সফিকুল (৯) আর রফিক (১১) এক বস্তা ভাঙ্গারি কুঁড়িয়ে ধরাধরি করে নিয়ে চলেছে। এখান থেকে একটু দূরে গিয়ে তারা কাগজ, বোতল আর বিভিন্ন রকমের ভাঙ্গারি আলাদা করবে। তারপর তা বিক্রি করবে। এক বছর ধরে তারা যাত্রাবাড়ির মাতুয়াইল এলাকায় ময়লার ডাম্পিং স্টেশনে ভাঙ্গারি কুঁড়ানোর কাজ করছে। এ কাজে তারা কিভাবে আসলো এমন প্রশ্নের জবাবে একজন জানায়, সে এসেছে বাবার সাথে। অন্যজন বলে সে এসেছে প্রতিবেশির সাথে। এখান থেকে কুঁড়ানো ভাঙ্গারি বিক্রি করে তারা প্রতিদিন দুইশ থেকে তিনশ টাকা আয় করে। কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়তই তাদের হাত- পা কাটে। ভেজা থাকার জন্য জ্বর হয় আর শরীর ব্যথা তো আছেই।
মাতুয়াইল এলাকায় ময়লার ডাম্পিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেল, এখানে নারী ও পুরুষের সাথে নানা ঝুঁকি নিয়ে ৮ থেকে ১৭ বছরের শিশুরা কাজ করছে। তাদের আত্মরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। শুধু পায়ে এক জোড়া পুরানো জুতা ছাড়া। এই জুতাজোড়াও তারা হয় ময়লার ডামিপং স্টেশন থেকে কুঁড়িয়ে পেয়েছে নয়তো পুরানো কিনেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই দেশে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশু অধিকার দিবস।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এই ডাম্পে সকাল সাতটা থেকে দুপুর একটা আবার একটা থেকে ৪টা /৫টা পর্যন্ত নিবন্ধিত তিন হাজারের অধিক শ্রমিক ভাঙ্গারি কুঁড়ানোর সাথে জড়িত বলে জানান স্থানীয় ইমাম ও এখানে কাজ করা একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার এডভোকেসি অফিসার আবদুল আজিম। তিনি বলেন, আরো দুই হাজার শ্রমিক এখানে অন্য কাজ করেন। জানা যায়, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ও শিশু কাজ করছে। ভাঙ্গারি কুঁড়ানোর কাজ সরকারের ঝুঁকিপূর্ণ তালিকাভুক্ত থাকলেও শিশুরা এই কাজ করছে নিরাপত্তাকর্মীদের চোখের সামনে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহকারি প্রকৌশলী এএসএম আব্দুল্লাহ হারুর ইত্তেফাককে বলেন, তারা জানেন শিশুরা এখানে কাজ করছে। কিন্তু নিতান্ত দরিদ্রশিশুর মানবিক দিক বিবেচনা করে তারা কাজে বাধা দেন না।
এমন শিশুদের কি শারীরিক সমস্যা হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, যেকোনো সময় হেপাটাইটিস বি, এইচআইভি-এইডস হতে পারে এবং তাদের থেকে পরিবারে ও অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে যেতে পারে। আর যেকোনো সময় দুর্ঘটনায় পঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনাতো আছেই।
এখানের শিশুদের কিছু অধিকার নিয়ে কাজ করছে গ্রাম-বাংলা উন্নয়ন কমিটি। এর নির্বাহী পরিচালক এ কেএম মাকসুদ জানান, ২০১৫ সালের এক জরিপ মতে, গত পাঁচ বছরে এই কাজে দুই জনের মৃত্যু হয়। যার মধ্যে একজন শিশু। ১০জন সম্পূর্ণরূপে প্রতিবন্ধী হয়। যার মধ্যে ৮জনই শিশু। ৬/৭ বছরের শিশুরা এখানে কাজ করছে।
এই শিশুদের জন্য অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের প্রয়োজন বলে মনে করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, বিষয়টি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এ ব্যাপারে মহিলা ও শিশু বিষয়ক সচিব নাসিমা বেগম এনডিসিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি তাত্ক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
শিশুর অধিকার সুরক্ষায় আইন প্রয়োগের দাবি
শিশুর অধিকার সুরক্ষায় শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসনে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন প্রয়োগের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এবং সেভ দ্য চিলড্রেন-এর সহায়তায় ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ‘শিশুর অধিকার সুরক্ষায় শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসন’ শীর্ষক গণশুনানিতে এই দাবি জানানো হয়। সভায় বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসনে সরকার আইন প্রণয়নসহ বিভিন্ন পরিপত্র জারি করেছে। কিন্তু এগুলো প্রয়োগে যথাযথ নজরদারির অভাব রয়েছে।
ইত্তেফাক/নূহু
