দক্ষ মানব সম্পদ উন্নয়নই বাংলাদেশের বিদ্যুত্ জ্বালানি খাতের সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। বিগত কয়েক বছরে দেশের বিদ্যুত্ এবং জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে উঠেনি। সঙ্গত কারণে এখনও কারিগরি সহায়তার জন্য বিদেশ নির্ভরতা কাটছে না। সরকারের নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণকেও পর্যাপ্ত মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। গতকাল সোমবার জ্বালানি এবং বিদ্যুত্ গবেষণা কাউন্সিল (ইপিআরসি) আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এ কথা বলেন।
সরকারের তথ্য মতে, এখন দেশে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতার কেন্দ্র রয়েছে। আগামী ২০২১ সালে এই ক্ষমতা আরো অন্তত ৫ হাজার মেগাওয়াট বৃদ্ধি পাবে। ক্রমান্বয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করতে হবে। কিন্তু বিকাশমান এই খাতের সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ মানব সম্পদ উন্নয়ন।
বিদ্যুত্ খাত সংশ্লিষ্টরা বলেন, মাত্র ১০ বছর আগেই বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা ছিল সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এখন তা সাড়ে নয় হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। এরমধ্যে ছোট আকারের বিদ্যুত্ কেন্দ্র বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেরা নির্মাণ করতে সক্ষম হলেও বড় আকারের কোনো বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ এমনকি সংস্কার করার মতো দক্ষ মানব সম্পদ দেশে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। কেবলমাত্র বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণই নয় বিদ্যুতের সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যবস্থার প্রায় সব কাজই করে থাকে দেশের বাইরের প্রকৌশলীরা। সাম্প্রতিক সময়ে ভূগর্ভস্থ সঞ্চালন ব্যবস্থার ত্রুটি সারাতে বিদেশি প্রকৌশলীদের ওপর নির্ভর করতে দেখা গেছে। একইভাবে বিদ্যুত্ কেন্দ্রের ছোট-খাটো ত্রুটি সারাতেও বিদেশি প্রকৌশলীদের জন্যই এখনও অপেক্ষা করতে হয়। তাই দেশেই দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব হলে অর্থ এবং সময়ের অপচয় কমানো সম্ভব।
বক্তারা বলেন, একই অবস্থা জ্বালানি খাতেও বিরাজ করছে। নানামুখী বিতর্ক থাকলেও গত কয়েক বছরে দেখা গেছে দেশের অভ্যন্তরে স্থলভাগেই গ্যাস কূপ খুঁড়ছে বিদেশিরা। বাংলাদেশ তেল গ্যাস অনুসন্ধান উত্তোলন কোম্পানি (বাপেক্স) কার্যত বসেই রয়েছে। তাদের নিজস্ব গ্যাস কূপও খনন করছে বিদেশি প্রতিষ্ঠান। সঙ্গত কারণেই এখাতে দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়েছে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, আমরা চিন্তার বিকাশ চাই। এ জন্য গবেষণার বিকল্প নেই। আর গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদী ভিশন থাকতে হবে। আমাদের নতুন প্রজন্মের মেধা রয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হবে। তাদের সুযোগ করে দিতে হবে। গবেষণা করে কৃষিতে অনেক মঙ্গল বয়ে এনেছি। বিদ্যুতেও একইভাবে সফলতা অর্জন করতে পারবো। এ জন্য তথ্য আর প্রযুক্তির আদান-প্রদান বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ যুবক। এতো বিশাল সম্ভাবনাময় জনগোষ্ঠী অনেক কম দেশের রয়েছে। আমাদের এই শক্তি কাজে লাগাতে হবে।
এনার্জি এন্ড পাওয়ার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী ড. আরশাদ মনসুর বলেন, এখন বাংলাদেশকে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বিদ্যুত্ এবং জ্বালানি খাতের মানব সম্পদ উন্নয়নে। অন্তত গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বিদ্যুত্ খাত যতটা সম্প্রসারিত হয়েছে সেভাবে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়নি। আধুনিক প্রযুক্তি উন্নয়নে দেশেই দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
ইপিআরসি’র চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিদ্যুত্ সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম।
ইত্তেফাক/নূহু
