আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংকট সমাধানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে: ড. আতিউর

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০১৭, ১৮:৫৫
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে এশীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সংযুক্তি জরুরি হয়ে উঠলেও আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংকট এক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোমবার নেপাল-চায়না ফ্রেন্ডশিপ ফোরামের উদ্যোগে কাঠমণ্ডুতে আয়োজিত ‘কনট্যুরস অফ ওয়ান বেল্টওয়ান রোড (ওবিওআর) ইনিশিয়েটিভ ফর সাউথ এশিয়া’ অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, বৃহত্তর জনস্বার্থে এসব সংকট মোকাবিলায় আমাদের সবাইকে একসঙ্গে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে।
 
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেপালের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহেন্দ্র বাহাদুরপান্ডে। প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারত, চীন এবং পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞরা। এদের মধ্যে ছিলেন নেপাল ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. শঙ্কর শর্মা, দিল্লীর রিসার্চ এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম ফর ডেভেলপিং কান্ট্রিজের পক্ষ থেকে অধ্যাপক ড. প্রবীর দে, চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শুচাংহি, এবং ইসলামাবাদের সাংবাদিক শাফকাত মুনীর। 
 
বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাবস্থাতে দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশ মন্দা মোকাবিলার সক্ষমতা দেখিয়েছে এবং প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে পেরেছে বলে মতপ্রকাশ করেন ড. আতিউর। তিনি বলেন যে বেশ কিছুকাল ধরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর সহায়তা কমে আসছিলো, আর এই সময়েই চীন একটি নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোকে ঋণ সহায়তা দিতে শুরু করেছে।
 
এই প্রেক্ষাপটে চীনের নেতৃত্বে ওয়ান বেল্টওয়ান রোড (ওবিওআর) উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যার মাধ্যমে এশিয়া, পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের ৬৫টি দেশের ৪.৪ বিলিয়ন মানুষের সংযোগ ঘটবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর এই সুবর্ণ সুযোগ নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানো উচিৎ, যাতে করে ইতোমধ্যেই অর্জিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে তারা আরও এগিয়ে যেতে পারে। তবে এজন্য চীনকেও দক্ষিণ এশীয় পণ্য তার বাজারে ঢোকার সুযোগ করে দিতে হবে।
 
ড. আতিউর যোগ করেন,  দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে বেশ কিছু পারস্পরিক রাজনৈতিক সংকট রয়েছে যেগুলোর সমাধানের জন্য সুবিবেচনা ভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর ইস্যু ও বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে চলমান রোহিঙ্গা সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, আমরা আশাবাদী যে এক সময় এসব ‘রাজনৈতিক সংকটের’ চেয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার ‘অর্থনৈতিক সুফলগুলোই’ আমাদের কাছে বড় হয়ে উঠবে।
 
 তিনি যোগ করেন,  চীনের সাথে এই অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক যুক্ততার কারণে অদূর ভবিষ্যতেই ‘সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য’এমন সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বর্তমানে চীন ও ভারতের মধ্যে প্রতিবছর ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমমূল্যের পণ্য লেনদেন হচ্ছে। চীন বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ বাণিজ্য সহযোগী এবং শ্রীলঙ্কা ও নেপালের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ বাণিজ্য সহযোগী।
 
ওবিওআর-এর আওতায় যে ধরণের আন্তঃদেশীয় প্রকল্প প্রস্তাব করা হচ্ছে সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সকল দেশের অংশীদারদের মতামত নেয়ার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন ড. আতিউর। বিবিআইএন-এমভিএ (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে বাধাঁহীনসড়ক যোগাযোগবিষয়ক চুক্তি) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সকল দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যে উদ্যোগগুলো নিয়েছে সেগুলো এক্ষেত্রে অনুসরণীয়। ওবিওআর-এর মতো আন্তঃদেশীয় যুক্ততা বৃদ্ধির উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সুবিবেচনাভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজনীয় বলে ড. আতিউর অভিমত ব্যক্ত করেন। তবে এশিয়ার দুই বৃহৎ দেশ- ভারত ও চীনকে এক্ষেত্রে উদার কূটনৈতিক জায়গা থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। কাজেই চলমান রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা করে যাতে দ্রুত আঞ্চলিক সংযুক্তি বৃদ্ধির উদ্যোগগুলোকে বাস্তবায়িত করা যায় সে জন্য এই দুটি দেশকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। 
 
অধ্যাপক শুচাংচীনের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড- কে উদার অর্থনীতি, সাধারণ নিরাপত্তা আর সহযোগিতামূলক সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় বহুপাক্ষিক উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন। পরিশেষে ড. আতিউর এশিয়ার দেশগুলোকে সকলের সাধারণ সমৃদ্ধির জন্য একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান। এমনকি অপেক্ষাকৃত ছোট দেশগুলোও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে তিনি মনে করেন।
 
ইত্তেফাক/সাব্বির