চুরি যাওয়া রিজার্ভের অর্থ ফেরাতে মামলার প্রস্তুতি

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৯:৪৮
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বিষয়ে ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) বিরুদ্ধে মামলা করার কথা ভাবছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই বিষয়ে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংককে এই মামলায় যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক এই মামলায় যুক্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ প্রদর্শন করছে না।
 
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে (নিউইয়র্ক ফেড) রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের আরসিবিসি’র চারটি অ্যাকাউন্টে আর বাকি ২ কোটি ডলার চলে যায় শ্রীলঙ্কায়। ব্যাংকটির মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় বদলে ফিলিপাইনের ক্যাসিনোতে (জুয়া খেলার জায়গা) চলে যায় বেশির ভাগ অর্থ। হ্যাকাররা একটি বানান ভুল করায় ২ কোটি ডলার শ্রীলঙ্কায় পাঠনোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরে ফিলিপাইনের সিনেট শুনানির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক ১ কোটি ৫২ লাখ ডলার ফেরত আনতে সক্ষম হয়।
 
সুইফট পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করে এই অর্থ চুরির পরে ম্যানিলাভিত্তিক রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের ব্যাংক একাউন্টে পাঠানোর পরে ফিলিপাইনের ক্যাসিনো ইন্ডাস্ট্রিতে সেই অর্থ বিলীন হয়ে যায়। প্রায় দুই বছর হয়ে গেলেও এখনো জানা যায়নি এই ঘটনা কারা ঘটিয়েছে। উত্তর কোরিয়া সংশ্লিষ্ট ল্যাজারাস হ্যাকার গ্রুপ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে রয়েছে বলে অনেক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, এই বিষয়ে পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। তবে কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি
 
রয়টার্স নিজস্ব সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও নিউইয়র্ক ফেডের কর্মকর্তারা গত মাসে একটি কনফারেন্স কলে (আরসিবিসি)-র বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে কথা বলে। কনফারেন্স কলে সুইফটের দুই প্রতিনিধিও অংশগ্রহণ করে। এটা নিশ্চিত করে ওই সূত্র যে এই বিষয়ে নিউইয়র্ক ফেডের কাছে প্রস্তাব পাঠাবে। সূত্র জানায়, এখন লক্ষ্য হচ্ছে মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে নিউইয়র্কে একটি মামলা দায়ের করা। এই বিষয়ে কাজ অব্যাহত আছে, বাংলাদেশ ব্যাংক খুব দ্রুতই ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংককে কিছু (প্রস্তাব) পাঠাবে।
 
এদিকে শুক্রবার বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বাসসকে বলেছেন,  ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি হওয়া রিজার্ভ অর্থ পুনরুদ্ধারে ফিলিপাইন সরকার সব ধরনের আইনি সহায়তা দিচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট সময় পর যদি আমরা চুরি হওয়া সম্পূর্ণ অর্থ উদ্ধার করতে না পারি, তাহলে আরসিবিসি’র বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করবো।’
 
তিনি বলেন, ফিলিপাইনের বিভিন্ন আদালতে এ নিয়ে বেশ কয়েকটি মামলা চলছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সার্বক্ষণিকভাবে এসব মামলার অগ্রগতি মনিটর করছে। মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দায়ের করা হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
 
IMG0
 
রয়টার্সের সূত্র জানিয়েছে, অর্থ পুনরুদ্ধারে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে নিউইয়র্কে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে আবেদনে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ও সুইফট যৌথ পিটিশনকারী হিসেবে থাকবে। নিউইয়র্ক ফেড ও সুইফট এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের এক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক বহির্ভূত একজন আইনি উপদেষ্টা আরসিবিসির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের কথাটি কনফারেন্স করের সময় বলেন। ফেডারেল রিজার্ভের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের যেকোনো প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখবে কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এই যৌথ আইনি উদ্যোগে সম্মতি প্রদান করেনি। এবং ওই কনফারেন্স কলের পরে এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে এই বিষয়ে কোনো কিছু শোনা যায়নি বলে জানিয়েছে সূত্র।
 
এদিকে আরসিবিসি এই রিজার্ভ চুরির জন্য তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের দায়ী করেছে। ফিলিপাইনের প্রসিকিউটররা সাবেক আরসিবিসি ম্যানেজার ও যেসব ব্যাংকে অর্থ পাঠানো হয়েছে এমন চার ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা দায়েল করা হয়েছে। কিন্তু একাউন্টগুলো ভুয়া নামে থাকায় তাদের চিহ্নিত করা যায়নি। আরসিবিসির নথির বরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেছেন, ফেব্রুয়ারির ২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যখন অর্থ ব্যাংকের একাউন্টে প্রবেশ করে তখন আরসিবিসির প্রধান কার্যালয় থেকে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখ অর্থ আটকে রাখার পরামর্শ দেয়া হলেও সেটাতে দেরি করে।
 
আরসিবিসি রয়টার্সের অনুরোধের পরে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে অতীতে তারা বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গাফিলতির কারণে এই চুরির ঘটনা ঘটেছে তাই তারা কোনো ক্ষতিপূরণ দেবে না। চুরির অর্থ তাদের ব্যাংক থেকে বের হয়ে যাওয়ায় আরসিবিসিকে গত বছর ১ বিলিয়ন পেসো (২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) জরিমানা করে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এদিকে বাংলাদেশের আদালত থেকে এই বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন এই মামলার প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের কাছে আমাদের কিছু প্রশ্ন আছে, আমরা এফবিআইয়ের অনুসন্ধান সম্পর্কে জানতে চাই। এফবিআইয়ের মুখপাত্র জানিয়েছে, তদন্ত চলছে এমন বিষয়ে মন্তব্য করবে না এফবিআই।
 
ইত্তেফাক/সাব্বির