বাড্ডা আর কাকরাইলের দুটি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই। তবে দুটি হত্যাকাণ্ডেই পারিবারিক ক্ষোভ-কলহ, সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা বা সম্পর্কের টানাপোড়নের ঘটনা থাকতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি। তবে তদন্তে সবকিছু বেড়িয়ে আসবে।’

গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়নি।

নিহত শামসুন্নাহার ব্যবসায়ী করিমের প্রথম স্ত্রী। তার বড় দুই ছেলে লন্ডন ও কানাডা থাকেন। আর চার বছর আগে দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছে করিমের। এরপর তিনি তৃতীয় বিয়ে করেন অভিনয় শিল্পী শারমিন আক্তার মুক্তাকে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপ-কমিশনার নাবিদ কামাল বলেন, দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর চার বছর আগে তিনি মুক্তাকে বিয়ে করেন। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মুক্তাকে আটক করা হয়েছে।

ওই সময় ঘরে থাকা গৃহকর্মী রাশিদার দাবি, তিনি রান্নাঘরে কাজ করার সময় হঠাত্ বাইরে থেকে কেউ দরজা আটকে দিয়েছিল। পরে দারোয়ান নোমান ছিটকিনি খুলে দিলে তিনি বেরিয়ে আসেন। ততক্ষণে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে খুনিরা পালিয়ে গেছে। ভবনের নিচে অফিস এবং পাশে করিমের আরেকটি ভবনের নিচে দোকান থাকলেও কেউ কিছু টের পায়নি।

পাশের একটি ভবনের দারোয়ান বলেন, করিম সাহেবের দুটি ভবনের একজনই দারোয়ান নোমান। সে তো শুধু দারোয়ানগিরিই করে না, ভাড়া ওঠানো থেকে শুরু করে বাড়িওয়ালার বাজারও করে। তিনি বলেন, তারা বড়লোক। ঢাকায় তিন-চারটি বাড়ি ছাড়াও শ্যামপুরে আড়ত আছে। তিনটি বিয়ে করেছেন। তৃতীয় স্ত্রীর ভাইদের সঙ্গে ঝামেলার কথাও শুনেছি।

পুলিশ কর্মকর্তা নাবিদ কামাল বলেন, সবগুলো বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রথম স্ত্রীর ঘরে তিন ছেলে রয়েছে। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরেও রয়েছে একটি ছেলে। আর ছোট স্ত্রীর কোনো সন্তান নেই।

ইত্তেফাক/নূহু